পালকির পর্দা একপাশে সরিয়ে তারপর পেছনের পাহাড়সারির দিকে তাকালেন দিমিতার। এখন মন্দিরের কাছাকাছি রয়েছি আমরা। ওখানে গিয়ে যাজিকার আতিথ্য ও রাতের জন্যে ঘুমোনোর চাদর চাওয়া দরকার। সকালে ওর মানচিত্র শিল্পী ও ভূগোল বিশারদদের সাথে কথা বলা যাবে।
ফারাও মেমনন আমাকে তলব করলে, ওর ভৃত্যরা আমাকে খুঁজে পাবে না, বলল ইতা। আমরা আবার প্রাসাদ থেকে বেরুনোর আগেই ওর সাথে দেখা করতে দিন।
এখানে থামো, হাবারিকে নির্দেশ দিলেন দিমিতার। এখুনি থামাও, বলছি। তারপর তাইতার দিকে ফিরে তাকালেন তিনি। আপনাকে ভয় পাইয়ে দিতে চাই, কিন্তু এখন আমি জানি, আপনার সাথে আমার সময় দ্রুত ফুরিয়ে আসছে। স্বপ্ন ও অশুভ ভাবনা তাড়া করে ফিরছে আমাকে। মেরেন আর আপনার দেওয়া প্রতিরক্ষা সত্ত্বেও ডাইনীটা অচিরেই আমাকে ধ্বংস করার প্রয়াসে সফল হবে। আমার দিন ফুরিয়ে আসছে।
ওর দিকে তাকিয়ে রইল তাইতা। সেদিন সকালে সোয়ের ভীতিকর আভা সম্পর্কে সজাগ হওয়ার পর থেকেই এই একই অশুভ ভাবনা তাড়া করে বেড়াচ্ছে। তাকে। পালকির কাছে এসে বুড়োর জীর্ণ চেহারা ভালো করে পরখ করল ও। বিষাদের সাথে লক্ষ করল, দিমিতার ঠিকই বলেছেন: মরণ ঘনিয়ে এসেছে তার। প্রায় বিবর্ণ ও স্বচ্ছ হয়ে গেছে ওর চোখজোড়া, তবে ওগুলোর গভীরে খাওয়ায় ব্যস্ত হাঙড়ের মতো চলমান ছায়া দেখতে পেল।
আপনিও দেখতে পেয়েছেন, নিরস, ফাঁকা কণ্ঠে বললেন দিমিতার।
জবাব দেওয়ার প্রয়োজন ছিল না। ঘুরে দাঁড়াল তাইতা, হাবারিকে নির্দেশ দিল। দলটাকে ঘোরাও। হাথরের মন্দিরে যাচ্ছি আমরা। এক লীগের চেয়ে সামান্য দূরে সেটা।
কিছুক্ষণ নীরবে পথ চলল ওরা। তারপর ফের কথা বললেন দিমিতার। আমার প্রাচীন, দুর্বল দেহের বাধা না থাকলে আরও দ্রুত এগোতে পারবেন আপনারা।
নিজের প্রতি বড় অবিচার করছেন আপনি, ওকে ভৎর্সনা করল তাইতা। আপনার সাহায্য ছাড়া কোনদিনই এতদূর আসতে পারতাম না।
শেষ পর্যন্ত আপনার সাথে ডাইনীটাকে হত্যার সময় উপস্থিত থাকতে পারলে খুশি হতাম। কিন্তু তা হবার নয়। একটু সময় চুপ করে রইলেন তিনি, তারপর আবার খেই ধরলেন। সোয়ের সাথে কীভাবে সামাল দেবেন? আপনার সামনে একটা পথই খোলা। ফারাওকে সোয়ের মিনতাকাকে জাদু করার খবর আর তার মনে গেথে দেওয়া বিশ্বাসঘাতকার চিন্তার খবর দিলে তাকে আটক করার জন্যে তিনি প্রহরী পাঠাবেন। তখন আপনি নির্যাতনের মাধ্যমে তার কাছ থেকে তথ্য আদায়ের সুযোগ পাবেন। শুনেছি থেবসের কারারক্ষীরা নাকি তাদের কাজে বেশ দক্ষ। নির্যাতনের কথায় কুকুড়ে যান না তো?
স্রেফ শারীরিক যন্ত্রণার কারণে সোয়ের মচকানোর সামান্যতম সম্ভাবনা আছে থাকলে তাতে দ্বিধা করব না। কিন্তু তাকে আপনি দেখেছেন। ডাইনীকে রক্ষা করতে চাইবে সে। ডাইনীর সাথে তার এমনই বোঝাঁপড়া যে তার কষ্ট ও তার কারণ বুঝে যাবে সে। সে বুঝতে পারবে ফারাও ও রানি মিনতাকা তার বোনা জালের কথা টের পেয়ে গেছেন, সেক্ষেত্রে রাজপরিবারের পক্ষে বিপজ্জনক হয়ে দাঁড়াবে তা।
তা ঠিক, সায় দিলেন দিমিতার।
তাছাড়া, সোয়েকে বাঁচাতে ছুটে যাবেন মিনতাকা, তখন নেফার সেতি বুঝবেন তিনি আসলেই তাঁর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের অপরাধে অপরাধী। তাতে ওদের ভালোবাসা ও আস্থা ধ্বংস হয়ে যাবে। আমি ওদের এই ক্ষতি করতে পারব না।
তাহলে মন্দিরেই উত্তর পাওয়ার আশা করতে হবে।
দূর থেকেই ওদের দেখতে পেলেন যাজিকারা। স্বাগত জানাতে দুজন নবীশকে পাঠালেন তারা। ওদের পথ দেখিয়ে মূল প্রবেশ পথের র্যাম্পের কাছে নিয়ে এলো ওরা, সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে ওদের অপেক্ষা করতে লাগলেন প্রধান যাজিকা। :
আপনাকে দেখে খুবই খুশি হলাম, ম্যাগাস। এমনিতেও ব্রাদার নুবাঙ্ক আপনার অনুরোধ নিয়ে অনেক পরিশ্রম সাপেক্ষ কাজ করেছেন জানাতে আপনার খোঁজে থেবসে বার্তাবাহক পাঠাতে যাচ্ছিলাম। তিনি আপনাকে তাঁর পাওয়া তথ্য তুলে দিতে প্রস্তুত। তবে আপনি আমাকে হারিয়ে দিয়েছেন। তাইতার দিকে মায়ের চোখে তাকালেন তিনি। আপনি এখানে হাজারবার স্বাগত। পুরুষদের মহলে পরিচারিকরা আপনার চেম্বারের ব্যবস্থা করছে। যতদিন ইচ্ছে এখানে থাকতে পরেন। আপনার বিজ্ঞ আলোচনার অপেক্ষায় আছি আমরা।
আপনার অসীম দয়া ও ঔদার্য, মা। আমার সাথে আরেকজন মহাজ্ঞানী ও বিখ্যাত ম্যাগাস রয়েছেন।
তিনিও এখানে স্বাগত। আপনার সঙ্গীদের পুরুষদের মহলে আশ্রয় ও খাবার দেওয়া হবে।
যার যার বাহন থেকে নেমে পড়ল ওরা। দিমিতারকে নামতে সাহায্য করল মেরেন। তারপর মন্দিরে প্রবেশ করল। প্রধান দরবারের আনন্দ, মাতৃত্ব ও ভালোবাসার দেবী হাথরের প্রতিকৃতির সামনে থামল ওরা। শাদা-কালো ফুটকিঅলা গাভী হিসাবে তুলে ধরা হয়েছে তাঁকে, শিঙজোড়া সোনালি চাঁদ দিয়ে সাজানো। প্রার্থনা করলেন যাজিকা। তারপর তাইতা ও দিমিতারকে একটা মাঠের উপর দিয়ে মন্দিরের যাজকদের এলাকায় নিয়ে যেতে এক নবীশকে ডাকলেন। ওদের একটা ছোট পাথুরে দেয়ালের সেলে নিয়ে এলো সে, এখানে দূর প্রান্তের দেয়ালের গায়ে চাদর ঠেস দিয়ে রাখা। জলভর্তি গামলাও আছে যাতে তরতাজা হয়ে নিতে পারে ওরা।
রাতের খাবারের সময় আপনাদের খাবার ঘরে নিয়ে যেতে আবার আসব আমি, ব্রাদার নুবাঙ্ক ওখানে আপনাদের সাথে দেখা করবেন।
