সোয়ে ওদের নেতা। তবে তাঁর অনেক নিচের কাতারের শিষ্যরা দুই রাজ্যের সাধারণ জনগণের ভেতর ঘুরে বেড়াচ্ছে, সুসমাচার ছড়িয়ে দিচ্ছে, তার আগমনের পথ সুগম করে তুলছে।
আপনার কথা আমার হৃদয়ে আলো জ্বালিয়ে দিয়েছে। আমার অবস্থানের কথা প্রকাশ না করে তার বয়ান শুনতে দিলে সারা জীবন আপনার কাছে কৃতজ্ঞ থাকব। আমার সাথে আরেকজন ম্যাগাস থাকবেন। এত জ্ঞানী ও বয়স্ক, আমার পক্ষে যেমনটি কোনওদিনই হওয়া সম্ভব নয়। আঙুল তুলে প্রতিবাদ না করে রানিকে নীরব থাকার ইঙ্গিত করল ও। কথাটা ঠিক, মিনতাকা। তাঁর নাম দিমিতার। ওই যেনানা জানালার পেছনে আমার সাথে বসে থাকবেন তিনি। একটা জটিল বুনটের পর্দার দিকে ইশারা করল ও, আগের দিনে ওটার পেছন থেকে রানি ও উপপত্নীরা চেহারা না দেখিয়েই বিদেশী গণ্যমান্যদের সাথে সাক্ষাৎ করতেন।
তবু ইতস্তত করতে লাগলেন মিনতাকা, কিন্তু নাছোড়বান্দার মতো লেগে রইল তাইতা। দুজন প্রভাবশালী ম্যাগাইকে নতুন ধর্মে দীক্ষা দিতে পারবেন আপনি। সোয়ে ও নতুন দেবীকে একসাথে খুশী করতে পারবেন। আপনার দিকে প্রসন্ন দৃষ্টিতে তাকাবেন তিনি। তখন তাঁর কাছে আপনার সন্তানদের ফিরিয়ে দেওয়াসহ যেকোনও বর চাইতে পারবেন।
ঠিক আছে, তাতা, তোমার কথামতোই করব। তবে তার বিনিময়ে আমার আজকের কথাগুলো নেফারকে বলবে না, যতক্ষণ না দেবীকে মেনে নেওয়া আর প্রাচীন দেবতাদের প্রত্যাখ্যানের সময় হচ্ছে তাঁর…
আপনার হুকুম মতোই করব, রানি আমার।
তুমি আর তোমার সহকর্মী দিমিতারকে অবশ্যই কাল খুব সকালে ফিরে আসতে হবে। মূল দরজার বদলে পেছন দরজা দিয়ে আসবে। আমার এক পরিচারিকা তোমাদের এই কামরায় নিয়ে আসবে, তখন তোমরা ওই পর্দার পেছনে আশ্রয় নিতে পারবে।
সূর্য উদয়ের এক ঘণ্টার মধ্যেই আসব আমরা, ওকে নিশ্চিত করল তাইতা।
*
মেমননের প্রাসাদের তোরণ হয়ে বেরিয়ে আসার সময় বিকেলের সূর্যের উচ্চতা যাচাই করল তাইতা। এখনও দিনের আলোর বেশ কয়েক ঘণ্টা হাতে আছে। হঠাৎ কী ভেবে রক্ষীদের সার্জেন্টকে থেবসে যাবার সোজা পথ বেছে নিতে নিষেধ করল ও। তার বদলে কবরস্থানের পথে ঘুর পথে পশ্চিমের পাহাড় ও বিশাল রাজকীয় নেক্রোপলিসের দিকে এগোল। একটা পাথুরে উপত্যকার আড়ালে রয়েছে ওটা। প্রাণপ্রিয় লখ্রিসের জাগতিক দেহে মলম মাখানোর বিষয়টি যেখানে তত্ত্বাবধান করেছিল ও, সত্তর বছর আগের ঘটনা এটা। কিন্তু সময় সেই ভীষণ অনুষ্ঠানের স্মৃতি এতটুকু ম্লান করতে পারেনি। মাদুলিটা স্পর্শ করল ও, লস্ত্রিসের একগাছি চুল রাখা আছে ওতে। পাহাড়ের পাদদেশ ধরে উঠতে লাগল ওরা। হাথরের মন্দির পাশ কাটাল: পাথুরে টেরেসের পিরামিডের চূড়ায় বসানো দৃষ্টিনন্দন প্রাসাদ। নিচের টেরেসে পায়চারীরত পুরোহিতিনীকে চিনতে পারল তাইতা, আরও দুজন নবীশ রয়েছে তার সথে। তার সাথে কথা বলতে একপাশে সরে এলো।
ঐশী হাথর আপনাকে রক্ষা করুন, মা, ঘোড়ার পিঠ থেকে নামার সময় তাকে শুভেচ্ছা জানাল ও। হাথর হচ্ছেন মহিলাদের পৃষ্ঠপোষক দেবী। তাই প্রধান পুরোহিতও একজন নারী।
শুনেছি আপনি সফর শেষে ফিরে এসেছেন, ম্যাগাস, ওকে আলিঙ্গন করলেন তিনি। আমরা সবাই আশা করছিলাম, আপনি এখানে আসবেন, আমাদের আপনার অভিযানের গল্প শোনাবেন।
সত্যি, অনেক কথা বলার আছে আমার, আপনাদের ভালো লাগবে আশা করি। মেসোপটেমিয়া, একবাতানা ও বাবিলনের ওধারে যার উপর দিয়ে খোরাশান মহাসড়ক চলে গেছে সেই পাহাড়ি ভূমির প্যাপিরাস মানচিত্র নিয়ে এসেছি আমি।
আমাদের জন্যে অনেক কিছুই নতুন হবে, সাগ্রহে হাসলেন প্রধান পুরোহিতীনি। সাথে এনেছেন ওগুলো?
আরে, না! অন্য কাজে বেরিয়েছি আজ, এখানে আপনার সাথে দেখা হয়ে যাবে ভাবিনি। থেবসে স্ক্রোল রেখে এসেছি। তবে পয়লা সুযোগেই নিয়ে আসব ওগুলো।
সেটা খুব শিগগির হবার নয়, ওকে আশ্বস্ত করলেন প্রধান পুরোহিতীনি। এখানে সবসময়ই আপনি স্বাগত। আপনার ইতিমধ্যে দেওয়া তথ্যের জন্যে আমরা কৃতজ্ঞ। এখন আপনার কাছে যা আছে সেটাও মনোমুগ্ধকর হবে বলেই আমি নিশ্চিত।
তাহলে আপনার মহত্বের সুযোগটুকু নেব আমি। আপনার কাছে একটা উপকার চাইতে পারি?
আমার কাছে পাওয়ার মতো কোনও উপকার থাকলে সেটা পেয়ে গেছেন আপনি। মুখ ফুটে বলুন শুধু।
অগ্নিগিরি নিয়ে বেশ কৌতূহলী হয়ে উঠেছি আমি।
কোনটা? হাজারে হাজারে আছে, অনেক দেশে ছড়িয়ে আছে।
পাহাড়ের কাছাকাছি বা কোনও দ্বীপে, বা কোনও হ্রদ কিংবা বিশাল নদীর কিনারের গুলো। একটা তালিকা দরকার আমার, মা।
বেশ কঠিন অনুরোধ, ওকে নিশ্চিত করলেন তিনি। ভাই নুবাঙ্ক, আমাদের একজন প্রবীন মানচিত্র শিল্পী সব সময়ই আগ্নেয়গিরি ও উষ্ণতার অন্যান্য ডুবো উত্স নিয়ে দারুণ কৌতূহলী, যেমন উষ্ণ প্রস্রবণ ও গেইসার। খুশি মনেই আপনার তালিকা তৈরি করে দেবেন তিনি। তবে ধরে নিন অনেক বিস্তারিত ও ক্লান্তিকর হবে সেটা। নুবাঙ্ক এত বেশি খুঁতখুঁতে যে এটাই তার দোষ। এখুনি কাজ শুরু করতে বলছি তাকে।
কত সময় লাগতে পারে?
আপনি কি আগামী দশদিনের ভেতর এদিকে আসবেন, সম্মানিত ম্যাগাস? জানতে চাইলেন তিনি।
বিদায় নিল তাইতা, তারপর নেক্রোপলিসের ভিন্ন একটা তোরণের দিকে এগোল।
*
এক বিশেষ সামরিক দুর্গ রাজকীয় সমাধির আশ্রয় নেক্রোপলিস পাহারা দিচ্ছে। প্রতিটিতে ডুবন্ত চেম্বারের কমপ্লেক্স রয়েছে, নিরেট পাথর কুঁদে নির্মাণ করা হয়েছে এসব। ঠিক কেন্দ্রে রয়েছে সমাধি চেম্বার, যেখানে দাঁড়িয়ে আছে অসাধারণ রাজকীয় পাথুরে শাবাধার, ফারাওর মামিকৃত মরদেহ রয়েছে তাতে। এই চেম্বারের চারপাশে ছড়িয়ে রাখা হয়েছে স্টোররুম আর গুদামঘর, অপরিমেয় রত্নভাণ্ডারে ঠাসা সেগুলো। কেউ জানে না এর কথা। দুটি রাজ্য ও এর সীমান্তের বাইরের অন্য দেশের সমস্ত চোর আর ডাকাতের লোভের কারণ হয়েছে এটা। পবিত্র এনক্লোজারে ঢুকতে সব সময়ই সুচতুর প্রয়াস পেয়ে আসছে তারা। ওদের ঠেকাতে ছোটখাট একটা সেনাদলের স্থায়ী প্রহরার প্রয়োজন হয়েছে।
