মরোখ চাঁদের ভীতিককর দৃশ্য সামলে নিতে গিয়ে অন্ধকারের অবশিষ্ট প্রায় সম্পূর্ণ সময়টুকুই লেগে গেল ওর, অবশেষে উঠে দাঁড়িয়ে ছড়িটা তুলে নিয়ে মেয়ারের ঘেঁজে নামল ও। লীগ খানেক এগোনোর পরেই দেখা মিলল ওটার। পথের পাশে একটা বেঁটে মরু ঝোঁপের পাতা ছিঁড়ে খাচ্ছে। ওকে দেখে খুশিতে ডাক ছাড়ল, তারপর নিজের অমার্জনীয় আচরণের জন্যে অনুতাপ দেখিয়ে ধীর পায়ে কাছে এগিয়ে এলো। ওটার পিঠে চেপে বসল তাইতা, ফিরে এলো কাফেলার কাছে।
লোকজন চাঁদের গ্রস্ত হওয়ার দৃশ্য দেখেছে, এমনকি মেরেনের পক্ষেও ওদের সামলে রাখা কঠিন হয়ে পড়েছিল। ওকে ফিরতে দেখেই কাছে এগিয়ে এলো সে। চাঁদের কী হয়েছে, দেখেছেন, ম্যাগাস? কী ভয়ঙ্কর অশুভ লক্ষণ! আপনার অস্তিত্ব নিয়েই ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম, চেঁচিয়ে বলল সে। আপনি নিরাপদে আছেন, হোরাসকে ধন্যবাদ। দিমিতার জেগে আছেন, আপনার ফেরার অপেক্ষা করছেন। তবে তার আগে কাফেলার কুকুরগুলোর সাথে একটু কথা বলবেন? নিজেদের খুপরিতে ঢুকে পড়তে চাইছে ওরা।
লোকজনকে আশ্বস্ত করতে সময় নিল তাইতা। ওদের বোঝাল, চাঁদের গায়ে যাওয়ার ভেতর কোনও কুলক্ষণ নেই, বরং নীলের বানের খবর বয়ে এনেছে। ওর খ্যাতি এমনই যে, সাথে সাথে কথাটা মেনে নিল ওরা। অবশেষে বেশ শান্তভাবে যাত্রা অব্যাহত রাখতে রাজি হলো। ওদের ছেড়ে দিমিতারের তাঁবুতে চলে এলো তাইতা। গত দশ দিনের ব্যবধানে পাইথনের হাতে কষ্টকর আক্রমণের পরিণতি থেকে কষ্টকরভাবে সেরে উঠছেন বুড়ো মানুষটা। এখন বেশ শক্তিশালী হয়ে উঠেছেন। অবশ্য তাইতাকে গম্ভীর চেহারায় স্বাগত জানালেন তিনি। রাতের বাকি অংশ একসাথে নিরিবিলিতে বসে চাঁদের অন্ধকার হয়ে যাবার ব্যাপারে আলোচনা করল ওরা।
এমন আরও অনেক ঘটনা দেখার মতো আয়ু পেয়েছি আমি, কোমল কণ্ঠে বললেন দিমিতার। তবে খুব কমই এমন পূর্ণাঙ্গ লোপ চোখে পড়েছে।
মাথা দোলাল তাইতা। আসলেই এর আগে মাত্র দুবার এমন ঘটনা দেখেছি। সব সময়ই তা কোনও না কোনও বিপর্যয় ডেকে এনেছে-মহান রাজার মৃত্যু, সমৃদ্ধ সুন্দর শহরের পতন, দুর্ভিক্ষ বা পঙ্গপালের আক্রমণ।
এটা মিথ্যার অন্ধকার শক্তির আরেকটা প্রকাশ, বিড়বিড় করে বললেন দিমিতার। আমার বিশ্বাস ইয়োস ক্ষমতা জাহির করছে। আমাদের ভয় দেখাতে চাইছে, মরিয়া করে তুলতে চাইছে আমাদের।
আমাদের আর এই পথে থাকা চলবে না; বরং জলদি থেবসে যেতে হবে, বলল তাইতা।
সবচেয়ে বড় কথা, কোনওভাবেই সতর্কতায় ঢিল দেওয়া চলবে না আমাদের। ধরে নিতে হবে, দিন কি রাতের যেকোনও সময় পরের হামলা চালাতে পারে সে। সিরিয়াসভাবে তাইতার মুখ জরিপ করলেন দিমিতার। পুনরাবৃত্তি হয়ে থাকলে ক্ষমা করবেন, কিন্তু আমার মতো ডাইনীর কূটকৌশল আর দক্ষতা সম্পর্কে ওয়াকিবহাল না হওয়া পর্যন্ত সেগুলো যে কেমন ভয়ঙ্কর বোঝা কঠিন। আপনার মনের সবচেয়ে বিশ্বাসযোগ্য ইমেজ রোপন করার ক্ষমতা রাখে সে। আপনার ছোটবেলার স্মৃতি ফিরিয়ে দিতে পারে, এমনকি এত স্পষ্টভাবে আপনার বাবা-মায়ের ছবি ফুটিয়ে তুলবে যে সন্দেহই হবে না।
আমার বেলায় তাতে কিছুটা সমস্যা হবে তার, তীর্যক কণ্ঠে বলল তাইতা। কারণ আমি কোনওদিন বাবা-মাকে দেখিনি।
২. উটচালকরা
উটচালকরা চলার গতি বাড়ালেও এখনও অধৈর্য হয়ে রয়েছে তাইতা। পরের রাতে আবার কাফেলা ছেড়ে সামনে চলে গেল ও, আশা করছে ডেল্টার ঢালে পৌঁছে বহু বছরের অনুপস্থিতির পর আবার প্রাণপ্রিয় মিশরের দিকে এক নজর তাকাবে। ওর আগ্রহ যেন সংক্রামক, কারণ দুলকি চালে এগিয়ে চলেছে উইন্ডস্মোকও, ওটার ছুটন্ত খুর এক সময় শেষ দূরত্বটুকুও পার হয়ে এলো। ঢালের কিনারায় এসে লাগাম টানল তাইতা। নিচে চাঁদের আলো রূপালি অলোয় ভাসিয়ে দিচ্ছে কৃষি জমিন, স্পষ্ট করে তুলেছে নীলের সীমানায় দাঁড়ানো পামগাছগুলো। রূপালি জলের ক্ষীণতম ঝিলিকের খোঁজে চোখ চালাল ও। কিন্তু এই দূরত্বে নদীর তলদেশ অন্ধকার, গম্ভীর।
ঘোড়ার পিঠ থেকে নেমে মেয়ারের নাকের কাছে এসে দাঁড়াল তাইতা, ওটার ঘাড়ে হাত বোলাতে বোলাতে মুগ্ধ চোখে শহর, চাঁদের মতো শাদা মন্দির প্রাচীর, কারনাকের প্রাসাদগুলোর দিকে তাকিয়ে রইল। ওপারে মেমননের প্রাসাদের আকাশছোঁয়া দেয়াল খুঁজে বের করলেও ঢাল বেয়ে নেমে পলিমাটির সমতল পার হয়ে থেবসের শত শত তোরণের যেকোনও একটার দিকে এগিয়ে যাওয়ার প্রলোভন ঠেকাল।
দিমিতারের খুব কাছে থাকা ওর দায়িত্ব, ওকে ফেলে সামনে ছুটে যাওয়া নয়। মেয়ারের মাথার কাছে গোড়ালির উপর বসল ও। তারপর ঘরে ফেরা ও প্রাণের প্রিয় সবার সাথে পুনর্মিলনের দৃশ্য কল্পনা করতে লাগল।
ফারাও ও রানি মিনতাকা ওকে খুবই সমাদর করেন, সাধারণত রাজ পরিবারের উধ্বর্তন সদস্যদের জন্যেই এমনি সমাদর তোলা থাকে। বিনিময়ে ওদের দুজনের জন্যেই অনুগত ভালোবাসা লালন করে ও। ছেলেবেলা থেকেই অপরিবর্তনীয় রয়ে গেছে তা। নেফারের বাবা ফারাও তামোজ নেফার খুব ছোট থাকতে খুন হন, উচ্চ ও নিম্ন মিশরের সিংহাসনে আসীন হওয়ার পক্ষে খুবই ছোট ছিলেন তিনি; তাই একজন রিজেন্ট নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। তামোজের শিক্ষক ছিল তাইতা, সুতরাং তার সন্তানকে সাবালকত্ব অর্জন করার আগ পর্যন্ত ওর হাতে তুলে দেওয়াটাই স্বাভাবিক ছিল। ওর আনুষ্ঠানিক শিক্ষার ব্যাপারটি দেখেছে তাইতা, ওকে ঘোরসওয়ার আর যোদ্ধা হিসাবে প্রশিক্ষণ দিয়েছে, তারপর যুদ্ধ পরিচালনা ও সেনাবাহিনীকে নির্দেশনা দেওয়ার কৌশল শিখিয়েছে। রাজকীয় দায়িত্ব, রাষ্ট্রযন্ত্র পরিচালনা ও কূটনীতি শিখিয়েছে। পুরুষে রূপান্তরিত করেছে তাকে। অনেক বছরের পরিক্রমায় ওদের দুজনের মাঝে একটা বন্ধন তৈরি হয়েছে, অবিচ্ছেদ্য রয়ে গেছে সেটা।
