মনে হচ্ছে থেবসের নাগরিকরা এতটাই নির্বিকার হয়ে গেছে যে এখন লাশ কবর না দিয়ে নদীতে ফেলে দিচ্ছে, বিষাদের সাথে ঘাড় নেড়ে বললেন দিমিতার।
ওরা তাকিয়ে থাকার সময়ই একটা ব্যাঙ বাচ্চাটার হাত কামড়ে ধরে দশ বার বার ঝাঁকি দিয়ে কাঁধের জোড়া থেকে বিচ্ছিন্ন করে শূন্যে ছুঁড়ে দিল ছোট্ট বাহুটা। নেমে আসতেই মুখ হাঁ করে গিলে নিল টুপ করে।
দৃশ্যটা দেখে সবাই অসুস্থ বোধ করল। ফের ঘোড়ায় চেপে তীর বরাবর এগিয়ে নগরের বহিপ্রাচীরের কাছে পৌঁছাল ওরা। বাইরের এলাকা ভূমিহীন কৃষক, বিধবা ও এতিম, অসুস্থ ও মৃত্যুপথযাত্রী ও বিপর্যয়ের অন্য সব শিকারের তৈরি অস্থায়ী আশ্রয়ে ভরা। পাতার তৈরি খোলা চালার নিচে জড়োসড়ো অবস্থায় রয়েছে ওরা। সবাই বিশীর্ণ ও করুণ চেহারার। এক তরুণী মাকে দেখল তাইতা, কোলের বাচ্চাটার মুখে শূন্য বুক ছুঁইয়ে রেখেছে। কিন্তু বাচ্চাটা এতই দুর্বল, চুষতে পারছে না। ওর চোখেমুখে মাছি ঢুকে পড়ছে। ওদের দিকে অসহায়ের মতো চেয়ে আছে মা।
ওর বাচ্চার জন্যে ওকে খাবার দিয়ে আসি, বলে ঘোড়ার পিঠে থেকে নামতে গেল মেরেন। কিন্তু ওকে বাধা দিলেন দিমিতার।
এই হতভাগ্য মানুষগুলোকে এখন খাবার দেখালেই রীতিমতো দাঙ্গা বেঁধে যাবে।
আবার আগে বাড়ার সময় বিষণ্ণ, অপরাধী চেহারায় পেছনে তাকাতে লাগল মেরেন।
দিমিতার ঠিকই বলেছেন, মৃদু কণ্ঠে ওকে বলল তাইতা। এত অসংখ্য ক্ষুধার্তের অল্প কয়েকজনকে বাঁচাতে পারব না আমরা। বাঁচাতে হবে মিশরকে, মুষ্টিমেয় কিছু লোক নয়।
হতভাগাদের কাছ থেকে বেশ দূরে শিবির ফেলার জায়গা বেছে নিল তাইতা ও মেরেন। দিমিতারের ফোরম্যানকে একপাশে ডেকে নিয়ে ওকে বুঝিয়ে বলল, তোমার গুরু যেন আরামে থাকে সেটা খেয়াল করো, ওকে ভালো করে পাহারা দেবে। তারপর চোর-ডাকাত ঠেকাতে শুকনো কাঁটাঝোঁপের বেড়া বানাবে। পশুগুলোর জল আর খাবারের যোগাড় করো। আরও জুৎসই থাকার ব্যবস্থা না করতে পারা পর্যন্ত এখানেই থাকবে।
মেরেনের দিকে ফিরল ও। শহরে ফারাওয়ের প্রসাদে যাচ্ছি আমি। দিমিতারের সাথে থাক। জুতোর গোড়ালি দিয়ে মেয়ারের পেটে লাথি মারল ও। মূল তোরণের দিকে রওয়ানা দিল। ও এগিয়ে যাওয়ার সময় টাওয়ার থেকে তাকিয়ে রইল প্রহরীরা, তবে চ্যালেঞ্জ করল না। পথঘাট বলতে গেলে বিরান। অল্প যে কজনকে চোখে পড়ছে তারাও দেয়ালের ওপাশের ভিখিরিদের মতোই ফ্যাকাশে, ক্ষুধার্ত। ওকে আসতে দেখেই সটকে পড়ছে। শহরের মাথার উপর যেন অসুস্থ একটা গন্ধ ঝুলে আছে, মৃত্যু ও কষ্টের গন্ধ।
প্রাসাদ প্রহরীদের সর্দার চিনতে পারল ওকে। তোরণ খুলে দিতে ছুটে এলো সে। ও ভেতের ঢুকতেই সমীহের সাথে সালাম ঠুকল।
আমার লোক ঘোড়াটা আস্তাবলে নিয়ে যাবে, ম্যাগাস। রাজকীয় সহিসরা ওটার দেখভাল করবে।
ফারাও বাড়িতে আছেন? ঘোড়ার পিঠে থেকে নামার সময় জানতে চাইল তাইতা।
জ্বি, আছেন।
ওর কাছে নিয়ে চলো আমাকে, নির্দেশ দিল তাইতা। দ্রুত হুকুম তামিল করল প্রহরী। প্যাসেজ ও হলওয়ের গোলকধাঁধা ধরে এগিয়ে চলল ওকে নিয়ে। উঠোনের ভেতর দিয়ে এগোল ওরা, এককালে আঙ্গিনা, ফুলের কেয়ারি আর নির্মল জলের ফোয়ারার সমাহারে অসাধারণ ছিল জায়গাটা। তারপর হল ও ক্লয়েস্টারের ভেতর দিয়ে আগে বাড়ল, এক সময় অভিজাত নারীদের হাসিঠাট্টা, গান, ট্রাম্বলার, এবোলদার আর দাসীনর্তকীদের গানে মুখরিত থাকত। কামরাগুলো খাখা করছে এখন। বাগান বাদামী হয়ে মরে গেছে। ফোয়ারা শুকিয়ে কাঠ। চেপে বসা নীরবতা কেবল পাথুরে পথের উপর ওদের পায়ের আওয়াজে ছিন্ন হচ্ছে।
অবশেষে রাজকীয় দরবার ঘরের অ্যান্টিচেম্বারে পৌঁছাল ওরা। উল্টোদিকের দেয়ালে একটা বন্ধ দরজা। বর্শার গোড়া দিয়ে ওটায় টোকা দিল প্রহরী। প্রায় নিমেষে একজন দাস খুলে ধরল ওটা। ওর পেছনে তাকাল তাইতা। গোলাপি মাৰ্বল পাথরের মেঝেয় একটা ছোট ডেস্কের সামনে পায়ের উপর পা তুলে বসে আছে স্থূলদেহী এক খোঁজা। টেবিলে স্কুল আর পাথরের ফলকের স্তূপ। এক মুহূর্তে তাকে চিনতে পারল তাইতা। ফারাওর প্রবীন চেম্বারলেইন, তাইতার সুপারিশেই এমন উচ্চ পদে নিয়োগ পেয়েছিল সে।
রামরাম, পুরোনো বন্ধু আমার, ওকে শুভেচ্ছা জানাল তাইতা। লাফ দিয়ে উঠে দাঁড়াল রামরাম, এমন বিশালদেহী লোকের পক্ষে বিস্ময়কর ক্ষিপ্র তার চলাফেরা। তাইতাকে আলিঙ্গন করতে ছুটে এলো। ফারাওর সেবায় নিয়োজিত খোঁজারা এক শক্তিশালী ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে আবদ্ধ।
তাইতা, অনেক দিন থেবসের বাইরে ছিলে তুমি, তাইতাকে ব্যক্তিগত এটা ব্যুরোতে নিয়ে এলো সে। সেনাপতিদের সাথে সভায় বসেছেন ফারাও, তাই ওকে এখন বিরক্ত করতে পারছি না। তিনি অবসর পাওয়ামাত্রই তোমাকে ওর কাছে নিয়ে যাব। তিনি তাই চাইবেন। এতে অবশ্য কথা বলার একটা সুযোগ মিলে গেছে। কতদিন হলো দূরে আছো তুমি? অনেক বছর নিশ্চয়ই।
সাত বছর। শেষবার আমাদের দেখা হওয়ার পর বহু অজানা দেশ ঘুরেছি আমি।
তাহলে তো তোমার অবর্তমানে আমাদের উপর নেমে আসা বিপদ সম্পর্কে তোমাকে জানানো দরকার। দুঃখের কথা, ভালো সংবাদ তেমন একটা নেই।
একটা কুশনে মুখোমুখি বসল ওরা। চেম্বারলেইনের ইশারায় এক দাস মাটির কলসীতে ঠাণ্ডা করা শরবত পরিবেশন করল ওদের।
