ওদের মাথর উপর আশীর্বাদের একটা ভঙ্গি করল সে। পরমানন্দে হেসে উঠল ওরা।
সোয়েকে কুশনের একটা ঢিবির কাছে নিয়ে গেলেন মিনতাকা, রানির মাথা থেকে বেশ উঁচু করে তুলল সেগুলো সোয়ের মাথা। তারপর অল্পবয়সী মেয়েদের মতো নিতম্বের নিচে পা ভাঁজ করে বসলেন তিনি। যেনানা জানালার দিকে ফিরে সুন্দর হাসি দিলেন, জানেন তাইতা ওখানে বসে ওদের দেখছে। নিজের সাম্প্রতিক সংগ্রহের প্রতি ওর অনুমোদন কামনা করছেন। যেন সোয়ে দূর দেশ থেকে আনা কোনও বিচিত্র পাখি, কিংবা কোনও বিদেশী অতিথির দেওয়া মূল্যবান রত্ন। রানির এমনি অসতর্কতায় সতর্ক হয়ে উঠল তাইতা। কিন্তু পরিচারিকাদের সাথে আলাপে মগ্ন সোয়ে। ওদের দৃষ্টি চালাচালি লক্ষ করেনি। এবার মিনতাকার দিকে তাকাল
মহারানি, গতবার আমাদের দেখা হওয়ার পর আপনার উদ্বেগের বিষয়ে অনেক ভেবেছি, দেবীর কাছে আন্তরিকভাবে প্রার্থনা করেছি আমি, তিনি সবচেয়ে উদারভাবে সাড়া দিয়েছেন।
ফের অবাক হলো তাইতা। এ লোক বিদেশী কেউ নয়, ভাবল ও। মিশরিয়। আমাদের ভাষা নির্ভুল ব্যবহার করছে। উচ্চ রাজ্যের অধিবাসী আসৌনদের মতো টান আছে তার কথায়।
বলে চলল সোয়ে। এসব ব্যাপার এত জরুরি ও কঠিন যে এই মুহূর্তে সেগুলো কেবল আপনার নিজের কাছে গোপন রাখতে হবে। পরিচারিকাদের বিদায় করে দিন। হাত তালি দিলেন মিনতাকা। লাফ দিয়ে উঠে ভীত ইঁদুরের মতো কামরা থেকে ছুটে বের হয়ে গেল ওরা।
সবার আগে আপনার স্বামী, নেফার সেতির প্রসঙ্গ, একাকী হওয়ার পর আবার বলল সোয়ে। তিনি আপনার কাছে এই খবব দিতে নির্দেশ দিয়েছেন। একটু থেমে মিনতাকার দিকে ঝুঁকে এলো সে। তারপর এমন স্বরে কথা বলতে শুরু করল যেটা ওর নিজস্ব ভাষা নয়, বৈরী নারী কণ্ঠ। আমার আগমনের সময় নেফার সেতিকে নিজের প্রেমময় আলিঙ্গনে আবদ্ধ করব আমি, সানন্দে আমার কাছে আসবে সে।
চমকে উঠল তাইতা, কিন্তু ওর পাশে দিমিতার বুনো চোখে তাকিয়ে আছেন। তাকে শান্ত করতে হাত বাড়াল তাইতা। যদিও নিজেই প্রায় বিরক্ত হয়ে উঠেছে। কাঁপছেন দিমিতার। তাইতার হাত ধরে টানলেন তিনি। ওর দিকে ফিরল তাইতা। নিঃশব্দে একটা বার্তা উচ্চারণ করলেন বৃদ্ধ, পরিষ্কার বুঝতে পারল তাইতা, যেন চিৎকার করে বলা হয়েছে। ডাইনী! এটা ইয়োসের কণ্ঠস্বর! দিমিতার ঘোরে থাকার সময় তার মনের গহীন থেকে এই কণ্ঠস্বরই বের করে এনেছিল তাইতা।
তবে এসবেরই প্রভু হচ্ছে আগুন, পুনরাবৃত্তি করে পূর্ণ সম্মতিতে হাতের তালু উপরের দিকে মেলে ধরল।
সোয়ে কথা বলে চলেছে, শোনার জন্যে পেছন ফিরে তাকাল ওরা: আমার অলৌকিক রাজ্যের অধিপতি করার জন্যে পুনরুত্থান ঘটাব তার। পৃথিবীর সমস্ত রাজ্যের রাজারা তার অধীনে চলে আসবে। আমার নামে চিরকাল আপন মহিমায় শাসন করবে সে। আপনি, প্রিয় মিনতাকা, থাকবেন তার পাশে।
স্বস্তি আর আনন্দের কান্নায় ভেঙে পড়লেন মিনতাকা। পিতৃসুলভ কৌতূহলের সাথে ওর দিকে তাকিয়ে রইল সোয়ে। তাঁর সামলে ওঠার অপেক্ষা করল। অবশেষে চোখের জল মুছে ওর দিকে তাকিয়ে হাসলেন তিনি। আমাদের প্রাণপ্রিয় বাচ্চাদের কী হবে?
আগেই ওদের কথা বলেছি আমরা, কোমল কণ্ঠে তাঁকে মনে করিয়ে দিল সোয়ে।
হা! কিন্তু বেশিবার শুনিনি। দয়া করে, পবিত্র পয়গম্বর, আপনার কাছে আবেদন জানাচ্ছি…
দেবী আপনার কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন ওদের, ওরা পূর্ণ আয়ু পার করবে।
আর কী নির্দেশ দিয়েছেন তিনি? দয়া করে আবার বলুন।
ওরা নিজেদের যোগ্যতার প্রমাণ রাখতে পারলে আপনার সকল সন্তানকে চির তারুণ্য দান করবেন তিনি। কোনও দিন আপনাকে ফেলে যাবে না ওরা।
আমি সন্তুষ্ট, সর্বশক্তিমতী দেবীর মহান পয়গম্বর, ফিসফিস করে বললেন মিনতাকা। আমি আমার মনপ্রাণ সম্পূর্ণভাবে তাঁর ইচ্ছার কাছে সঁপে দিচ্ছি। হাঁটু ভেঙে সোয়ের দিকে এগিয়ে গেলেন তিনি। চোখ দিয়ে দরদর করে জল গড়াচ্ছে। চুলের ডগায় অশ্রু মুছলেন তিনি।
এরচেয়ে বিতৃষ্ণ দৃশ্য আর হতে পারে না। এমনটা আর তাইতা দেখেনি। পর্দার এপাশ থেকে চিৎকার করে ওঠার ইচ্ছাটা অনেক কষ্টে দমন করল ও। লোকটা মিথ্যার চ্যালা! নিজেকে ওর হাতে নোংরা হতে দেবেন না।
পরিচারিকাদের তলব করলেন মিনতাকা। সকালের বাকি সময়টা সোয়ের সাথে কাটাল ওরা। কথোপকথন অর্থহীন বাক্যালাপে পর্যবসিত হলো, কারণ পরিচারিকাদের কারওই সোয়ের শিক্ষা অনুসরণ করার মতো বুদ্ধি নেই। সরল ভাষায় সব কিছু ব্যাখ্যা করতে বাধ্য হলো সে। অচিরেই ক্লান্ত হয়ে পড়ল ওরা, হাসিঠাট্টায় তাকে ত্যক্ত করতে লাগল।
দেবী আমার জন্যে ভালো একজন স্বামী খুঁজে দেবেন?
আমাকে সুন্দর সুন্দর জিনিস দেবেন?
লক্ষ্যণীয় ধৈর্য ধরে ওদের সামাল দিল সোয়ে।
তাইতা বুঝতে পারল ওরা অনেক কিছু জানতে পারলেও যেনানা পর্দার আড়ালে নীরবে বসে থাকা ছাড়া কিছু করার নেই। চলে যাবার চেষ্টা করলে নড়াচড়ায় পয়গম্বরের দৃষ্টি আকৃষ্ট হতে পারে। সতর্ক হয়ে যাবে সে। দুপুরের খানিক আগে দেবীর উদ্দেশে লম্বা প্রার্থনা শেষে সভার সমাপ্তি টানল সোয়ে। তারপর ফের মেয়েদের চুমু খেয়ে মিনতাকার দিকে ফিরল। মহারানি, আপনি কি চান পরে আবার আসি আমি?
দেবীর এইসব ইচ্ছা নিয়ে ভাবতে হবে। দয়া করে কাল সকালে আবার আসুন, তখন এসব নিয়ে আরও আলোচনা করা যাবে। মাথা নুইয়ে সরে গেলেন তিনি।
