সামনে ঝুঁকে এলেন দিমিতার। গম্ভীর হয়ে উঠল তার অভিব্যক্তি। এমন আজগুবী ব্যাপার বিশ্বাস না করার মতো ভালো বুদ্ধি তো রানি মিনতাকার থাকার কথা?
নতুন দেবীর আগমন ঘটার পর তাঁর প্রথম কাজ হবে মিশরের প্লেগ দূর করা, এই রোগের কারণে আবির্ভুত সমস্ত ভোগান্তির অবসান ঘটানো। তার মাঝে মিনতাকা প্লেগে মৃত দুই সন্তানকে কবর থেকে আবার ফিরিয়ে আনার সুযোগ দেখতে পেয়েছেন।
আচ্ছা, চিন্তিত কণ্ঠে বললেন দিমিতার। যেকোনও মায়ের কাছেই অপ্রতিরোধ্য প্রলোভন হওয়ার কথা এটা। কিন্তু আর কোন কারণের কথা বলছেন। আপনি?
পয়গম্বরের নাম সোয়ে। বিহ্বল দেখাল দিমিতারকে। নামটার অক্ষরগুলোকে উল্টে দিন। তেনমাস হরফ ব্যবহার করুন, পরামর্শ দিল তাইতা। দিমিতারের বিভ্রান্তি কেটে গেল।
ইয়োস, ফিসফিস করে বললেন তিনি। আপনার কুকুরের দল ডাইনীর গন্ধ শুঁকে বের করে ফেলেছে, তাইতা।
আমাদের অবশ্যই এবার গন্ধ শুঁকে ঝটপট তার আস্তানায় ছুটে যেতে হবে। উঠে দাঁড়াল তাই। ভালো করে ঘুমিয়ে নিজেকে ঠিক করে নিন। সূর্যোদয়ের সময় মেরেনকে পাঠাব আপনাকে নিতে।
*
পুব আকাশের বুকে ভোরের আলো তখনও ক্ষীণ আভা মাত্র, দিমিতারের উট আর ঘোড়াসহ প্রাঙ্গণে ওদের জন্যে অপেক্ষা করছিল হাবারি। পালকিতে লম্বা হয়ে শুয়ে পড়লেন দিমিতার। ঘোড়ার পিঠে তার পাশে থেকে এগোতে লাগল তাইতা ও মেরেন। ওদের নদী পারাপারের জায়গায় নিয়ে এলো এসকর্ট। এখানে স্রেফ একটা রাক্ষুসে ব্যাঙ দেখতে পেল ওরা। ওদের এড়িয়ে গেল ওটা, বিনা ঝামেলায় নদী পেরুল ওরা। মেমননের প্রাসাদ পাশ কাটিয়ে পেছনের তোরণে চলে এলো, এখানে মেরেন ও হাবারির হেফাযতে বাহন রেখে এগোলো তাইতা ও দিমিতার। মিনতাকার প্রতিশ্রুতি মতো একজন পরিচারিকা ওদের স্বাগত জানাতে তোরণের ভেতরের দিকে অপেক্ষা করছিল। প্যাসেজ আর টানেলের গোলকধাঁধার ভেতর দিয়ে ওদের পথ দেখিয়ে এগিয়ে নিয়ে চলল সে, অবশেষে দরাজহাতে সাজানো একটা কামরায় পৌঁছুল ওরা। এখানে ধূপ আর সৌরভ ভুরভুর করছে। মেঝে রেশমী কাপড়ের গালিচা আর কুশনে ঢাকা। দেয়ালে ঝুলছে অসাধারণভাবে অলঙ্কৃত পদা। দেয়ালের দিকে এগিয়ে গিয়ে একটা পর্দা টানানো যেনানা জানালা ঢেকে রাখা হ্যাংগিং সরিয়ে ফেলল পরিচারিকা। দ্রুত সেটার দিকে এগিয়ে গেল তাইতা, অলঙ্কৃত নকশার ভেতর দিয়ে আম দরবারের দিকে তাকাল। আগের দিন মিনতাকার সাথে এখানেই দেখা করেছিল ও। এখন খা-খা করছে। সন্তুষ্ট হয়ে দিমিতারের কাছে ফিরে এসে হাত ধরে জানালার কাছে নিয়ে গেল ওকে। কুশনে বসল ওরা। বেশিক্ষণ অপেক্ষা করতে হলো না, পর্দার ওপাশ থেকে অচেনা এক লোক পা রাখল কামরায়।
মাঝ বয়সী, দীর্ঘদেহী, ছিপছিপে গড়নের লোকটা। কাঁধের উপর নেমে আসা ঘন চুলে ছোট সঁচাল দাড়ির মতোই পাক ধরেছে। পরনে যাজকীয় কালো লম্বা জোব্বা, স্কার্টে আধ্যাত্মিক প্রতাঁকের নকশা, গলায় ঝুলছে তাবিজ। কামরায় চক্কর দিতে শুরু করল সে। পর্দা সরিয়ে ভেতর পরখ করছে। যেনানা জানালার সামনে। এসে দাঁড়াল সে, পর্দার খুব কাছে নিয়ে এলো মুখটা। সুদর্শন, বুদ্ধিদীপ্ত চেহারা, কিন্তু সবচেয়ে বেশি চোখে পড়ার মতো জিসিনটা হচ্ছে তার চোখ: ধর্মান্ধদের চোখের মতো, অন্ধবিশ্বাস ঠিকরে পড়ছে সেখানে।
এটাই সোয়ে, ভাবল তাইতা। ওর মনে কোনও সন্দেহ নেই। নিজেদের আড়াল করার শক্তি একত্রিত করে বাড়ানোর জন্যে দিমিতারের হাত তুলে নিয়ে শক্ত করে ধরল। কারণ ওই লোকটার কী ধরনের অকাল্ট বিদ্যা আছে জানা নেই। পর্দার ভেতর দিয়ে লোকটার দিকে তাকিয়ে রইল। চারপাশে আড়ালের পর্দা টিকিয়ে রাখতে পুরো শক্তি কাজে লাগাচ্ছে। ঘোঁৎ করে একটা শব্দ করে ঘুরে দাঁড়াল সোয়ে। দূরে জানালার কাছে গিয়ে অপেক্ষা করতে লাগল। দূরের প্রাচীরের দিকে তাকিয়ে আছে। ভোরের কমলা আলোয় কয়লার মতো জ্বলজ্বল করছে ওটা।
লোকটাকে বিভ্রান্ত করার পর এবার অন্তর্চক্ষু খুলল তাইতা। সোয়ে সাধুপুরুষ নয় মোটেই, কারণ নিমেষে তার চারপাশে একটা আভা ফুটে উঠল। এমন আভা এর আগে আর দেখেনি ও অস্থির, এই প্রবলভাবে জ্বলে উঠছে, তারপরই আবার ক্ষীণ আভায় মিলিয়ে যাচ্ছে। পিঙ্গল ও কড়া লালের মাঝে উজ্জ্বল হয়ে উঠছে ওটার রঙ, তারপরই আবার মলিন, চাপা রূপ নিচ্ছে। নিষ্ঠুরতা আর নির্দয়তার কারণে দূষিত তীক্ষ্ণ বুদ্ধির অস্তিত্ব টের পেল তাই।
সোয়ের চিন্তাভাবনা বিভ্রান্ত, পরস্পরবিরোধী, তবে তার উল্লেখযোগ্য মানসিক শক্তি গড়ে তোলার ব্যাপারে কোনও সন্দেহ নেই।
হাসতে হাসতে একদল নারী কামরায় ঢুকতেই চট করে জানালার কাছ থেকে সরে এলো সোয়ে। মেয়েদের নেতৃত্বে রয়েছেন মিনতাকা, উত্তেজিতভাবে ছুটে গিয়ে প্রবল মমতায় সোয়েকে আলিঙ্গন করলেন তিনি। হকচকিয়ে গেল তাইতা। রানির পক্ষে দারুণ ব্যতিক্রমী আচরণ। কেবল একা থাকলেই তাইতাকে আলিঙ্গন করেন তিনি। পরিচারিকাদের সামনে নয়। সোয়ের কাছে কীভাবে প্রভাবিত হয়েছেন তিনি বুঝতে পারেনি ও। রানি সোয়ের কাঁধের উপর হাত রেখে দাঁড়িয়ে থাকার সময় পরিচারিকরা এসে হাঁটু মুড়ে বসল তার সামনে।
পবিত্র পিতা, আমাদের আশীর্বাদ করুন, মিনতি করল ওরা। এক ও অদ্বিতীয় দেবীর কাছে আমাদের পক্ষে প্রার্থনা করুন।
