ঘোড়ার দলকে দানাপানি খাইয়ে তরতাজা করে তুলতে সঙ্গীদের দুর্গের মূল প্রাঙ্গণের দেয়ালের কাছে রেখে পায়ে হেঁটে সামাধিক্ষেত্রের দিকে পা বাড়াল ও। রানি লখ্রিসের সমাধিতে যাবার পথ যতটা ভালো করে জানার কথা জানে ও। নিজেই লেআউটের নকশা করেছে ও, খনন কাজ তত্ত্বাবধান করেছে। লস্ত্রিসই মিশরের একমাত্র রানি যাকে গোরস্থানের এই অংশে কবরস্থ করা হয়েছে, সাধারণত ক্ষমতাসীন ফারাওর জন্যে সংরক্ষিত থাকে এটা। লস্ত্রিসের বড় ছেলে সিংহাসনে বসার পর তাকে ভুলিয়েভালিয়ে এর বরাদ্দ নিয়েছিল তাইতা।
ইহ জগত থেকে বিদায় নিয়ে পরজগতে পদার্পণের কথা ভেবে ফারাও নেফার সেতির সমাধি যেখানে নির্মাণ করা হচ্ছে সে জায়গাটা পার হয়ে এলো ও। রাজমিস্ত্রিতে গিজগিজ করছে জায়গাটা, পাথর কুঁদে মূল প্রবেশপথ নির্মাণ করছে ওরা। মাথার উপর নিপূণভাবে ঝুড়ি ফেলে আবর্জনা সরিয়ে নিয়ে যাচ্ছে সারিবদ্ধ শ্রমিকরা। হাওয়ায় ভেসে বেড়ানো মসৃণ ধূলোর পুরু আস্তরণ ওদের শরীরে। স্থপতি ও দাসদের সর্দারদের একটা ছোট দল ওদের মাথার উপর থেকে নিচের কাজের গতি জরিপ করছে। উপত্যকা জুড়ে বাটালি, বাইস আর পাথরের উপর গাইতি চালানোর আওয়াজ।
কারও দৃষ্টি আকর্ষণ না করেই শবযাত্রার পথ ধরে এগোল তাইতা, এক সময় উপত্যকা সরু হয়ে দুটি ভিন্ন পথে ভাগ হয়ে গেল। বাম দিকের পথ বেছে নিল ও। পঞ্চাশ কদম এগোনোর পরই একটা বাঁক ঘুরে লক্ট্রিসের সমাধির প্রবেশ পথে পৌঁছে গেল। ঠিক সামনেই রয়েছে ওটা। পাহাড়ের গায়ে বসানো। প্রবেশ পথ দৃষ্টিনন্দন গ্ৰানিটের স্তম্ভ ঘিরে রেখেছে, পাথরের ব্লকের দেয়ালে ঘেরাও করা, প্রলেপ লাগানোর পর অসাধারণভাবে রঙ করা মুরালে অলঙ্কৃত করা হয়েছে। রানির জীবনের বিভিন্ন দৃশ্য সাজানো হয়েছে তার কার্তুশের চারপাশে: স্বামী আর সন্তানদের নিয়ে দৈনন্দিন জীবনের সুখে লস্ত্রিস, রথ হাঁকাচ্ছে, নীলের জলে মাছ ধরছে, গেযেল ও পাখি শিকার করছে, হিকস্স হানাদারদের সেনাদলের বিরুদ্ধে সেনাবাহিনীকে নির্দেশ দিচ্ছে, নৌবহরে জনগণসহ নীলের বিভিন্ন জলপ্রপাত পাড়ি দিচ্ছে, এবং হিকস্সের চূড়ান্ত পরাজয়ের পর আবার দেশে ফিরিয়ে নিয়ে আসছে তাদের। আজ থেকে সত্তর বছর আগে নিজের হাতে এইসব দৃশ্য এঁকেছিল তাইতা, কিন্তু এখনও টাটকা রয়ে গেছে রঙ।
সমাধির প্রবেশ পথে আরেকজন শোককারী ছিল, দেবী আইসিসের সন্ন্যাসীনিদের আলখেল্লার মতো কাপড়ে আপাদমস্তক ঢাকা তার। মুরালের দিকে ফিরে প্রবল ভক্তির ভঙ্গিতে হাঁটু ভেঙে বসে আছে। সময় নিতে ইচ্ছে করে গতি কমাল তাইতা। ক্লিফের পায়ের কাছে ছায়ায় বসে বিশ্রাম নিতে একপাশে সরে গেল ও। ছবির লক্ট্রিসের চেহারা সুখ-স্মৃতির একটা চলমান ছবি চালু করে দিল। উপত্যকার এই দিকটা বেশ নিরিবিলি, আরও নিচের শ্রমিকদের কাজ-কর্মের হাঁকডাক পাথুরে দেওয়ালের কারণে চাপা পড়ে গেছে। খানিকক্ষণ সমাধির যাজিকার উপস্থিতির কথা ভুলে গেল ও, পরক্ষণেই উঠে আবার তার দিকে মনোযোগ ফেরাল।
মহিলা জোব্বার হাতার ভেতরে হাত চালিয়ে একটা ছোট ধাতব যন্ত্র-হয়তো বাটালি বা ছুরি-বের করে আনার সময়ও ওর দিকে পেছন ফিরে ছিল সে। এবার পায়ের আঙুলে ভর দিয়ে উঁচু হয়ে তাইতাকে ভীত বিহ্বল করে যন্ত্রের ডগা দিয়ে ইচ্ছে করেই মুরালের উপর আঘাত হানল সে। আরে, পাগল মেয়েমানুষ, করছ কী? চিৎকার করে উঠল ও। রাজকীয় সমাধির ক্ষতি করছ তুমি! এখুনি বন্ধ করো!
যেন ও কোনও কথাই বলেনি, ওকে উপেক্ষা করে গেল মহিলা, ঘনঘন আঘাত হেনে চলল লস্ত্রিসের মুখে। গভীর ক্ষতের ভেতর থেকে নিচের আস্তরণ বের হয়ে গেল।
লাফ দিয়ে উঠে দাঁড়াল তাইতা। চিৎকার করে চলেছে, থাম! শুনতে পাচ্ছ না! তোমার শ্রদ্ধেয়া মা এ খবর জানতে পারবেন। এই অপবিত্রতার জন্যে তোমার উপযুক্ত সাজা নিশ্চিত করব আমি। নিজের উপর দেবতাদের সাজা ডেকে আনছ তুমি…
তারপরেও ওর দিকে না তাকিয়ে প্রবেশ পথ ছেড়ে ইচ্ছাকৃত শিথিল পায়ে ওকে ছেড়ে উপত্যকার অন্য দিকে চলে গেল সন্ন্যাসীনি। রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে পিছু নিল তাইতা। এখন আর চিৎকার করছে না, তবে ডান হাতে ভারি ছড়িটা ধরে আছে। মহিলা যাতে অপরাধের শাস্তি থেকে রেহাই না পায়, সেটা নিশ্চিত করতে চায়। সহিংসতা ওর মন ভারি করে দিয়েছে। ঠিক ওই মুহূর্তে মহিলার মাথায় ঠকাস করে বাড়ি মেরে খুলি ফাটিয়ে দিত ও।
উপত্যকার তীক্ষ্ণ বাঁকে পৌঁছাল মহিলা। থেমে কাঁধের উপর দিয়ে তাকাল সে। তার মুখ আর চুল বলতে গেলে লাল শালে সম্পূর্ণ ঢাকা, কেবল চোখজোড়া দেখা। যাচ্ছিল।
ক্রোধ ও হাতাশা মিলিয়ে গেল তাইতার, বিস্ময় ও বিহ্বলতা সে জায়গা দখল করে নিল। মহিলার দৃষ্টি স্থির, প্রশান্ত, চোখজোড়া প্রবেশপথের রানির ছবির মতোই। এক মুহূর্ত নড়তে বা কথা বলতে পারল না ও। যখন ভাষা খুঁজে পেল, খরখরে শোনাল ওর কণ্ঠ: এ যে দেখছি তুমি!
এক ধরনের আভায় উজ্জ্বল হয়ে উঠল মহিলার চোখজোড়া, ফলে উজ্জ্বল হয়ে গেল ওর হৃদয়। মুখ চাদরে ঢাকা থাকলেও বুঝতে পারল ওর দিকে তাকিয়ে হাসছে। সে। ওর বিস্ময় সূচক কথার কোনও উত্তর না দিয়ে মাথা দোলাল সে। তারপর আবার ঘুরে ধীরস্থিরভাবে পাথর প্রাচীরের বাঁক ঘুরে চলে গেল।
