এই নতুন আশায় সান্ত্বনার সন্ধান থেকে রানিকে বাঞ্চিত করতে চাইল না তাইতা। এসব ব্যাপার আমাদের বোঝার মতো নয়, এতই বিস্ময়কর, গম্ভীর কণ্ঠে বলল ও।
হ্যাঁ, ঠিক! পয়গম্বরকে তোমার কাছে ব্যাখ্যা করতে হবে ব্যাপারটা। কেবল তখনই উজ্জ্বল স্ফটিকের মতো পরিষ্কার হয়ে যাবে। তোমার মনে সন্দেহ থাকতে পারবে না।
কে এই পয়গম্বর?
তাঁর নাম সোয়ে।
কোথায় পাওয়া যাবে তাকে, মিনতাকা? জানতে চাইল তাইতা।
উত্তেজনায় হাতে তালি দিলেন রানি। ওহ, তাইতা, এটাই আসল কথা, চিৎকার করে উঠলেন তিনি। আমার প্রাসাদেই আছেন! প্রাচীন দেবতা অসিরিস, হোরাস ও আইসিসের পুরোহিতদের হাত থেকে তাকে আশ্রয় দিয়েছি আমি। সত্য কথা বলার কারণে ওরা তাঁকে ঘৃণা করে। তাঁকে হত্যা করার অনেক চেষ্টা করেছে। রোজ আমাকে ও তার পছন্দসই লোকজনকে নতুন ধর্মে দীক্ষা দেন তিনি। এত চমৎকার একটা ধর্ম, তাইতা, এমনকি তুমিও দূরে ঠেলে রাখতে পারবে না, তবে তা গোপনে শিখতে হবে। মিশর এখনও অর্থহীন কুসংস্কারের আচ্ছন্ন। নতুন ধর্ম বিকাশের আগে ওদের শিক্ষিত করে তুলতে হবে। সাধারণ লোকজন এখনও এই নতুন দেবীকে মেনে নিতে তৈরি নয়।
চিন্তিতভাবে মাথা দোলাল তাইতা। রানির জন্যে গভীর করুণা বোধ করছে। কষ্টের শেষ সীমায় পৌঁছে যাবার পর লোকের বাঁচার জন্যে অর্থহীনভাবে হাওয়ায় আঁচড় কাটার চেষ্টা করার ব্যাপারটা ও বোঝে। নতুন চমৎকার এই দেবীর নাম কী?
অবিশ্বাসীদের মুখে তার নাম উচ্চারিত হতে পারবে না, এতই পবিত্র তিনি। কেবল যারা তাকে মনে-প্রাণে মেনে নিয়েছে তারাই তার নাম মুখে নিতে পারবে। এমনকি তার নাম বলার আগে আমাকেও সোয়ের কাছে দীক্ষা নিতে হয়েছে।
সোয়ে কখন আপনাকে দীক্ষা দিতে আসবে? তার মুখে এই বিস্ময়কর তত্ত্বের ব্যাখ্যা শুনতে চাই।
না, তাইতা, বলে উঠলেন রানি। তোমাকে বুঝতে হবে, এগুলো তত্ত্ব নয়। সত্যের প্রকাশ। রোজ সকাল-সন্ধ্যা আমার কাছে আসেন সোয়ে। ওর মতো এমন জ্ঞানী ও পবিত্র পুরুষ আমি জীবনে দেখিনি। রানির উজ্জ্বল অভিব্যাক্তি সত্ত্বেও ফের তার চোখ বেয়ে জল গড়াতে শুরু করল। কথা দাও, তুমি তার কথা শুনতে আসবে।
আমার উপর আস্থা স্থাপন করায় আপনার কাছে আমি কৃতজ্ঞ, প্রিয় রানিমাতা। কখন সেটা?
আজ সন্ধ্যায়। সাপারের পর, জানালেন তিনি।
এক মুহূর্ত ভাবল তাই। আপনি বললেন কেবল মনোনীতদেরই দীক্ষা দেয় সে। যদি আমাকে প্রত্যাখ্যান করে? তাহলে রাগ হবে আমার।
কখনওই তোমার মতো জ্ঞানী ও বিখ্যাত লোককে ফিরিয়ে দেবেন না তিনি, মহান ম্যাগাস।
আমি সে ঝুঁকি নিতে যাব না, প্রাণপ্রিয় মিনতাকা। আমার পরিচয় প্রকাশ না করে তার কথা শোনার ব্যবস্থা করা যায় না?
সন্দিহান চোখে ওর দিকে তাকালেন মিনতাকা। তাঁকে ঠকাতে চাই না, অবশেষে বললেন তিনি।
কোনও রকম ঠকবাজির কথা ভাবছি না আমি। তার সাথে কোথায় দেখা হবে আপনার?
এই মহলেই, তুমি যেখানে বসে আছে, তিনিও ওখানেই বসবেন। ওই কুশনেই।
কেবল আপনারা দুজনই থাকবেন?
না, আমাদের সাথে আরও তিনজন প্রিয় মহিলা থাকবে। আমার মতোই দেবীর ভক্ত ওরা।
সতর্কতার সাথে কামরাও নকশা জরিপ করছিল তাইতা। কিন্তু রানির মনোযোগ বিক্ষিপ্ত করতে একের পর এক প্রশ্ন করতে লাগল ও। এই দেবী কি নিজেকে কখনও মিশরের জনগণের কাছে নিজেকে প্রকাশ করবেন? নাকি স্রেফ তার মনোনীত অল্প কয়েকজনের কাছেই তার ধর্ম প্রকাশিত হবে?
নেফার আর আমি মনে প্রাণে তাঁকে বরণ করার পর মিথ্যা দেবতাদের প্রত্যাখ্যান করে তাদের মন্দির ধ্বংস করে পুরোহিত সমাজকে ছত্রভঙ্গ করে দেব, তখনই দেবী বিজয়ীর বেশে আবির্ভূত হবেন। প্লেগের অবসান ঘটাবেন তিনি, তার পরিণতি ভোগান্তি দূর করবেন। নীল নদকে আবার প্রবাহিত হওয়ার নির্দেশ দেবেন… একটু দ্বিধা করলেন তিনি, তারপর ফের দ্রুত কথা বলতে লাগলেন। …আমার বাচ্চাদের আবার ফিরিয়ে দেবেন।
প্রাণপ্রিয় রানি। সত্যি যদি তাই হতো। যাক, একটা কথা বলুন, নেফার কি এই পরিস্থিতির কথা জানেন?
দীর্ঘশ্বাস ফেললেন তিনি। নেফার জ্ঞানী, অসাধারণ শাসক। মহান যোদ্ধা। ভালোবাসায় ভরা স্বামী ও পিতা। কিন্তু আধ্যাত্মিক পুরুষ নন তিনি। কেবল উপযুক্ত সময়েই ওর কাছে সব কথা খুলে বলবেন বলে আমার সাথে একমত হয়েছেন সোয়ে। সেই সময় এখনও হয়নি।
গম্ভীরভাবে মাথা দোলাল তাইতা। নিজের স্ত্রীর কাছে দাদা-দাদী, বাবা-মা আর বলা বাহুল্য ত্রয়ী অসিরিস, আইসিস ও হোরাসের পাইকারী প্রত্যাখ্যানের খবর শুনে ভালো ধাক্কাই খাবেন নেফার সেতি। এমনকি তাঁকেও ঐশী পরিচয় থেকে বঞ্চিত করা হবে। বেঁচে থাকতে তিনি এমনটি ঘটতে দেবেন না, এটুকু বোঝার মতো তাঁকে চিনি বলেই মনে হয়।
চিন্তাটা এক ভীতিকর সম্ভাবনার স্রোত বইয়ে দিল তাইতার মনে। নেফার সেতি ও তাঁর ঘনিষ্ঠ সহযোগি আর পরামর্শকগণ পয়গম্বরকে ঠেকাতে জীবিত না থাকলে এমন এক রানিকে খেলাতে পারবে যিনি বিনা প্রশ্নে, কোনও প্রতিশোধ ছাড়াই সোয়ের সব নির্দেশ পালন করবেন। তিনি কি রাজা, তাঁর স্বামী ও সন্তানদের বাবার হত্যাকাণ্ডে সায় দেবেন? আপন মনে প্রশ্ন করল তাইতা। উত্তরটা পরিষ্কার: হ্যাঁ, দেবেন। যদি নতুন নামহীন দেবীর হাতে মৃত বাচ্চাদের সাথে তাঁরও আবার বেঁচে ওঠার ব্যাপারে নিশ্চিত হতে পারেন। মরিয়া মানুষ বেপরোয়া পরীক্ষায় মেতে ওঠে। চড়া গলায় ও জানতে চাইল: সোয়েই কি এই মহান দেবীর একমাত্র পয়গম্বর?
