এভাবে হাঁটি বলে আমাকে সবাই টিপটিপ ডাকে। আমার দাদা মিশর থেকে ইথিওপিয়ায় নির্বাসনে যাওয়ার সময় রানি লক্ট্রিসের দরবারের একজন নিম্নপদস্থ চিকিৎসক ছিলেন। তখন প্রায়ই আপনার কথা বলতেন তিনি। আপনার হয়তো তার কথা মনে থাকতে পারে, ম্যাগাস। তার নাম সিতন।
সিতন? এক মুহূর্ত ভাবল তাইতা। হ্যাঁ! ভালো ছেলে ছিল সে। চামচ দিয়ে কাঁটাঅলা তীর তোলায় বেশ দক্ষ ছিল। অনেক সৈন্যের প্রাণ বাঁচিয়েছে। প্রাণখোলা হাসি দিল টিপটিপ। কাটা ঠোঁট ফাঁক হয়ে গেল। তোমার দাদার কী হয়েছে?
বুড়ো বয়সে শান্তিতেই মারা গেছেন, তবে যাবার আগে দক্ষিণের দেশে আপনার অনেক অভিযানের কাহিনী বলেছেন তিনি। ওখানকার লোকজন আর বুনো জম্ভজানোয়ারের বর্ণনা দিয়েছেন। বন-জঙ্গল, পাহাড়-পর্বতের কথা বলেছেন, দুনিয়ার একেবারে শেষপ্রান্ত পর্যন্ত চলে যাওয়া এক বিশাল জলাভূমির কথাও বলেছেন।
সে ছিল দারুণ উত্তেজনার সময়, টিপটিপ, মাথা দুলিয়ে ওকে অনুপ্রাণিত করল তাইতা। বলে যাও।
কেমন করে আমাদের জাতির মূল অংশ নীলের বাম শাখা ধরে ইথিওপিয়ার পর্বতমালার দিকে গিয়েছিল সে কাহিনী বলেছেন তিনি। শেষ সীমানা আবিষ্কার করার জন্যে ডান দিকের শাখায় একটা দল পাঠিয়েছিলেন রানি লস্ত্রিস। সেনাপতি লর্ড আকেরের নেতৃত্বে বিশাল জলার দিকে রওয়ানা হয়েছিল তারা, সেই বাহিনীর একজন ছাড়া আর কাউকে আর দেখা যায়নি। কথাটা কি ঠিক, ম্যাগাস?
হ্যাঁ, টিপটিপ। রানির বাহিনী পাঠানোর কথা মনে আছে আমার। স্বয়ং তাইতাই সেই অভিশপ্ত অভিযানে আকেরকে নেতৃত্ব দেওয়ার সুপারিশ করেছিল। লোকটা ঝামেলাবাজ ছিল, লোকজনের মাঝে অসন্তোষ ছড়াতে ব্যস্ত ছিল। সেটা আর এখন বলতে গেল না ও। এও ঠিক যে, কেবল একজনই ফিরে এসেছিল। কিন্তু মানুষটা রোগে আর যাত্রায় এতই ক্ষতবিক্ষত ও ক্লান্ত ছিল যে আমাদের কাছে ফিরে আসার অল্প কদিন বাদেই জ্বরের কাছে হার স্বীকার করে।
হ্যাঁ, হ্যাঁ! উত্তেজনায় তাইতার বাহু খামচে ধরল টিপটিপ। আমার দাদাই সেই রোগীর চিকিৎসা করেছিলেন। তিনি বলেছেন, ঘোরের ভেতর সেই সৈনিক পাহাড় আর বিশাল সব হ্রদে ঘেরা এক দেশের কথা বলেছিল। হ্রদগুলো এত বিশাল যে খালি চোখে এক পার থেকে আরেক পার দেখা যায় না।
তাইতার কৌতূহল প্রবল হয়ে উঠল। হ্রদ! আগে তো এ-কথা শুনিনি। বেঁচে যাওয়া সেই লোকের সাথে আমার কখনও দেখা হয়নি। ইথিওপিও পাহাড়ে ছিলাম আমি। সে যখন মৃত্যুর স্থান কেবুইয়ে পৌঁছায় তখন আমি সেখান থেকে শত শত লীগ দূরে। আমার কাছে যে খবর আসে তাতে বলা হয়েছিল যে, রোগীর মাথা বিগড়ে গিয়েছিল বলে তেমন একটা সামঞ্জস্যপূর্ণ ও নির্ভরযোগ্য খবর দিতে পারেনি। টিপটিপের দিকে তাকিয়ে অন্তর্চক্ষু খুলল ও। ওর আভা থেকে বুঝতে পারল আন্তরিক মানুষ সে, যেমন মনে আছে সেভাবেই সত্যি কথা বলছে। তোমার আরও কিছু বলার আছে, টিপটিপ? আমার কিন্তু তাই ধারণা।
জ্বি, ম্যাগাস। একটা আগ্নেয়গিরি আছে, হড়বড় করে বলে উঠল টিপটিপ। সেকারণেই আপনার কাছে আসা। মৃত্যুপথযাত্রী সৈনিক একটা জ্বলন্ত পাহাড়ের কথা বলেছিল, এর আগে কেউ অমন দেখেনি। ওরা বিশাল জলাভূমি পেরুনোর পর অনেক দূর থেকে দেখতে পেয়েছিল ওটা। সে বলেছে ওটার সুড়ঙ থেকে বেরুনো ধোয়া আকাশের বুকে চিরস্থায়ী মেঘের মতো স্থির হয়েছিল। বাহিনীর কেউ কেউ একে কালো আফ্রিকান দেবতাদের আর না এগোনোর সতর্কবাণী ধরে নিয়েছিল। কিন্তু লর্ড আকের ওটাকে স্বাগত সঙ্কেত ঘোষণা করেন। ওখানে যেতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ছিলেন তিনি; অভিযান অব্যাহত রাখার নির্দেশ দেন। অবশ্য, এই পর্যায়ে সৈনিকটি আগ্নেয়গিরির দৃষ্টিসীমায় জ্বরে পড়লে সে মরে গেছে ভেবে তাকে ফেলে সঙ্গীরা দক্ষিণে কুচকাওয়াজ করে এগিয়ে যায়। কিন্তু কোনওমতে দানবীয় কালো মানুষদের একটা গ্রামে পৌঁছায় সে, হ্রদের পাশেই ওদের বসতি ছিল। ওকে তুলে নিয়ে যায় ওরা; ওদের এক শামান ওষুধ দিয়ে সেরে ওঠা পর্যন্ত সেবাযত্ন করে তার। ঠিকমতো সেরে ওঠার পর ফিরতি পথ ধরে সে। উত্তেজনার বশে তাইতার বাহু আঁকড়ে ধরল টিপটিপ। ব্রাদার নুবাঙ্ক বাধা দেওয়ার আগেই কথাটা আপনাকে বলতে চেয়েছি। সত্তর বছর আগের গুজবে আপনাকে বিরক্ত করতে নিষেধ করে দিয়েছেন তিনি। বলেছেন আমরা ভূগোলবিশারদরা কেবল সত্যি বিষয় নিয়ে কাজ করি। ব্রাদার নুবাঙ্ককে আবার আমার অবাধ্য হওয়ার কথা বলে দেবেন না তো? তিনি ভালো, পবিত্র পুরুষ, তবে অনেক কঠোর হতে পারেন।
ঠিক কাজই করেছ তুমি, ওকে আশ্বস্ত করল তাইতা। আস্তে করে ওকে খামচে ধরে রাখা আঙুলগুলো বিচ্ছিন্ন করল। তারপর হঠাৎ আরও নিবিড়ভাবে পরখ করতে টিপটিপের হাত তুলে নিল। তোমার ছয় আঙুল! বিস্ময়ে চেঁচিয়ে উঠল ও।
স্পষ্টই হতবাক হয়ে গেছে টিপটিপ। হাত মুঠি বানিয়ে বিকৃতি আড়াল করার চেষ্টা করল সে। দেবতারা আমার গোটা শরীরটাই উল্টাপাল্টা করে বানিয়েছেন। আমার মাথা, চোখ, পিঠ, হাত-পা-আমার সমস্ত কিছুই বাঁকাচোরা, কিস্তুত। অশ্রুতে ভরে উঠল তার চোখ।
কিন্তু তোমার মনটা ভালো, ওকে সান্ত্বনা দিল তাইতা। আস্তে করে ওর হাত খুলল ও। স্বাভাবিক কনে আঙুলের পাশে হাতের তালু থেকে একটা বাড়তি ছোট্ট আঙুল গজিয়েছে।
