ঢাল বেয়ে হাওয়ার একটা ঝাপ্টা ধেয়ে এলো। ওর শরীর শিউরে তোলার মতো যথেষ্ট শীতল। এই উত্তপ্ত মৌসুমে অস্বাভাবিক। নিমেষে সতর্ক হয়ে গেল ও। অনেক সময় তাপমাত্রার আকস্মিক হ্রাস অতিলৌকিক প্রকাশের লক্ষণ হিসাবে কাজ করে। দিমিতারের সতর্কবাণী এখনও ওর মনে প্রতিধ্বনি তুলছে।
অটল বসে থেকে ইথারে অনুসন্ধান চালাল ও। খারাপ কিছুর আলামত পেল না। এবার উইন্ডস্মোকের দিকে মনোযোগ দিল ও। প্রাণীটা ওর মতোই অতিপ্রাকৃত বিষয়ে দারুণ স্পর্শকাতর। কিন্তু ওটাকে যেন শান্ত ও স্থির দেখাল। সম্ভষ্ট হয়ে ফের উঠে দাঁড়াল ও, মেয়ারের পিঠে উঠতে লাগাম হাতে তুলে নিল। কাফেলার কাছে ফিরে যাবে। এতক্ষণে মেরেন হয়তো রাতের মতো যাত্রা বিরতির ঘোষণা দিয়েছে; তাঁবু খাটাচ্ছে। ঘুম ওকে দখল করে নেওয়ার আগেই দিমিতারের সাথে আরও খানিকক্ষণ আলাপ করতে চায়। এখনও বুড়ো মানুষটার প্রজ্ঞা ও অভিজ্ঞতার ভাণ্ডার সম্পূর্ণ আদায় করতে পারেনি।
ঠিক এই সময় মৃদু স্বরে ডেকে উঠল উইন্ডস্মোক, কানজোড়া খাড়া করে ফেলল; তবে তেমন সিরিয়াসভাবে সতর্ক মনে হলো না। ওটাকে ঢাল বরাবর নিচের দিকে তাকাতে দেখে ঘাড় ফিরিয়ে তাকাল ও। প্রথমে কিছুই দেখতে না পেলেও মেয়ারের উপর আস্থা থাকায় রাতের নীরবতায় কান পেতে রইল। অবশেষে ঢালের পাদদেশে একটা ছায়াটে নড়াচড়া ধরা পড়ল। নিমেষে উধাও হয়ে গেল সেটা। তাইতা ভাবল কোথাও ভুল হয়েছে ওর, কিন্তু সতর্কতায় ঢিল দিল না। অপেক্ষা করল, তাকিয়ে আছে সতর্ক চোখে। এবার আবার নড়াচড়াটা চোখে পড়ল। আরও অনেক কাছে, অনেক স্পষ্ট।
অন্ধকারে ফুটে উঠল আরেক অশ্বারোহীর আবছা ছায়া। ঢাল অনুসরণ করে ওর অবস্থানের দিকে উঠে আসছে। অচেনা ঘোড়াটা ধূসর হলেও উইন্ডস্মোকের তুলনায় ফ্যাকাশে। তরঙ্গ উঠল ওর স্মৃতিতে, ভালো ঘোড়ার কথা কখনও ভোলে না ও। ওটাকে কবে, কোথায় দেখেছে মনে করার চেষ্টা করল। কিন্তু স্মৃতি অনেক দূরবর্তী হওয়ায় ধরে নিল নিশ্চয়ই অনেক আগের ব্যাপার হবে। অথচ ধূসর ঘোড়াটার চলার ভঙ্গিতে মনে হচ্ছে মাত্র বছর চারেক হবে ওটার বয়স। চট করে ওটার পিঠে আসীন সওয়ারির দিকে মনোযোগ দিল ও-আবছা একটা অবয়ব, পুরুষ নয়, বরং কিশোরই হবে হয়তো। সে যেই হোক, ঘোড়ার পিঠে সহজ সজীব ভঙ্গিতে বসেছে। ছেলেটার হাবভাবে পরিচিত একটা ভাব আছে, তবে ওর বাহনের মতোই তারও বয়সও তাইতার স্মৃতি ঝাপসা হয়ে যাবার পক্ষে বেশ কম। এমন কি হতে পারে এই ছেলেটি ওর পরিচিত কারও সন্তান? মিশরের কোনও রাজকুমার? বিভ্রান্ত্র বোধ করল ও।
রানি মিনতাকা ফারাও নেফার সেতিকে অনেক কটি অসাধারণ ছেলে উপহার দিয়েছেন। সবার সাথেই বাবা বা মায়ের চেহারার ভালো মিল রয়েছে। এই ছেলেটার মাঝে মামুলি কোনও ব্যাপার নেই। ওর শরীরে রাজকীয় রক্ত বয়ে যাবার ব্যাপারে তাইতার মনে এতটুকু সন্দেহ নেই। আরও কাছে এলো ঘোড়া ও সওয়ারি। এবার আরও কিছু বৈশিষ্ট্য চোখে পড়ল তাইতার। লক্ষ করল, সওয়ারি একটা খাট চিতন পরে আছে, ফলে উন্মুক্ত হয়ে পড়েছে তার পাজোড়া। সরু, সন্দেহাতীতভাবে নারীসুলভ পা। ওটা একটা মেয়ে। ওর মাথা আড়াল করা। কিন্তু মেয়েটা কাছে আসার পর শালের নিচে ওর চেহারার বৈশিষ্ট্যগুলো ধরতে পারল।
ওকে আমি চিনি। ভালো করে চিনি! আপনমনে ফিসফিস করে বলল ও। কানের কাছে নাড়ীর গতি দ্রুততর হয়ে উঠল ওর। অভিবাদন জানানোর ভঙ্গিতে একটা হাত উঁচু করল মেয়েটা, তারপর সামনে কোমর বাড়িয়ে আগে বাড়ার তাগিদ দিল ঘোড়াকে। দুলকি চালে এগোতে শুরু করল ওটা। কিন্তু পাথুরে পথে এতটুকু আওয়াজ করছে না ওটার খুর। অলৌকিক নীরবতায় ঢাল বেয়ে ওর দিকে এগিয়ে আসতে লাগল ওটা।
দেরি হয়ে গেছে, বুঝতে পারছে তাইতা, পরিচিত চেহারায় ওকে প্রলুব্ধ করা হয়েছে। দ্রুত চোখ পিটপিট করে অন্তর্চক্ষু খোলার প্রয়াস পেল ও।
কোনও আভা বিলোচ্ছে না! ঢোক গিলল ও। মেয়ারের কাঁধে হাত রেখে নিজেকে স্থির রাখার চেষ্টা করছে। ধূসর ঘোড়া বা ওটার সওয়ারির কেউই স্বাভাবিক প্রাণী নয়। ভিন্ন মাত্রা থেকে এসেছে ওরা। দিমিতারের সতর্কবাণী সত্ত্বেও ফের অসতর্ক অবস্থায় ধরা পড়ে গেছে ও। চট করে গলায় ঝোলানো মাদুলির দিকে হাত বাড়াল। মুখের সামনে তুলে ধরল ওটা। লাগাম টানল সওয়ারি, মুখ ঢেকে রাখা শালের ছায়া থেকে জরিপ করতে লাগল ওকে। মেয়েটা এখন এত কাছে যে তার চোখের ঝিলিক, তরুণ গালের কোমল বাঁক দেখতে পাচ্ছে ও। স্মৃতিরা ভিড় করে এলো মনে।
ধূসর ঘোড়াটার কথা এত পরিষ্কার মনে থাকাটা তেমন বিস্ময়ের কিছু নয়। ও ই উপহার দিয়েছিল। সযত্নে, দরদের সাথে বাছাই করা। ওটার বিনিময়ে পঞ্চাশটি রূপার তালেন্ত দিয়েছিল ও, তখন ভেবেছিল দরাদরিতে জিতেছে। ওটার নাম দিয়েছিল গাল, সব সময়ই ওর প্রিয় পশু ছিল ওটা। জাকের সাথে কায়দা করে ওটার পিঠে সওয়ার হতো ও। অনেক দশক আগের কথাগুলো মনে আছে তাইতার। এত প্রবল ছিল ওর ধাক্কাটা যে স্পষ্ট চিন্তা করতে পারছিল না ও। স্রেফ গ্রানিট পিলারের মতো দাঁড়িয়ে রইল। ঢালের মতো ধরে রেখেছে মাদুলিটা।
ধীরে ফর্শা একটা হাত উঁচু করল ঘোড়সওয়ার, শালের কিনারা সরাল। ওই কমনীয় মুখের দিকে তাকানোর সময় তাইতার মনে হলো ওর আত্মাটাকে বুঝি একটানে ছিঁড়ে ফেলেছে কেউ। খুঁটিনাটি প্রতিটি জিনিস স্পষ্ট হয়ে আছে।
