তোমার দেখা সবচেয়ে সুন্দরী নারী কি সেই?
না, ফেন। তুমিই সবচেয়ে সুন্দরী।
কথাটা কি আমার জিভটাকে বাধা দিতে বলছ নাকি মন থেকে?
তুমি আমার ছোট মাছ, তোমার সৌন্দর্য সোনালি দোরাদোর মতো, সব সাগরের সবচেয়ে মোহনীয় প্রাণী।
আর ইয়োস? তার কথা কী বলবে? সে কি সুন্দরী না?
খুবই সুন্দরী ছিল বটে, কিন্তু সেটা অনেকটা খুনে হাঙরের সৌন্দর্যের মতো। ওর ছিল ভয়ঙ্কর, আতঙ্ক জাগানো সৌন্দর্য।
সে যখন তোমার সাথে মিলিত হয়েছিল, তখনকার অনুভূতি আমার সাথে মিলনের সময়কার অনুভূতি কি একই রকম ছিল?
ঠিক জীবন ও মরণের মতোই আলাদা। ওরা বেলায় ব্যাপারটা ছিল শীতল, নিষ্ঠুর। তোমার বেলায় উষ্ণ, প্রেম ও সহানুভূতিতে ভরা। ওর বেলায় ভীষণ যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার মতো, তোমর বেলায় তোমার ও আমার ভিন্ন ভিন্ন আত্মাকে মিলিয়ে বিভিন্ন অংশের তুলনায় অসীম, বিশাল সমগ্রতে পরিণত করার মতো।
ওহ, তাইতা, তোমাকে বিশ্বাস করতে যারপরনাই ইচ্ছে করছে। জানি, বুঝি কেন তোমাকে ইয়োসের কাছে যেতে হয়েছিল, ওর সাথে মিলিত হতে হয়েছে, কিন্তু তারপরেও ঈর্ষায় জ্বলে যাচ্ছি। ইদালি বলেছে পুরুষরা অনেক মেয়ের সাথে মজা লুটতে পারে। সে কি তোমাকে আনন্দ দেয়নি?
ওর বুনো আলিঙ্গন কতটা ঘৃণা করেছি, প্রকাশ করার মতো ভাষা আমার নেই। তার উচ্চারিত প্রতিটি কথা, তার দেহ ও হাতের প্রতিটি স্পর্শ আমাকে ভীত, বিতৃষ্ণ করে তুলেছে। এমনভাবে আমাকে দুষিত আর নোংরা করেছে সে, মনে হয়েছে আর কখনও পবিত্র হতে পারব না।
তোমার কথা শুনলে আমার ভেতর ঈর্ষা থাকে না। তোমার কষ্টের কথা ভেবে আমার মন সহানুভূতিতে ভরে ওঠে। তুমি কি কখনও ভুলে যেতে পারবে?
ফন্টের নীলে ধুয়ে আবার পরিচ্ছন্ন হয়েছি আমি। বয়স, পাপ ও অপরাধবোধের ভার আমার উপর থেকে তুলে নেওয়া হয়েছে।
আবার ফন্টের কথা বলল। নীলে আবৃত্ত হওয়ার সময় কেমন অনুভূতি হয়েছিল তোমার? আবার ওর পরিবর্তনের অলৌকিক ঘটনার বর্ণনা দিল তাইতা। শেষ করার পর খানিক ক্ষণ চুপ থেকে তারপর ফেন বলল, আগ্নেয়গিরি বিস্ফোরণে খোদ ইয়োসের মতোই ধ্বংস হয়ে গেছে ফন্ট।
এটাই পৃথিবীর স্পন্দিত ধমণী। প্রকৃতির স্বর্গীয় ক্ষমতা, যা জীবনকে নিয়ন্ত্রণ ও ত্বরান্বিত করে। একে কখনও ধ্বংস করা যাবে না। কারণ তেমন কিছু ঘটলে সব সৃষ্টি বিনাশ হয়ে যাবে।
এখনও তার অস্তিত্ব থাকলে কী হয়েছে তার? কোথায় গেছে?
আবার পৃথিবীর মূলে চলে গেছে, ঠিক যেভাবে চাঁদ আর স্রোতের টানে সাগর দূরে ভেসে যায়।
তবে কি চিরকালের জন্যে মানুষের নাগালের বাইরে নিয়ে যাওয়া হয়েছে এটাকে?
মনে হয় না। আমার ধারণা এক সময় ফের উঠে আসবে ওটা। হয়তো পৃথিবীর কোনও দূরপ্রান্তে এরই মধ্যে এসেও গেছে।
কোথায়, তাইতা? কোথায় আবার ফিরে আসবে ওটা?
আমি কেবল ইয়োস যতটুকু জানত ততটুকুই জানি। বিশাল কোনও আগ্নেয়গিরি আর জলের বিশাল আধারের সাথে সম্পর্কিত থাকবে এটা। আগুন, মাটি, বাতাস ও পানি; চার উপাদান।
কেউ কি আবার ফন্টের খোঁজ পাবে?
উত্তরের আগ্নেয়গিরি এরনার উদগীরণের ফলে জমিনের গভীরে চলে গেছে ওটা। সেই সময় ইয়োসের আস্তানার কাছে ছিল ওটা। আগুনের কারণে সরে পড়তে হয়েছিল তাকে। এক শো বছর ঘুরে বেড়াতে হয়েছে তাকে নীল নদ আবার কোথায় উঠে এসেছে তার সন্ধানে। চাঁদের পাহাড়ে এর খোঁজ পেয়েছিল। এখন আবার নিচে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে ওটাকে।
কতদিন তুমি তরুণ থাকবে, তাইতা?।
ঠিক করে বলতে পারব না। হাজার বছরেরও বেশি সময় তরুণ ছিল ইয়োস। তার গলাবাজি আর ওর কাছ থেকে আদার করা বিশেষ কিছু জ্ঞানের কল্যাণে সেটা জানতে পেরেছি।
এখন ফন্টে ম্লান করার পর একই ব্যাপার ঘটবে, বলল ফেন, হাজার বছর বেঁচে থাকবে তুমি?
সে রাতে দুঃস্বপ্ন দেখে কেঁদ উঠে ওকে জাগাল ফেন। ওর নাম ধরে ডাকল। তাইতা, আমার জন্যে অপেক্ষা করো! ফিরে এসো! আমাকে ফেলে যেয়ো না। ওর গালে হাত বুলিয়ে দিল তাইতা, চোখের পাতায় চুমু খেয়ে আস্তে করে জাগিয়ে তুলল ওকে। ব্যাপারটা স্রেফ স্বপ্ন ছিল বুঝতে পেরে ওকে আঁকড়ে ধরল ফেন। তুমি, তাইতা। সত্যি তুমি? তুমি আমাকে ফেলে চলে যাওনি?
তোমাকে ফেলে কোনওদিনই যাব না আমি, নিশ্চিত করল ও।
যাবে। এখনও চোখজোড়া অশ্রুতে ঝাপসা হয়ে আছে তার।
কখনও না, আবার বলল তাইতা। তোমাকে ফিরে পেতে অনেক দিন লেগেছে আমার। তোমার স্বপ্নের কথা বলো, ফেন। চিমা বা ট্রগরা ধাওয়া করছিল তোমাকে?
চট করে জবাব দিল না ও। এখনও নিজের উপর নিয়ন্ত্রণ ফিরে পাবার চেষ্টা করছে। অবশেষে ফিসফিস করে কথা বলল। এটা হাস্যকর স্বপ্ন ছিল না।
আমাকে বলল ওটার কথা।
স্বপ্নে আমি বুড়িয়ে গেছি। আমার চুল পাতলা, শাদা হয়ে গেছে-চোখের সামনে ঝুলে থাকতে দেখতে পাচ্ছিলাম। আমার চামড়া কুঁচকে গেছে, হাতের হাড় জিরজিরে থাবার মতো। পিঠ কুঁজো হয়ে গেছে, পা ফুলে যন্ত্রণাদায়ক হয়ে পড়েছে। তোমার পেছনে পেছনে কোনওমতে যাচ্ছিলাম, কিন্তু এত জোরে হাঁটছিলে তুমি, তোমার সাথে তাল মেলাতে পারছিলাম না। পিছিয়ে পড়ছিলাম, এমন কোথাও চলে যাচ্ছিলে তুমি যেখানে তোমার সাথে আমি যেতে পারব না। ফের অস্থির হয়ে উঠল ও। চিৎকার করে তোমাকে ডাকছিলাম, কিন্তু শুনতে পাচ্ছিলে না তুমি। আবার কাঁদতে শুরু করল সে।
