কত বয়স হলো তাঁর? মনে করার চেষ্টা করল তাইতা। বাবা নিহত হওয়ার সময় ওর বয়স ছিল বার, সুতরাং এখন তার বয়স অন্তত পক্ষে উনপঞ্চাশ। উপলব্ধিটুকু টলিয়ে দিল ওকে। পঁয়তাল্লিশ বছর বয়সেই সাধারণ একজন মানুষকে বৃদ্ধ বিবেচনা করা হয়। সাধারণত পঞ্চাশ বছরে পা দেওয়ার আগেই মারা যায়। রামরাম সত্যি কথাই বলেছে। ফারাও অনেক বদলে গেছেন।
রামরাম তোমার থাকবার ব্যবস্থা করেছে? জানতে চাইলেন ফারাও, তাইতার কাঁধের উপর দিয়ে চেম্বারলেইনের দিকে তাকলেন।
ওকে বিদেশী দূতদের জন্যে তুলে রাখা একটা স্যুট দেওয়ার কথা ভাবছিলাম আমি, প্রস্তাব রাখল রামরাম।
তাইতাকে কোনওভাবেই বিদেশী বলা যাবে না, ধমকে উঠলেন নেফার। তাইতা বুঝতে পারল তার আগের ভালো মেজাজ এখন তেতে উঠেছে, বেশ সহজেই ক্ষেপে উঠছেন তিনি। আমার খাস কামরার দরজার কাছে প্রহরীদের কামরাতেই ওর থাকার ব্যবস্থা করতে হবে। রাতের যেকোনও সময় পরামর্শ ও আলোচনার জন্যে ওকে কাছে পেতে চাই। ঘাড় ফিরিয়ে সরাসরি তাইতার দিকে তাকালেন তিনি। এখন তোমার কাছ থেকে বিদায় নিতে হচ্ছে। বাবিলনের দূতের সাথে আলোচনায় বসতে যাচ্ছি। আমাদের কাছে বিক্রি করা শস্যের দাম তিনগুন বাড়িয়ে দিয়েছে ওরা। রামরাম রাষ্ট্রীয় সমস্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় জানাবে তোমাকে। আশা করছি মাঝরাত নাগাদ অবসর পাব। তখন ডেকে পাঠাব তোমাকে। আমার সাথেই রাতের খাবার খেতে হবে তোমাকে, যদিও আমার ধারণা, তোমার সেটা ভালো লাগবে না। আমার নির্দেশে দেশের বাকি লোকজনের মতো দরবারও একই খাবার উপভোগ করছে। গোপন দরজা পথে ফিরে গেলেন নেফার সেতি।
জাঁহাপনা, তাইতার কণ্ঠে তাগিদের সুর। চওড়া কাঁধের উপর দিয়ে ফিরে তাকালেন নেফার সেতি। হড়বড় করে কথা বলে গেল তাইতা। আমার সাথে একজন মহান জ্ঞানী ম্যাগাস আছেন।
তোমার চেয়ে ক্ষমতাশালী নয় নিশ্চয়ই, প্রশ্রয়ের সাথে হাসলেন নেফার সেতি।
ঠিক তাইতা, তার পাশে আমি শিশুর মতো। তিনি আপনাকে ও আপনার রাজত্বকে সাহায্য ও রক্ষা করতে এসেছেন।
এখন সে কোথায়?
নগর প্রাচীরের বাইরে আছেন এখন। বিপুল বিদ্যা সত্ত্বেও অনেক বয়স্ক, শারীরিকভাবে দুর্বল। আমার তার কাছাকাছি থাকা দরকার।
রামরাম, প্রাসাদের এই অংশে বিদেশী ম্যাগাসের জন্যে আরামদায়ক থাকার ব্যবস্থা করো।
মেরেন ক্যাম্বিসেস এখনও আমার সঙ্গী হিসাবে রয়েছে, আমাকে পাহারা দিচ্ছে। ওকে হাতের কাছে পেলে অনেক খুশি হবো।
হায় হোরাস, মনে হচ্ছে তোমার সাথে গোটা দুনিয়া ভাগাভাগি করতে হবে আমাকে, হেসে উঠলেন নেফার সেতি। অবশ্য মেরেন সুস্থ আছে শুনে খুশি হলাম, ওকে সঙ্গী হিসাবে পেতে যাচ্ছি। রামরাম ওর থাকার ব্যবস্থা করে দেবে। এবার তবে যেতে হচ্ছে।
ফারাও, আপনার অসীম ধৈর্যের আরেকটা প্রত্যক্ষ নজীর, তিনি অদৃশ্য হওয়ার আগেই বলে উঠল তাইতা।
এখানে এসেছ বেশিক্ষণ হয়নি, অথচ এর ভেতর আমার কাছ থেকে পঞ্চাশটি সুবিধা আদায় করে নিয়েছ। তোমার লেগে থাকার ক্ষমতা অসীম। আর কী চাই তোমার?
নদী অতিক্রম করে রানি মিনতাকাকে অভিনন্দন জানানোর অনুমতি।
আমি প্রত্যাখ্যান করলে নিজেকে বৈরী অবস্থানে স্থাপন করব। আমার রানি মেজাজ হারাননি। আমার প্রতি নিষ্ঠুর হয়ে উঠবেন তিনি। স্ত্রীর প্রতি ভালোবাসা থেকে হাসলেন তিনি। ওর কাছে অবশ্যই যাবে তুমি, তবে মাঝরাতের আগেই ফিরে এসো।
*
রাজপ্রাসাদে দিমিতারের থাকার ব্যবস্থা হওয়ার পরপরই রাজকীয় চিকিৎসকদের দুজনকে ওর চিকিৎসার জন্যে তলব করল তাইতা। তারপর মেরেনকে একপাশে ডেকে নিয়ে বলল, রাত নামার আগেই ফিরে আসার আশা করছি, ওকে ঠিক মতো পাহারা দিয়ে।
আপনার সাথে যাওয়া উচিত আমার, ম্যাগাস। অভাব ও দুর্ভিক্ষের এমন একটা সময়ে সৎ মানুষও নিজের পরিবারের খাবারের যোগাড় করতে হতাশা থেকে রাহাজানির পথ বেছে নেয়।
রামরাম এক দল পাহারাদার দিয়েছে আমার সাথে।
নীল নদের মতো একটা নদী পেরুনোর জন্যে নৌকায় না উঠে ঘোড়ার পিঠে চেপে বসাটা অদ্ভুত ঠেকল। উইন্ডস্মোকের পিঠে থেকে পশ্চিম তীরের মেমননের প্রাসাদের দিকে দৃষ্টি ফেরাল তাইতা, লক্ষ করল ঘঘালাটে পুকুরের ভেতর দিয়ে অনেকগুলো পায়ে চলা পথ চলে গেছে। এমনি একটা পথে আগে বাড়ল ওরা। তাইতার মেয়ারের সামনে লাফিয়ে রাস্তা পার হলো একটা রাক্ষুসে কুনো ব্যাঙ।
মেরে ফেল! ধমকে উঠল প্রহরী দলের সর্দার। এক সৈনিক বর্শা বাগিয়ে ধরে রাস্তা ধরে ধেয়ে গেল। কোণঠাসা বুনো শূকরের মতো হিংস্র ভঙ্গিতে আত্মরক্ষার জন্যে ঘুরে দাঁড়াল ওটা। সৈনিক সামনে ঝুঁকে কম্পিত লাল গলায় বর্শাটা সেঁধিয়ে দিল। মরণ চিল্কারে বর্শার ফলার উপর চোয়াল চেপে ধরল বিশ্রী জানোয়ারটা, ফলে জানোয়ারটা ওটা না ছাড়া পর্যন্ত ঘোড়ার পিছন পিছন যেতে বাধ্য হলো সৈনিক। অবশেষে অস্ত্র মুক্ত করে নিতে পারল সে। তাইতার পাশে এসে বর্শাটা দেখাল। শক্ত কাঠের উপর ব্যাঙের দাঁতের ছাপ গম্ভীর হয়ে পড়েছে।
নেকড়ের মতোই বুনো, প্রহরীদের সার্জেন্ট ছিপছিপে প্রবীন যোদ্ধা হাবারি বলল। প্রথম যখন ওদের আবির্ভাব ঘটে, নদী পরিষ্কার করে ওদের ধ্বংস করতে দুই রেজিমেন্ট সৈনিক পাঠিয়েছিলেন ফারাও। তখন শয়ে শয়ে, হাজারে হাজারে ওদের খতম করেছি আমরা। জানালার উপর ওদের লাশ টাল দিয়ে রেখেছি। কিন্তু মনে হয়েছে বুঝি একটা মারলে তার জায়গায় আরও দুটো বেড়ে উঠছে। এমনকি মহান ফারাও পর্যন্ত বুঝতে পেরেছিলেন যে একটা অর্থহীন কাজে আমাদের পাঠিয়েছেন তিনি, এখন তিনি হুকুম দিয়েছেন ওদের অবশ্যই নদীর তলদেশেই আটকে রাখতে হবে। অনেক সময় সাঁতার কেটে উঠে আসে ওরা, আমরা ফের আক্রমণ করি। বলে চলল হাবারি। ওদের নিজেস্ব বিশ্রী কায়দায় কিছুটা উপকারে আসে ওরা। নদীতে ছুঁড়ে দেওয়া সব আবর্জনা আর লাশ খেয়ে নেয়। প্লেগের শিকারের জন্যে এখন আর ভালো কবর খোঁড়ার মতো শক্তি পাচ্ছে না লোকে, তো কুনো ব্যাঙের দলই মুদাফরাসের দায়িত্ব নিয়েছে।
