সোয়ে বিদায় নেওয়ার পরপরই পরিচারিকাদের বিদায় দিলেন মিনতাকা।
তাইতা, এখনও আছো তোমরা?
জ্বি, মহারানি।
একটানে পর্দা সরিয়ে মিনতাকা জানতে চাইলেন, লোকটা কত জ্ঞানী আর শিক্ষিত, কত চমৎকার সব সংবাদ নিয়ে আসেন বলেছি তোমাকে?
অসাধারণ খবর, সত্যি, জবাব দিল তাইতা।
দেখতেও সুন্দর, না? মনেপ্রাণে তাকে বিশ্বাস করি আমি। অন্তর থেকে জানি তার ভবিষ্যদ্বাণী ঐশী সত্যি; দেবী নিজেকে আমাদের সামনে প্রকাশ করবেন, আমাদের কষ্ট দূর করবেন তিনি। ওহ, তাইতা, তার কথাগুলো বিশ্বাস করেছ তুমি? নিশ্চয়ই করেছ!
ধর্মীয় ঘোরে রয়েছেন মিনতাকা। তাইতার জানা আছে, এখন কোনও সাবধানবাণী উচ্চারণ করলে হিতে বিপরীত হবে। দিমিতারকে এখন এমন কোনও জায়গায় নিয়ে যেতে চাইছে যেখানে বসে এতক্ষণ যা কিছু জেনেছে সেসব নিয়ে আলাপ করতে পারবে। অগ্রসর হওয়ার কায়দা সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নিতে পারবে। কিন্তু তার আগে মিনতাকার মুখে সোয়ের তারিফ শুনতে হবে। এক সময় সব প্রশংসার শব্দ ফুরিয়ে গেলে আস্তে করে তাইতা বলল, আমি আর দিমিতার উত্তেজনায় ক্লান্ত। ফারাও তাঁর জরুরি দায়িত্ব থেকে অবসর পাওয়ামাত্র তার সাথে দেখা করতে এসেছিলাম, তো এখন হাতের কাছে থাকার জন্যে থেবসে ফিরে যেতে হচ্ছে আমাদের। তবে, যত তাড়াতাড়ি পারি ফিরে আসব। আরও আলোচনা করা যাবে তখন, রানি আমার।
অনিচ্ছা সত্ত্বেও ওদের বিদায় দিলেন তিনি।
*
ওরা ফের বাহনে চেপে নদীর দিকে পথে নামার পরপরই পালকির দুই পাশে যথারীতি অবস্থান নিল তাইতা ও মেরেন। মিশরিয় ভাষা ছেড়ে তেনমাস ভাষায় কথা বলতে শুরু করল এবার তাইতা ও দিমিতার, যাতে এসকর্টের লোকজন ওদের আলোচনা না বোঝে।
সোয়ের কাছ থেকে অনেক গুরুত্বপূর্ণ কথা জানতে পেরেছি আমরা, শুরু করল তাইতা।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কথা হলো, লোকটা ডাইনীকে দেখেছে, বলে উঠলেন দিমিতার। ডাইনীর কথা শুনেছে সে। নির্ভুলভাবে তার কণ্ঠে কথা বলেছে।
তার কথাবার্তার ধরন আমার চেয়ে ভালো জানেন আপনি, অপানার কথার সত্যতায় আমার সন্দেহ নেই, সায় দিল তাইতা। তবে আমার মতে আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার রয়েছে। সোয়ে মিশরিয়। তার বলার ভঙ্গি উচ্চ রাজ্যের।
এটা আমি বুঝতে পারিনি। আপনাদের ভাষায় আমার দক্ষতা এসব ব্যাপার ধরতে পারার মতো নয়। এটা ডাইনীর সত্যিকারের অবস্থানের একটা ইঙ্গিত হতে পারে। থেবসে আসতে সোয়েকে খুব বেশি পথ পাড়ি দিতে হয়নি ধরে নিলে দুটি রাজ্যের সীমানার ভেতরই আমাদের তদন্ত শুরু করতে পারি, কিংবা অন্ততপক্ষে, এগুলোর আশপাশের জায়গাগুলোতে খোঁজ করা যেতে পারে।
এইসব এলাকায় কি কি আগ্নেয়গিরি আছে?
ঠিক মিশরে কোনও বড় আগ্নেয়গিরি বা হ্রদ নেই। মধ্যসাগরে গিয়ে পড়েছে নীলনদ। উত্তরে এটাই সবচেয়ে কাছের জলের উৎস। এতনা দশদিনেরও বেশি দূরের পথ। ইয়োস ওখানে নেই, এ ব্যাপারে আপনি এখনও নিশ্চিত?
হ্যাঁ, মাথা দোলালেন দিমিতার।
বেশ। এই দিকে আরেক বড় আগ্নেয়গিরি, এতনার ওপাশে প্রণালীর উল্টোদিকের মূলভূখণ্ডের ভিসুভিয়াস সম্পর্কে কী বলবেন? জানতে চাইল তাইতা।
সন্দিহান মনে নিচের ঠোঁট কামড়ালেন দিমিতার। ওই কুকুরও শিকার করবে, জোরের সাথে বললেন তিনি। ওর খপ্পর থেকে পালোনোর পর ভিসুভিয়াসের মুখ থেকে তিরিশ লীগেরও কম দূরের মন্দিরের যাজকদের সাথে অনেক বছর কাটিয়েছি। ধারে কাছে থাকলে নির্ঘাৎ টের পেতাম, কিংবা সেও আমার উপস্থিতি বুঝে যেত। উঁহু, তাইতা, অন্য কোথাও খুঁজতে হবে আমাদের।
আপাতত আপনার সহজাত প্রবৃত্তির বশেই চলা যাক, বলল তাইতা। লোহিত সাগরের পুব প্রান্তে। ওই সাগরের তীরে আরব বা অন্য কোনও দেশের বুনো এলাকা চিনি না আমি। আপনি চেনেন?
না। ওসব জায়গায় গেলেও কোনও আগ্নেয়গিরির কথা শুনিনি বা দেখিনি।
যাগরেব পাহাড়ের ওধারের এলাকায় দুটি আগ্নেয়গিরি দেখেছি আমি, তবে বিশাল প্রান্তর ওগুলোকে ঘিরে রেখেছে। আমরা যেটা খুঁজছি তার সাথে ওগুলোর বর্ণনা মেলে না।
মিশরের দক্ষিণ ও পশ্চিমে আরও বিস্তৃর্ণ এলাকা পড়ে আছে, বললেন দিমিতার। তবে আসুন, আরেকবার সম্ভাবনার কথা বিচার করা যাক। আফ্রিকার অভ্যন্তরে বিশাল নদী ও হ্রদ আর সেগুলোর কোনওটার আশপাশে বিরাট আগ্নেয়গিরি থাকতে পারে না?
তেমন কিছু শুনিনি আমি-অবশ্য, এটাও ঠিক যে, ইথিওপিয়ার চেয়ে দক্ষিণে কেউ এপর্যন্ত যায়নি।
শুনেছি, তাইতা, মিশর থেকে নির্বাসনে যাওয়ার সময় রানি লস্ত্রিসকে সেই উত্তরে হাওয়ার দেশ কেবুই পর্যন্ত পথ দেখিয়ে নিয়ে গিয়েছিলেন আপনি, যেখানে নীল দুটো বিশাল জলধারায় ভাগ হয়ে গেছে।
ঠিক। কবুই থেকে আমরা নদীর বাম শাখা ধরে ইথিওপিয়ার পাহাড়সারিতে গিয়েছিলাম। ডান দিকের শাখা অন্তহীন জলাভূমি থেকে উঠে এসেছে, ওদিকে বেশি দূর যাওয়ার উপায় ছিল না। কেউ কোনওদিন ওটার দক্ষিণের প্রান্তে যায়নি। কেউ গেলেও সে-কাহিনী বলতে ফিরে আসেনি। কেউ কেউ বলে জলাভূমি নাকি অন্তহীন, বিশাল, নিষিদ্ধ, পৃথিবীর শেষমাথা পর্যন্ত চলে গেছে ওটা।
তাহলে আরও সম্ভাবনা নিয়ে চিন্তার রসদের জন্যে হাথরের মন্দিরের যাজিকার উপর নির্ভর করা ছাড়া উপায় নেই। কবে ওরা তথ্য জানাবে?
দশ দিন পর আবার যেতে বলেছিলেন যাজিকা, ওকে মনে করিয়ে দিল তাইতা।
