না! হিংস্রভাবে চিৎকার করে উঠল তাইতা। আমাকে এভাবে রেখে যেতে পারো না তুমি! দাঁড়াও! অপেক্ষা করো! পিছনে ছুটল ও, মহিলা উধাও হয়ে যাবার মাত্র কয়েক সেকেন্ড বাদে বাকে পৌঁছাল। এখনও হাত বাড়িয়ে রেখেছে। পরক্ষণে থমকে দাঁড়াল ও, ওর চোখের সামনে উপত্যকার উঁচু প্রান্ত খুলে যেতেই দুহাত আবার স্কুলে পড়ল দুপাশে। ও যেখানে দাঁড়িয়ে আছে সেখান থেকে পঞ্চাশ গজ দূরে কানা গলিতে পরিণত হয়েছে রাস্তাটা; ধূসর পাথরের দেয়ালে পথ রুদ্ধ, এত খাড়া যে পাহাড়ী ছাগলের পক্ষেও ওটা বেয়ে ওঠা সম্ভব নয়। উধাও হয়ে গেছে। মহিলা।
লস্ত্রিস, তোমাকে প্রত্যাখ্যান করেছি বলে আমাকে ক্ষমা করো, প্রিয়া আমার। ওর ওপর চেপে বসল পাহাড়ের নৈঃশব্দ্য। অনেক কষ্টে নিজেকে সামলে নিল ও, অর্থহীন আবেদনের পেছনে সময় নষ্ট না করে দেয়ালের গায়ে ফাটলের খোঁজ করতে লাগল, যেখানে মেয়েটা গাঢাকা দিয়ে থাকতে পারে কিংবা উপত্যকা থেকে বেরিয়ে যাবার মতো গোপন দরজা। কিছুই পেল না। যে পথে এসেছিল সেদিকে তাকাল ও। দেখতে পেল উপত্যকার মেঝে পাহাড়ের শরীর থেকে খসে পড়া শাদা বালির হালকা আস্তরণে ঢাকা। ওর নিজের পায়ের ছাপ পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে, কিন্তু আর কোনও পায়ের ছাপ নেই। কোনও চিহ্ন ফেলে যায়নি সে। ক্লান্তভাবে লস্ত্রিসের সমাধির দিকে ফিরল ও। প্রবশে পথের সামনে দাঁড়িয়ে আস্তরণে খোদাই করা হিয়েরেটিক হরফে লেখাটা পড়ল। ছয় আঙুল পথ দেখাবে, জোরে জোরে পড়ল। কোনও মানে বুঝল না। পথ? কোনও রাস্তা, নাকি কোনও কায়দা বা কৌশল?
ছয় আঙুল? বিভিন্ন দিক দেখাচ্ছে ওগুলো, নাকি একটা? অনুসরণের ছয়টি ভিন্ন ভিন্ন সাইনপোস্ট? হতবুদ্ধি হয়ে গেল ও। জোরে খোদাইম্বালিপিটা ফের পড়ল: ছয় আঙুল পথ দেখাবে। ও পড়ার সময়ই মহিলার লেখা হরফগুলো মিলিয়ে যেতে শুরু করল। চোখের সামনে থেকে হারিয়ে গেল এক সময়। লস্ত্রিসের পোর্ট্রেট অক্ষত। সবগুলো বিকৃতি আবার নিখুঁতভাবে আগের অবস্থায় ফিরে গেছে। বিস্ময়ের সাথে হাত বাড়িয়ে ছবি স্পর্শ করল ও। উপরিতল মসৃণ, নির্মল।
পিছিয়ে এসে আবার পরখ করল। হাসিটা কি যেভাবে এঁকেছিল এখনও তেমনই আছে, নাকি বদলে গেছে? কোমল দেখাচ্ছে এখন, নাকি পরিহাস করছে? আন্তরিক, নাকি হেঁয়ালিতে পরিণত হয়েছে? ওটা কি দয়ার্দ্র, নাকি বৈরী? নিশ্চিত হতে পারল না।
তুমি কি লস্ত্রিস, নাকি আমাকে কষ্ট দিতে পাঠানো দুষ্ট কোনও অভিশাপ? জিজ্ঞেস করল ও। লস্ত্রিস কি এমন নিষ্ঠুর হতে পারে? তুমি সাহায্য আর নির্দেশনা দিতে চাইছ-নাকি আমার পথে ফাঁদ আর গহ্বর খুঁড়ে যাচ্ছ?
অবশেষে ঘুরে দাঁড়াল ও, তারপর সঙ্গীরা যেখানে অপেক্ষা করছে সেই দুর্গের উদ্দেশে রওয়ানা হলো। ঘোড়ায় চেপে থেবসের উদ্দেশে ফিরতি পথ ধরল ওরা।
*
ফারাও নেফার সেতির প্রাসাদে পৌঁছাতে পৌঁছাতে অন্ধকার ঘনিয়ে এলো। সবার আগে রামরামের কাছে এলো তাইতা।
ফারাও এখনও গোপন সভায় আছেন। পরিকল্পনা মতো আজ রাতে তোমার সাথে দেখা করতে পারবেন না তিনি। তার তলবের অপেক্ষা করতে হবে। তোমাকে নিজের মাদুরে শুয়ে পড়ার আন্তরিক অনুরোধ জানাচ্ছি। ক্লান্ত দেখাচ্ছে তোমাকে।
রামরামকে ছেড়ে দ্রুত দিমিতারের ঘরের দিকে এগোল ও। বাও বের্ডের সামনে মুখোমুখি বসে থাকতে দেখল বুড়ো আর মেরেনকে। তাইতাকে দেখেই স্বস্তি প্রকাশের নাটকীয় ভঙ্গিতে দাঁড়াল মেরেন। খেলাটার জটিলতা অনেক সময় ওর বোধের বাইরে ঠেকে। স্বাগত, ম্যাগাস। ঠিক সময় মতো এসে আমাকে অপমানের হাত থেকে বাঁচালেন।
দিমিতারের পাশে বসল তাইতা, ঝটপট স্বাস্থ্য ও মানসিক অবস্থার খবর দিল।
সফরের ক্লান্তি সামলে উঠেছেন বলে মনে হচ্ছে। আপনার ঠিক মতো যত্ন নেওয়া হচ্ছে তো?
আপনার উদ্বেগের জন্যে ধন্যবাদ। আসলেই ভালো আছি আমি, বললেন দিমিতার।
শুনে খুশি হলাম, কারণ কাল খুব ভোরে উঠতে হবে আমাদের। আপনাকে মেমনরের প্রাসাদে নিয়ে যাচ্ছি। ওখানে নতুন ধর্মের প্রচারকদের একজনের বাণী শুনব। এক নতুন দেবীর আগমনের ভবিষ্যদ্বাণী করছে সে, যিনি পৃথিবীর সকল জাতির উপর কর্তৃত্ব ফলাবেন।
হাসলেন দিমিতার। সত্যি বলতে প্রলয় পর্যন্ত কাজ চালানোর মতো দেবতার অভাব আছে আমাদের?
আহা, বন্ধু আমার, আমাদের চোখে এমনটা মনে হতে পারে বটে, কিন্তু পয়গম্বরের মতে পুরোনো দেবতাদের ধ্বংস করে ফেলতে হবে, তাদের মন্দির ধ্বংস করে দিতে হবে, ধুলোয় মিশিয়ে দিতে হবে তাদের যাজকদের।
ভাবছি এক এবং অদ্বিতীয় আহুরা মাদার কথা বলছে কিনা সে? তাহলে এটা কোনও নতুন ধর্ম নয়।
আহুরা মাযদা নয়, নতুন কেউ। তার চেয়ে অনেক ক্ষমতাশালী, ভীতিকর। মানুষের রূপে নেমে আসবেন এই দেবী, আমাদের মাঝে বাস করবেন। সাধারণ লোকজন তার রাজকীয় করুণা সরাসরি ভোগ করবে। মৃতকে জীবিত করা ও যোগ্যদের অমরত্ব ও চিরস্থায়ী সুখের ব্যবস্থা করার ক্ষমতা রাখেন তিনি।
এমন স্পষ্ট অর্থহীনতার সাথে কেন নিজেদের জড়াতে যাচ্ছি আমরা, তাইতা? বিরক্তির সাথে জানতে চাইলেন দিমিতার। মাথা ঘামানোর মতো আরও অনেক জরুরি সমস্যা আছে।
এই পয়গম্বর সাধারণ লোকের মাঝে গাঢাকা দিয়ে একই ধরনের কথাবার্তা প্রচার করে বেড়ানো আরও অনেকের একজন। মনে হচ্ছে, মিশরের রানি এবং ফারাও নেফার সেতির স্ত্রী মিনতাকাসহ অনেককেই ধর্মান্তরিত করে ফেলছে ওরা।
