ঘোড়াগুলো অগভীর কর্দমাক্ত পুকুরগুলোর একটায় পড়ল, পশ্চিম তীরের দিকে এগিয়ে চলল তারপর। ওরা প্রাসাদের দৃষ্টিসীমায় আসার সাথে সাথে হাঁ করে তোরণ খুলে গেল, ওদের সাথে যোগ দিতে এগিয়ে এলো দ্বার রক্ষক।
হে মহান ম্যাগাস, স্বাগতম! তাইতাকে অভিবাদন করল সে। মহারানি থেবসে আপনার আগমনের অপেক্ষা করছেন, আপনাকে আনন্দময় শুভেচ্ছা পাঠিয়েছেন তিনি। আপনাকে বরণ করতে অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছেন। প্রাসাদ তোরণের দিকে ইঙ্গিত করল সে। চোখ তুলে তাকিয়ে দেয়ালের উপর ক্ষুদে ক্ষুদে অবয়ব দেখতে পেল তাইতা। নারী ও শিশু ওরা, ওর উদ্দেশে হাত নাড়ার আগে ওদের ভেতর রানি কোনজন নিশ্চিত হতে পারল না। মেয়ার আগে বাড়াল ও। সামনে লাফ দিল ওটা। খোলা তোরণ দিয়ে বয়ে নিয়ে চলল ওকে। উঠোনে ঘোড়ার পিঠে থেকে নামার সময় পাথুরে সিঁড়ি ভেঙে কিশোরীর চঞ্চলা নিয়ে নেমে এলেন মিনতাকা। আগাগোড়াই অ্যাথলিট ছিলেন তিনি, দক্ষ রথ চালক, এবং নিপূণ শিকারী। তাকে এখনও তেমনি সাবলীল দেখতে পেয়ে খুশি হলো তাই। তবে ওকে আলিঙ্গন করতে কাছে আসার পর বুঝতে পারল তিনি কতটা শীর্ণকায় হয়ে গেছেন। বাহুগুলো যেন সরু কাঠির মতো, চেহারা মলিন, ফ্যাকাশে। তিনি হাসলেও গভীর চোখজোড়ায় বিষাদের ছায়া খেলা করছে।
ওহ, তাইতা। তোমাকে ছাড়া যে কীভাবে চলেছে বোঝাতে পারব না, বললেন তিনি। ওর দাড়িতে মুখ লুকোলেন। তাঁর মাথায় হাত বুলিয়ে দিল তাইতা। ওর স্পর্শে তার হাসিখুশি ভাবটুকু মিলিয়ে গেল। কান্নার দমকে কেঁপে কেঁপে উঠতে লাগল গোটা শরীর। আমি ভেবেছিলাম তুমি আর কোনও দিন ফিরবে না, নেফার আর আমি খাবা ও ছোট্ট উনাসের মতো তোমাকেও হারিয়ে ফেলেছি।
আপনার দুঃখের কথা শুনেছি। আপনার সাথে আমিও শোকাহত, বিড়বিড় করে বলল তাইতা।
সাহস বজায় রাখার চেষ্টা করছি। আমার মতো আরও অনেক মা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কিন্তু এত অল্প বয়সে আমার কোলের শিশুদের ছিনিয়ে নেওয়ার ব্যাপারটা খুবই তিক্ত। একটু পেছনে হটে দাঁড়িয়ে হাসার প্রয়াস পেলেন তিনি। কিন্তু জলে ভরে আছে তার চোখজোড়া, ঠোঁট কাঁপছে। এসো। তোমার সাথে অন্য বাচ্চাদের পরিচয় করিয়ে দিই। ওদের বেশির ভাগকেই চেন তুমি। শুধু সবচেয়ে ছোট দুটি তোমাকে কখনও দেখেনি। তোমার জন্যে অপেক্ষা করছে ওরা।
দুই সারিতে ভাগ হয়ে দাঁড়িয়েছিল ওরা। ছেলেরা সামনের কাতারে, ওদের পেছনে মেয়েরা। বিস্ময় ও সমীহে আড়ষ্ট সবাই। ভাইবোনদের কাছে মহান ম্যাগাসের গল্প শুনে সবচেয়ে ছোট্ট মেয়েটি এতটাই নার্ভাস ছিল যে তাইতা ওর দিকে তাকাতেই কান্নায় ভেঙে পড়ল। ওকে কোলে তুলে নিয়ে ঘাড়ের উপর ওর মাথা রেখে ফিসফিস করে কথা বলল তাইতা। সাথে সাথে সহজ হয়ে গেল সে। কান্না রেখে দুই হাতে তাইতার গলা জড়িয়ে ধরল।
বাচ্চা ও পশু ভোলানোয় তোমার নৈপূণ্যের কথা জানা না থাকলে বিশ্বাস করতাম না, ওর দিকে চেয়ে হাসলেন মিনতাকা। তারপর অন্যদের এক এক এগিয়ে আসতে বললেন।
এত সুন্দর বাচ্চা জীবনে দেখিনি আমি, রানিকে বলল তাইতা। কিন্তু আমি তাতে অবাক হইনি। মা হিসাবে আপনাকে পেয়েছে ওরা।
অবশেষে বাচ্চাদের বিদায় দিয়ে তাইতার হাত ধরলেন মিনতাকা। খাস কামরায় নিয়ে এলেন ওকে। এখানে একটা ভোলা জানালার পাশে বসে হাওয়া খেতে খেতে পশ্চিমের পাহাড়সারির দিকে চোখ ফেরালেন। ওকে শরবত ঢেলে দেওয়ার সময় বললেন, আগে নদীর দিকে তাকিয়ে থাকতাম আমি, কিন্তু এখন আর পারি না। ওই দৃশ্য আমার মন ভেঙে দিয়েছে। তবে শিগগিরই জল ফিরে আসবে, এমন ভবিষ্যদ্বাণীই করা হয়েছে।
কে করেছে? অলস কণ্ঠে জানতে চাইল তাইতা। কিন্তু উত্তরে রানি সবজান্তা, হেঁয়ালিমাখা হাসায় কৌতূহল চাগিয়ে উঠল ওর। তারপর কথোপকথন সুখের সময়ের দিকে বাঁক নিল। যখন রানি ছিলেন অল্পবয়সী, সুন্দরী কুমারী বধূ, এই দেশ ছিল সবুজ, সুন্দর। রানির মেজাজ হালকা হয়ে এলো, প্রাণবন্তভাবে কথা বলতে লাগলেন। ওকে শেষ করার সুযোগ দিল তাইতা, জানে, রহস্যময় ভবিষ্যদ্বাণীর প্রসঙ্গে ফিরে আসতে দেরি করবেন না তিনি।
সহসা স্মৃতিচারণ থামালেন রানি। তাইতা, আমাদের দেবতারা দুর্বল হয়ে পড়েছেন, জানো তুমি? অচিরেই এক নতুন দেবী ওদের জায়গা দখল করবেন। তাঁর হাতেই থাকবে সর্বময় ক্ষমতা। আবার নীল নদের প্রাণ ফিরিয়ে আনবেন তিনি, পুরোনো, বিধ্বস্ত দেবতারা যা পারেননি তিনি সেই প্লেগ দূর করবেন।
সমীহের সাথে শুনছে তাই। না, মহামান্যা, এটা আমার জানা ছিল না।
আরে, হ্যাঁ, এতে সন্দেহের অবকাশ নেই। রানির ফ্যাকাশে চেহারা নতুন আলোয় উজ্জ্বল হয়ে উঠল, বয়স কমে এলো যেন। ফের তরুণী হয়ে উঠেছেন তিনি, আশা ও আনন্দে ভরপুর। কিন্তু, তাইতা, কথা আরও আছে। ভবিষ্যদ্বাণী করার ঢঙে থামলেন তিনি, তারপর ফের খেই ধরলেন। দ্রুত কথা বলছেন এখন। আমাদের যা কিছু হারিয়েছে বা জোর করে কেড়ে নেওয়া হয়েছে তার সবই আবার ফিরিয়ে দেওয়ার ক্ষমতা আছে এই দেবীর, কিন্তু আমরা তাঁকে পুরোপুরি মেনে নিলেই সেটা সম্ভব হবে। আমাদের মন-প্রাণ তাঁকে সঁপে দিলে, তিনি আমাদের তারুণ্য ফিরিয়ে দেবেন। যারা কষ্ট পাচ্ছে, কাঁদছে, তাদের আবার সুখী করে তুলতে পারবেন। কিন্তু, ভেবে দেখ, তাইতা-এমনকি মৃতদের ফিরিয়ে দেওয়ার ক্ষমতাও তার আছে। আবার তার চোখ জলে ভরে উঠল। উত্তেজনায় শ্বাসরুদ্ধকর অবস্থা হওয়ায় কণ্ঠস্বর কাঁপতে শুরু করেছে, যেন এইমাত্র লম্বা পথ দৌড়ে এসেছেন। আমাকে বাচ্চাদের ফিরিয়ে দিতে পারবেন! খাবা আর উনাসের উষ্ণ, জীবন্ত শরীর ফের কোলে নিতে পারব, ওদের ছোট্ট মুখে চুমু খেতে পারব।
