সে নয়। নিজেকে স্থির রাখার প্রয়াস পেল তাইতা। বিরাট সাপটার মতো শূন্য থেকে আসা আরেকটা প্রেতাত্মা, সম্ভবত সমান ভয়ঙ্কর।
স্বপ্নে দেখা সোনালি ডলফিনের পিঠের সেই মেয়েটা সম্পর্কে দিমিতারের সাথে আলোচনা করার সময় এ ব্যাপারে এতটুকু সন্দেহ ছিল না তার। আপনার স্বপ্ন ডাইনীটার চাতুরী ছাড়া আর কিছুই না, ওকে সতর্ক করে বলেছিলেন তিনি। আপনার আকাক্ষা ও আশাকে জাগিয়ে তোলা কোনও ইমেজকে বিশ্বাস করতে যাবেন না। যখনই পুরোনো ভালোবাসার মতো কোনও সূখকর স্মৃতিকে আপনার মনে জাগতে দিচ্ছেন, ইয়োসের জন্যে রাস্তা খুলে দিচ্ছে সেটা। আপনার কাছে। পৌঁছাতে এর ভেতর দিয়ে পথ বের নেবে সে।
মাথা নেড়েছিল তাইতা। না, দিমিতা, এমনকি ইয়োসই বা কেমন করে অতদিন আগের পুঙ্খানুপুঙ্খ বিস্তারিত জিনিস ফুটিয়ে তুলবে? লস্ত্রিসের কণ্ঠস্বর, ওর চোখের গড়ন, হাসার সময় ওর ঠোঁটের কম্পন। কেমন করে ইয়োস তার অনুকরণ করবে? সত্তর বছর ধরে সমাধিতে আছে লস্ত্রিস। ইয়োস নকল করার মতো এমন কোনও সজীব চিহ্ন নেই ওর।
ইয়োস আপনার স্ক্রিসের স্মৃতি চুরি করেছে। তারপর ওগুলোর সবচেয়ে বিশ্বাসযোগ্য আকর্ষণীয় রূপে আবার আপনার কাছে ফিরিয়ে দিয়েছে।
কিন্তু এমনকি আমিও তো বেশির ভাগ খুঁটিনাটি জিনিস ভুলে গেছি।
আপনি নিজেই তো বলেছেন, আমরা কিছুই ভুলে যাই না। সবই রয়ে যায়। আপনার মন থেকে সেগুলোকে উদ্ধার করে আনতে কেবল অতিলৌকিক দক্ষতার প্রয়োজন, ইয়োসের তা আছে। যেমন করে আপনি আমার মনের ভেতর থেকে ইয়োসের স্মৃতি, ওর কণ্ঠস্বর বের করে এনেছেন, যখন সে অগ্নিমন্ত্র উচ্চারণ করেছিল।
ওটা লস্ত্রিস ছিল না, আমি মেনে নিতে পারব না, মৃদু স্বরে গুঙিয়ে উঠেছিল তাইতা।
তার কারণ আপনি মানতে চান না। ইয়োস আপনার যুক্তিবোধ অন্ধ করে দিতে চাইছে। একটু ভেবে দেখুন, ডলফিনের পিঠে মেয়েটার ইমেজ কীভাবে তার অশুভ পরিকল্পনার অংশ হয়েছিল। সে যখন আপনাকে হারিয়ে যাওয়া ভালোবাসার কুহকী দৃশ্য দেখিয়ে বিক্ষিপ্ত ও প্রলুব্ধ করছিল ঠিক তখন আমাকে শেষ করে দিতে সাপটাকে পাঠিয়েছিল। আপনার স্বপ্নকে বিক্ষিপ্ত করার হাতিয়ার হিসাবে ব্যবহার করেছে।
এখন ডেল্টার ঢালে ফের সেই একই দৃশ্যের মুখোমুখি হয়েছে তাইতা: লস্ত্রিসের ইমেজ, মিশরের এককালের রানি, যার স্মৃতি আজও ওর হৃদয় দখল করে আছে। এইবার ওকে আরও বেশি নিখুঁত মনে হচ্ছে। টের পেল ওর স্থিরতা ও যুক্তিবোধ উধাও হয়ে যাচ্ছে। নিজেকে সামাল দেওয়ার প্রয়াস পেল। কিন্তু লক্ট্রিসের চোখের দিকে তাকানো থেকে নিজেকে বিরত রাখতে পারল না। ওখানে আমোদিত আলো ঝলমল করছে। ওগুলোর গভীরতায় সারা জীবনের সকল আনন্দ বেদনার অশ্রু।
তোমাকে প্রত্যাখ্যান করছি! যতটা সম্ভব শীতল ও কঠোর কণ্ঠে বলল তাইতা। তুমি লস্ত্রিস নও। আমার ভালোবাসার নারীটি তুমি নও। তুমি আসলে মহামিথ্যা। যেই অন্ধকার থেকে এসেছ সেই অন্ধকারে আবার ফিরে যাও।
ওর কথায় লস্ত্রিসের চোখের কমনীয় ঝিলিক বদলে গিয়ে সেখানে অসীম বিষাদ এসে ভর করল। প্রিয় তাইতা, মৃদু কণ্ঠে ওকে ডাকল সে। আমরা বিচ্ছিন্ন হওয়ার পর এতগুলো বছর ধরে তোমাকে ছাড়াই বন্ধ্যা ও নিঃসঙ্গ কাটিয়েছি। এখন তোমার এমন এক লৌকিক ও আধ্যাত্মিক বিপদের মুহূর্তে আবার তোমার সাথে এক হতে ফিরে এসেছি। আমরা একসাথে তোমার উপর নেমে আসা অশুভকে ঠেকাতে পারব।
তুমি ধর্মের অপমান করছ, বলল তাইতা। তুমি ইয়োস, মিথ্যা। তোমাকে আমি প্রত্যাখ্যান করছি। সত্য আমাকে রক্ষা করছে। আমার কাছে আসতে পারবে না তুমি। আমার ক্ষতি করতে পারবে না।
ওহ, তাইতা, ফিসফিস করে বলে উঠল লস্ত্রিস। আমাদের দুজনকেই ধ্বংস করবে তুমি। আমি নিজেও বিপদে আছি। মনে হচ্ছে যেন সময়ের সূচনা থেকে মানুষের সকল বিষাদ এসে ভর করেছে ওর উপর। আমাকে বিশ্বাস করো। আমাদের দুজনের স্বার্থেই আমাকে বিশ্বাস করতে হবে। আমি তোমার ভালোবাসার সেই লস্ত্রিস ছাড়া অন্য কেউ নই-তোমাকে যে ভালোবেসেছিল। ইথারের ভেতর দিয়ে আমাকে আহ্বান করেছ তুমি। তোমার ডাকে সাড়া দিয়ে ফিরে এসেছি আমি।
পায়ের নিচে পৃথিবীর ভিত্তিমূল কেঁপে ওঠা টের পেল তাইতা। কিন্তু নিজেকে স্থির করল ও। দূর হও, অভিশপ্ত ডাইনী! চিৎকার করে উঠল ও। ভাগো, মিথ্যার দুষ্ট দাস। তোমাকে ও তোমার সব কর্মকাণ্ড আমি প্রত্যাখ্যান করছি। আমাকে আর জ্বালিয়ো না।
না, তাইতা! এমন করতে পারো না তুমি, আবেদন জানাল লস্ত্রিস। আমাদের একটা সুযোগ দেওয়া হয়েছে। কিছুতেই তাকে ফিরিয়ে দিতে পারো না তুমি।
তুমি অশুভ, কর্কশ কণ্ঠে বলল তাইতা। শূন্যতা থেকে উঠে আসা বিভীষিকা। নিজের জঘন্য আস্তানায় ফিরে যাও।
গুঙিয়ে উঠল লস্ত্রিস, মিলিয়ে যেতে শুরু করল ওর ইমেজ। দিনের আলোয় যেভাবে প্রায়ই ওর তারাটি মিলিয়ে যায় ঠিক সেভাবে মিলিয়ে গেল লস্ত্রিসের ছায়া। রাতের আঁধার থেকে ওর শেষ কণ্ঠস্বর ভেসে এলো: একবার মৃত্যুর স্বাদ নিয়েছি আমি, এবার আমাকে পুরোটা হজম করতে হবে। বিদায়, তাইতা। তোমাকে আমি ভালোবেসেছিলাম। আমাকে আরেকটু বেশি ভালোবাসতে যদি।
পরক্ষণেই হারিয়ে গেল সে। হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল তাইতা, মাথার উপর দিয়ে ভেঙে পড়া অনুতাপ আর বিষাদের ঢেউ বয়ে যেতে দিল। আবার যখন মাথা তোলার মতো শক্তি ফিরে পেল, তখন সূর্য উঠেছে। এরই মধ্যে দিগন্তের হাত খানেক উপরে উঠে এসেছে ওটা। শান্তভাবে পাশে দাঁড়িয়ে আছে উইন্ডস্মোক। ঝিমোচ্ছে। কিন্তু খোঁচা দিতেই মাথা ওঠাল ওটা, ফিরে তাকাল ওর দিকে। এত খাট হয়ে গেছে ও যে ওটার পিঠে উঠতে একটা পাথরের সাহায্য নিতে হলো। পিঠে বসে দুলতে লাগল ও। ঢালের পথের দিকে এগোতে গিয়ে পড়েই যাচ্ছিল আরেকটু হলে।
