*
ওরা যখন খাবার ঘরে পা রাখল তখন আগে থেকেই মোটামুটি জনাপঞ্চাশ যাজক খাচ্ছিল, কিন্তু একজন এক লাফে সোজা হয়ে দাঁড়াল, ওদের সাথে মিলিত হতে দৌড়ে এলো। আমি নুবাঙ্ক। আপনাদের স্বাগত জানাই। মানুষটা লম্বা, ছিপছিপে, মড়ার মতো চেহারা। এই দুঃসময়ে মিশরে খুব কমই মোটাসোটা লোক আছে। খাবার একেবারেই সামন্য: এক বাটি ঝোল আর ছোট এক জগ বিয়র। মোটামুটি নীরবেই খাওয়া সারল সবাই। কেবল নুবাঙ্ক বাদে। এক মুহূর্তের জন্যেও কথা থামাল না সে। কণ্ঠস্বর খরখরে, আচরণে তোষামুদে ভাব।
কাল কেমন করে বাঁচব জানি না, দিমিতারকে বলল তাইতা, নিজেদের সেলে ফিরে এসেছে ওরা, ঘুমানোর আয়োজন করছে। প্রিয় ব্রাদার নুবাঙ্কের বকবকানি শুনতে গেলে দিনটা লম্বা হয়ে যাবে।
তবে ভূগোল সম্পর্কে তার বিদ্যা পূর্ণাঙ্গ, যুক্তি দেখালেন দিমিতার।
ঠিক বিশেষণটাই বেছে নিয়েছেন আপনি, ম্যাগাস, বলে পাশ ফিরে শুলো তাইতা।
*
এক নবীশ ওদের নাশতার জন্যে তলব করতে এলো যখন, তখনও সূর্য ওঠেনি। দিমিতারকে আরও দুর্বল ঠেকল। তাই মেরেন ও তাইতা মাদুর থেকে উঠতে সাহায্য করল ওকে।
মাফ করবেন, তাই। ভালো ঘুম হয়নি আমার।
আবার স্বপ্ন? তেনমাস ভাষায় জানতে চাইল তাইতা।
হ্যাঁ। ডাইনীটা কাছে এসে পড়ছে। ওকে ঠেকানোর মতো শক্তি পাচ্ছি না।
তাইতাও স্বপ্নে আক্রান্ত হয়েছে। ওর স্বপ্নে ফিরে এসেছে পাইথনটা। এখনও নাক ও গলার পেছনে লেগে আছে ওটার বুনো গন্ধ। কিন্তু নিজের ভীতি গোপন করে দিমিতারের সামনে আত্মবিশ্বাসী ভাব করল ও। আরও অনেক পথ যেতে হবে আমাদের।
নাশতায় ছিল ছোট কঠিন ধুরা পাতা আর আরেক জগ পাতলা বিয়র। গতরাতে যেখানে বাধা পড়েছিল সেখান থেকে ফের একক সংলাপ শুরু করল ব্রাদার নুবাঙ্ক। সৌভাগ্যক্রমে অচিরেই নাশতার পালা চুকে গেল। কিছুটা স্বস্তির সাথে নুবাঙ্কের পিছু পিছু গুহার মতো দরবার আর উঠোন হয়ে মন্দিরের লাইব্রেরির দিকে এগোল ওরা। বিশাল, শীতল একটা কামরা, উঁচু উঁচু পাথুরে দেয়ালে মেঝে থেকে ছাদ অবধি ঢেকে রাখা তাক ছাড়া অলঙ্করণ বা আসবাবেব কোনও বালাই নেই। প্যাপিরাসের স্কোলে ঠাসা তাকগুলো, হাজার হাজার।
নুবাঙ্কের জন্যে অপেক্ষা করছিল তিনজন নবীশ ও দুই জন পুরোনো শিষ্য। এক সারিতে দাঁড়িয়ে রয়েছে তারা, হাত সামনে বেঁধে রেখেছে। দাসসুলভ আচরণ। ওরা নুবাঙ্কের সহকারী। ওদের ভক্তির পেছনে সঙ্গত কারণ রয়েছে। ওদের সাথে রূঢ় আচরণ করে নুবাঙ্ক। সবচেয়ে কর্কশ অপমানকর ভাষায় নিজের অসন্তোষ প্রকাশ করতে দ্বিধা করে না সে।
তাইতা ও দিমিতার প্যাপিরাস স্কুলে ভর্তি দীর্ঘ নিচু সেন্টার টেবিলে বসার পর লেকচার শুরু করল নুবাঙ্ক। পরিচিত বিশ্বের প্রতিটি আগ্নেয়গিরি ও উষ্ণ জিনিসের বিবরণ দিতে লাগল, সেটা বিশাল জলাধারের আশপাশে হোক বা না হোক। একেকটা জায়গার নাম বলছে আর অমনি ভীত সন্ত্রস্ত একজন সহাকারীকে তাক থেকে সঠিক স্ক্রোলটা আনতে বলছে। অনেক সময়ই নড়বড়ে মই বেয়ে ওঠার প্রয়োজন হচ্ছে। এদিকে লাগাতার মুখখিস্তি করে দৌড়ের উপর রাখছে ওদের নুবাঙ্ক। তাই একবার ওর মূল অনুরোধের কথা উল্লেখ করে এই ক্লান্তিকর প্রক্রিয়ায় বাদ সাধতে চেষ্টা করলেও দায়সারাভাবে মাথা দুলিয়ে ফের নিজের কায়দায় কাজ চালিয়ে গেল নুবাঙ্ক।
অভাগা এক নবীশ ছিল নুবাঙ্কের পছন্দের শিকার। বেখাপ্পা চেহারা তার: শরীরের কোনও অংশই খুঁত হীন বা বিকৃতির উর্ধ্বে মনে হয়নি। ওর মুড়ানো মাথা লম্বাটে, মাথায় খুস্কি ভরা, পরিষ্কার ঘা সেখানে। কুঁতকুঁতে কাছাকাছি বসানো ট্যারা চোখের উপর বসানো তার ভুরুজোড়া। হেয়ারলিপ ঠোঁটের ফাঁক দিয়ে বের হয়ে আছে বড় বড় দাঁত। কথা বলার সময় লালা গড়াচ্ছে। যদিও মুখে খুব একটা কথা সরে না তার। চিবুক এমন হুট করে শেষ হয়ে গেছে যে আছে কিনা বোঝা দুষ্কর। বাম গালের উপর বড় মালবেরি আকারের জন্মদাগ, বুকটা ভেতরে ঢোকানো, পাহাড়ের মতো কুঁজঅলা পিঠ। কাঠির মতো সরু পাজোড়া বাকানো; হাঁটার সময় একপাশে হেলে হাঁটে।
দিনের মাঝামাঝি সময় একজন নবীশ দুপুরের খাবারের জন্যে ওদের খাবার ঘরে যেতে তলব করতে এলো। সবাই আধা উপোস থাকায় নুবাঙ্ক ও তার সহকর্মীরা দ্রুত সাড়া দিল। খাবারের সময় কুঁজো নবীশকে আড়ালে ওর চোখের দিকে তাকানোর চেষ্টা করতে দেখল তাইতা। তাইতার মনোযোগ আকর্ষণ করতে পেরেছে বোঝমাত্র উঠে দ্রুত দরজার দিকে পা বাড়াল সে। ওখানে একবার পেছনে তাকিয়েই ঝট করে মাথা ঘুরিয়ে নিল সে; বোঝাতে চাইছে, তাইতা ওকে অনুসরণ করুক।
ছোটখাট মানুষটাকে টেরেসে ওর অপেক্ষায় থাকতে দেখল তাইতা। ফের ইশারা করল সে। তারপর একটা সংকীর্ণ প্যাসেজের মুখে অদৃশ্য হয়ে গেল। অনুসরণ করল তাইতা। অচিরেই প্রাঙ্গণের একটা ছোট মন্দিরে আবিষ্কার করল নিজেকে। দেয়ালগুলো হাথরের আবক্ষমূর্তিতে ঢাকা। ফারাও মামাসের একটা মূর্তিও রয়েছে। ওটার পিছনে গা ঢাকা দিয়েছে লোকটা।
মহান ম্যাগাস! আপনাকে একটা কিছু বলার আছে আমার, আপনার হয়তো কৌতূহল হতে পারে। তাই কাছে এগিয়ে যেতেই প্রণত হলো সে।
উঠে দাঁড়াও, সহজ কণ্ঠে বলল তাইতা। আমি রাজা নই। তোমার নাম কী? ব্রাদার নুবাঙ্ক এই নবীশটিকে কেবল এই মিয়া সম্বোধন করেছে।
