আগে বলো, মহামান্য আছেন কেমন? উদ্বিগ্ন স্বরে জানতে চাইল তাইতা।
আমার ভয় হচ্ছে, ওকে দেখে খারাপ লাগবে তোমার। নিদারুণ উৎকণ্ঠায় আছেন তিনি। বেশিরভাগ দিন মন্ত্রী, সেনাবাহিনীর অধিনায়ক আর নোম গভর্নরের সাথে সভা করে কাটাচ্ছেন। ক্ষুধার্ত জনগণের খাবারের ব্যবস্থা করতে বিভিন্ন দেশে দূত পাঠাচ্ছেন। নদীর লাল আবর্জনা দূর করতে নতুন করে কুয়ো খননের নির্দেশ দিয়েছেন তিনি। দীর্ঘশ্বাস ফেলল রামরাম, শরবতের বাটিতে লম্বা একটা চুমুক দিল সে।
মেদিয় ও সুমেরিয়রা, সাগরবাসী, লিবিয় ও অন্য শক্ররা আমাদের দুর্দশার কথা জানে, খেই ধরল সে। ওদের বিশ্বাস আমাদের সুসময় ফুরোতে চলেছে। তাই নিজেদের সেনাদলকে তৈরি করছে ওরা। তুমি তো জানো, আমাদের করদ রাজ্য ও আশ্রিত দেশগুলো বরাবরই ফারাওকে মেটাতে বাধ্য হওয়া দক্ষিণার ব্যাপারে বৈরী ভাবাপন্ন ছিল। অনেকেই আমাদের এই দুর্ভাগ্যকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার সুযোগ মনে করছে। তাই বিশ্বাসঘাতকতার লক্ষ্যে মৈত্রী গড়ে তুলছে তারা। আমাদের সীমান্তে বহু শত্রু সমাবেশ ঘটিয়েছে। আমাদের সম্পদ মারাত্মকভাবে কমে যাওয়ায় ফারাওকে অবশ্যই নিজ বাহিনী শক্তিশালী করে তুলতে রসদ আর মানুষ যোগাড় করতে হবে। নিজেকে যারপরনাই কষ্ট দিচ্ছেন তিনি, তাঁর সাম্রাজ্য ভেঙে পড়ার দশা হয়েছে।
ছোটখাট অন্য কোনও রাজা হলে এমন দুর্যোগ কাটিয়ে উঠতে পারতেন না, বলল তাইতা।
নেফার সেতি মহান রাজা। কিন্তু আমাদের সবার মতো তিনিও অন্তর থেকে জানেন দেবতারা এখন আর মিশরের দিকে কৃপার দৃষ্টিতে তাকাচ্ছেন না। যতক্ষণ ঐশী আশীর্বাদ ফিরে না পাচ্ছেন ততক্ষণ তার কোনও প্রয়াসই সাফল্যের মুখ দেখবে না। দেশের সমস্ত মন্দিরের পুরোহিত সমাজকে অবিরাম প্রার্থনা চালিয়ে যাবার নির্দেশ দিয়েছেন তিনি। নিজে দিনে তিন বার বলী দিচ্ছেন। নিজের শক্তিকে শেষ সীমায় টেনে নিয়ে গেলেও রোজ অর্ধেক রাত জেগে থাকছেন। যখন বিশ্রাম নেওয়ার কথা, সতীর্থ দেবতাদের সাথে যোগাযোগ ও প্রার্থনা করার পেছনে সেই সময় পার করছেন।
জলে ভরে উঠল চেম্বারলেইনের চোখ। লিনেনের কোণ দিয়ে মুছল সে। আমাদের উপর নেমে আসা নদী মাতার পতন আর নানা প্লেগে আক্রান্ত গত সাত বছর এভাবেই কাটছে তার জীবন। সাধারণ কোনও রাজা হলে ধ্বংস হয়ে যেতেন। নেফার সেতি একজন দেবতা, কিন্তু তার হৃদয় ও আবেগ মানুষের মতো। ফলে তিনি বদলে গেছেন, বুড়িয়ে গেছেন।
এ খবর শুনে সত্যিই মনটা খারাপ হয়ে গেল। কিন্তু বলো তো, রানি ও তাঁর সন্তানরা কেমন আছেন?
এখানেও খবর তেমন সুবিধার নয়। প্লেগ ওদের উপর নিষ্ঠুর আচরণ করেছে। রানি মিনতাকা অসুস্থ হয়ে অনেকগুলো সপ্তাহ প্রায় মরণোন্মুখ অবস্থায় শয্যাশায়ী ছিলেন। এখন সেরে উঠেছেন অবশ্য। তবে অনেক দুর্বল। রাজকীয় সন্তানদের সবার এমন সৌভাগ্য হয়নি। রাজকুমার খাবা ও তাঁর ছোট বোন উনাস রাজকীয় স্মৃতিসৌধে এখন পাশাপাশি শুয়ে আছেন। প্লেগ ওদের কেড়ে নিয়েছে। অন্য সন্তানরা বেঁচে গেলেও-
একজন দাস নতজানু হয়ে প্রণাম করে ঢুকতেই থেমে গেল রামরাম। চেম্বারলেইনের কানে ফিসফিস করে কিছু একটা বলল সে। মাথা দোলাল রামরাম, ইশারায় বিদায় করে দিল তাকে। তারপর ফের তাইতার দিকে ফিরল। গোপন সভা শেষ হয়েছে। ফারাওর কাছে তোমার আগমনসংবাদ দিচ্ছি। উঠে দাঁড়াল সে, তারপর পা টেনে টেনে কামরার পেছন দিকে চলে গেল। ওখানে একটা প্যানেলে খোদাই করা একটা অবয়ব স্পর্শ করল সে। ওর আঙুলের স্পর্শে ঘুরে গেল ওটা। দেয়ালের একটা অংশ সম্পূর্ণ সরে গেল। খোলা পথে অদৃশ্য হয়ে গেল রামরাম। তার অল্পক্ষণ পরেই গোপন দরজার ওপাশের করিডর থেকে বিস্ময় ও খুশির চিৎকার ভেসে এলো। তারপরই শোনা গেল দ্রুত পায়ের আওয়াজ। এরপর চিৎকার: তাতা, কোথায় তুমি? ওকে দেওয়া ফারাওর ডাক নাম এটা।
জাঁহাপনা, আমি এখানে।
অনেক দিন আমাকে উপেক্ষা করেছ তুমি, দরজা গলে বের হয়ে আসার সময় ওকে অভিযুক্ত করলেন ফারাও, তাইতার দিকে তাকাতে থমকে দাঁড়ালেন। সত্যিই তো তুমি। আমি তো ভেবেছিলাম আমার আগের সমনের মতো এবারও অগ্রাহ্য করে যাবে।
হাঁটু পর্যন্ত স্কুলের একটা লিনেনের স্কার্টের সাথে স্রেফ একজোড়া উন্মুক্ত স্যান্ডেল পরেছেন নেফার সেতি। উর্ধ্বাঙ্গ উন্মুক্ত। চওড়া পুরু বুকের ছাতি, পেটটা স্থূলকায়, পেশি খেলা করছে। তীর আর তলোয়ারে দীর্ঘদিনের অনুশীলনে দুটি হাত খোদাই করা ভাস্কর্যের মতো। নিখুঁত করে তোলা যোদ্ধার তাঁর গোটা ধড়।
ফারাও, আপনাকে অভিবাদন। আমি আপনার একজন তুচ্ছ দাস, সব সময়ই যা ছিলাম।
সামনে এসে ওকে শক্তিশালী আলিঙ্গনে আবদ্ধ করলেন নেফার সেতি। গুরু শিষ্য যখন একসাথে হয় তখন এসব দাস-দাসত্বের কথা চলবে না, ঘোষণা দিলেন তিনি। তোমাকে আবার দেখতে পেয়ে আমার মনটা খুশিতে ভরে গেছে। ওকে মুখের সামনে ধরলেন তিনি। চেহারা জরিপ করলেন। হোরাসের করুণায় তোমার একদিনও বয়স বাড়েনি।
আপনারও না, জাঁহাপনা। আন্তরিক স্বরে বলল তাইতা। হেসে উঠলেন নেফার সেতি।
কথাটা মিথ্যা হলেও পুরোনো বন্ধুর প্রতি তোমার দয়া হিসাবে এই তোষামোদ মেনে নিচ্ছি। নেফার সেতি আনুষ্ঠানিক ঘোড়ার পশমের পরচুলা খুলে রেখেছেন, গায়ে রঙের প্রলেপ না থাকায় তাঁর বৈশিষ্ট জরিপ করতে পারছে তাইতা। নেফারের ছোট করে ছাটা চুল খাড়া হয়ে আছে, মাথার চাঁদি ন্যাড়া। সময়ের আঁচড় পড়েছে চোখেমুখে। মুখের কোণে গাঢ় রেখা দেখা দিয়েছে। গাঢ় চোখের চারপাশে বলী রেখার জাল। গায়ের ত্বকে অস্বাস্থ্যকর আভা। চোখ পিটপিট করে অন্তর্চক্ষু খুলল তাইতা। স্বস্তির সাথে লক্ষ করল ফারাওর আভা জোরালভাবে জ্বলছে, সাহসী হৃদয় ও অদম্য প্রাণশক্তিরই প্রতীক।
