মাথা ভরে রাখা আবেগের জগাখিচুরির জঙ্গল গোছানোর প্রয়াস পেল তাইতা। ওর বিভ্রান্তি থেকে একটা বিশেষ ব্যাপার স্পষ্ট হয়ে এলো: ভূতুড়ে লস্ত্রিসের সাথে ওর সাক্ষতের সময় উইন্ডস্মোকের শান্তভাবে দাঁড়িয়ে থাকার ভঙ্গি, এতটুকু অস্থির হয়নি ওটা। অন্য প্রতিটি ক্ষেত্রে ও বোঝার বেশ আগেই অশুভের প্রকাশের ব্যাপারে সজাগ হয়ে উঠেছে। চাঁদ গ্রস্ত হওয়ার সময় ছুটে গিয়েছিল, অথচ লস্ত্রিসের ছায়ামূর্তি ও ওর ভূতুড়ে সত্তার প্রতি সামান্যই আগ্রহ দেখিয়েছে।
ওসবের ভেতর অশুভ থাকতে পারে না, নিজেকে বিশ্বাস করানোর চেষ্টা করল ও। লস্ত্রিস সত্যি কথা বলেছিল? আমাকে রক্ষা করতেই কি বন্ধু ও মিত্র হিসাবে এসেছিল ও? আমি কি আমাদের দুজনকেই ধ্বংস করে দিলাম? এক অসহনীয় ব্যথা এটা। উইন্ডস্মোকের মাথা ঘুরিয়ে নিয়ে পূর্ণ গতিতে ডেল্টার দিকে ছোটাল। কেবল ঢালের কিনারা থেকে ঝড়ের বেগে বের হয়ে আসার পরেই সামলাল নিজেকে। লস্ত্রিস যেখানে অদৃশ্য হয়ে গেছে ঠিক সেখানে ঘোড়ার পিঠ থেকে নেমে দাঁড়াল।
লস্ত্রিস! আকাশের দিকে তাকিয়ে ডাকল ও। আমাকে ক্ষমা করো! ভুল করেছি! এখন জানি তুমি সত্যি কথাই বলেছ। তুমি সত্যিই লস্ত্রিস। ফিরে এসো, প্রিয়া আমার! ফিরে এসো! কিন্তু লস্ত্রিস চলে গেছে। প্রতিধ্বনি যেন ওকে ভেঙচি কাটছে: ফিরে এসো…এসো..এসো…
*
ওরা পবিত্র থেবস নগরীর অনেক কাছে এসে পড়ায় সূর্য ওঠার পরেও রাতের যাত্রা চালিয়ে যেতে মেরেনকে নির্দেশ দিল তাইতা। ভোরের তীর্যক আলোক রশ্মিতে আলোকিত ক্ষুদে কাফেলা ঢাল থেকে নেমে সমতল পলিমাটির জমিনের উপর দিয়ে নগর প্রাচীরের দিকে এগোল। কালো মাটি শুকিয়ে ইটের মতো শক্ত হয়ে গেছে, রোদের কড়া আঁচে ফেটে চৌচির। কৃষকরা আক্রান্ত জমিন ছেড়ে চলে গেছে, বেহাল দশা হয়েছে ওদের কুঁড়েগুলোর। কড়িকাঠ থেকে থোকায় থোকায় খসে পড়ছে তালপাতার ছাউনী। জমিনের এখানে ওখানে শাদা ডেইজি ফুলের মতো পড়ে আছে দুর্ভিক্ষে প্রাণ হারানো কাইনের হাড়গোড়। ঘূর্ণী হওয়ার একটা ঝাপ্টা বয়ে যাবার পথে বিরান জমিনের উপর নাচতে নাচতে ধূলি ও শুকনো ধুরা পাতার একটা স্তম্ভ ছুঁড়ে দিল মেঘহীন আকাশের দিকে। বন্ধ্যা জমিনের উপর যুদ্ধ কুঠারের আঘাতের মতো আঘাত হেনে চলেছে সূর্য।
বিরূপ ল্যান্ডস্কেপে কাফেলার মানুষ আর পশুগুলো যেন বাচ্চাদের খেলনার মতোই গুরুত্বহীন। নদীর কাছে পৌঁছে নিজেদের অজান্তেই তীরে থমকে দাঁড়াল ওরা। ভয়ঙ্কর হতাশায় আক্রান্ত হলো। এমনকি দিমিতারও নেমে পড়েছেন পালকি থেকে। তাইতা ও মেরেনের সাথে যোগ দিতে কোনওমতে আগে বাড়লেন তিনি। নদীটা এখানে মাত্র চারশো গজ চওড়া। স্বাভাবিক ভাটার মৌসুমেও মহানদী নীলের এপ্রান্ত থেকে ওপ্রান্ত ধূসর পলিমাটি ভরা পানিতে ভরপুর থাকে, এত গভীর ও শক্তিশালী যে জলের উপরিতল ঝলমলে ফেনায় ভরে থাকে, অসংখ্য ঘূর্ণীর গহ্বর চোখে পড়ে। বানের মৌসুমে নীলকে বেঁধে রাখা যায় না। তীর উপচে উঠে এসে জমিন ভাসিয়ে দেয়। এর জলের সাথে ভেসে আসা সমৃদ্ধ কাদা ও পলিমাটি এক মৌসুমেই তিনটা ফসল ধরে রাখতে পারে।
কিন্তু আজ সাত বছর ধরে বানের দেখা নেই। এখন নদীটা অতীত শক্তিশালী সত্তার একটা ভূতুড়ে পরিহাসে পরিণত হয়েছে। সংকীর্ণ পুঁতিগন্ধময় নালায় পর্যবসিত হয়েছে ওটা, তলদেশ বরাবর ক্ষীণ ধারায় বয়ে চলেছে। কেবল মৃত্যুমুখী মাছ ও অল্প কয়েকটা জীবিত কুমীরের কষ্টকর নড়াচড়ার কারণে সেই জলে কিঞ্চিত তরঙ্গ উঠছে। জমাট বাঁধা রক্তের মতো লাল ফেনাময় আবর্জনা ঢেকে রেখেছে জলের উপরিভাগ।
নদীর রক্ত ক্ষরণ হচ্ছে কেন? জানতে চাইল মেরেন। এটা একটা অভিশাপ!
আমার মনে হয় বিষাক্ত শ্যাওলার জন্যেই এমন হয়েছে, বলল তাইতা, সায় দিলেন দিমিতার।
শ্যাওলাই বটে, তবে এটা যে অস্বাভাবিক তাতে আমার একটুকু সন্দেহ নেই, জলের ধারা থমকে দেওয়া একই অশুভ প্রভাবের কারণেই আবির্ভূত।
কলো কাদার চরে রক্ত-রঙ পুকুরগুলো বিচ্ছিন্ন হয়ে আছে। নগরের বজ্য ও আটকে পড়া আবর্জনায় ভরে আছে সেগুলো। আছে শেকড়বাকড়, ভেসে আসা কাঠ, পরিত্যক্ত ফেরি নৌকার ধ্বংসাবশেষ, পাখি ও পশুর ফুলে ওঠা মৃতদেহ। উন্মুক্ত বালিচরে ঘুরে বেড়ানো একমাত্র জীবিত প্রাণীগুলো হচ্ছে অদ্ভুত দর্শন বেঁটে কিছু জানোয়ার, মরদেহের দখল পেতে ভৌতিক জোড়া লাগানো পায়ে আনাড়ী ভঙ্গিতে লাফিয়ে বেড়াচ্ছে। টেনে পচা মাংসের চাক ছিঁড়ছে, তারপর গিলে নিচ্ছে। গভীর বিতৃষ্ণায় বিড়বিড় করে উঠল মেরেন, কাফেলার সর্দার যেমন বলেছিল ঠিক সেই রকম: দানবীয় কুনো ব্যাঙ! তারপরই কেবল ওগুলোর পরিচয় সম্পর্কে নিশ্চিত হতে পারল তাইতা। গলা খাকারি দিয়ে গলায় জমে ওঠা শ্লেষা ঝাড়ল ও। মিশরের উপর নেমে আসা অশুভ প্রভাবের কি শেষ নেই?
তাইতা বুঝতে পারল উভচরগুলোর আকারই ওকে বিভ্রান্ত করে দিয়েছিল। বিশাল আকারের। পিঠের হিসাবে বুনো শুয়োরের মতোই মোটা, পেছন পায়ে ভর দিয়ে সম্পূর্ণ খাড়া হলে রীতিমতো শেয়ালের সমান লম্বা মনে হচ্ছে।
কাদার ভেতর মানুষের লাশ পড়ে আছে, বলে উঠল মেরেন। ওদের ঠিক নিচেই পড়ে থাকা একটা ছোট্ট দেহের দিকে ইঙ্গিত করল ও। মৃত শিশুও আছে।
