এটা কেবলই স্বপ্ন, দুহাতের বৃত্তের ভেতর ওকে শক্ত করে ধরে রাখল তাইতা, কিন্তু প্রবলভাবে মাথা নাড়ল ফেন।
এটা ছিল ভবিষ্যতের একটা ছবি। পেছনে না তাকিয়ে দ্রুত চলে গেছ তুমি। তুমি লম্বা, শক্তিশালী, ঋজু, তোমার পাজোড়া শক্তিশালী। তোমার চুল ঝলমলে, ঘন। হাত বাড়িয়ে এক গোছা চুল আঙুলে জড়াল সে। ঠিক এখনকার মতোই।
বোন আমার, খামোকা নিজেকে কষ্ট দিয়ো না। তুমিও খুবই সুন্দর ও তরুণী।
হয়তো এখন। কিন্তু তুমি এমনই রয়ে যাবে, আর আমি বুড়িয়ে যাব, মরে যাব। তোমাকে আবার হারাতে হবে আমাকে। আমি আর শীতল তারায় পরিণত হতে চাই না। তোমার সাথে থাকতে চাই।
ওর আয়ত্তাধীন অনেক কালের সমস্ত প্রজ্ঞা দিয়েও ফেনকে সান্ত্বনা দেওয়ার মতো কোনও ভাষা খুঁজে পেল না তাইতা। শেষে আবার ওর সাথে মিলিত হলো। ওর আলিঙ্গনে ধরা দিল ফেন, এক ধরনের মরিয়া উন্মাদনায়, যেন ওর সাথে মিশে যেতে চাইছে, শারীরিক দেহের সাথে সাথে আত্মায়ও মিশে এক হয়ে যেতে চাইছে, যেন এমনকি মরণও ওদের বিচ্ছিন্ন করতে না পারে। শেষে ভোরের ঠিক আগে। ভালোবাসা ও হতাশার ক্লান্তিতে ঘুমিয়ে পড়ল ফেন।
*
সময়ে সময়ে দীর্ঘদিন আগে পরিত্যক্ত লু-দের গ্রাম পার হয়ে যাচ্ছে ওরা। খুটির উপর কোনওমতে জ্বলছে কুঁড়েগুলো। ফুঁসে ওঠা পানিতে লুটিয়ে পড়তে যাচ্ছে। পানি বেড়ে ওঠায় বিশাল সুদের আশপাশের উঁচু এলাকার খোঁজে সরে যেতে বাধ্য হয়েছে ওরা, ব্যাখ্যা করল ফেন। পানি কমে যাবার পরেই কেবল আবার মাছ ধরতে ফিরে আসবে।
ভালোই হয়েছে, বলল তাইতা। ওদের সাথে দেখা হয়ে গেলে নিশ্চিতভবাবেই যুদ্ধ করতে হতো। অথচ এই অভিযানে এমনিতেই আমাদের অনেক দেরি হয়ে গেছে। আমাদের লোকেরা ঘরে ফিরতে অধীর হয়ে উঠেছে।
ঠিক আমার মতে, সায় দিল ফেন। যদিও আমার বেলায় এই জীবনে প্রথমবারের মতো ঘরে যাওয়া হবে।
সেরাতে আবার দুঃস্বপ্ন তাড়া করল ফেনকে। ওকে জাগিয়ে তুলল তাইতা, উদ্ধার করে আনল মনের অন্ধকার ত্রাস থেকে। এক সময় ওর হাতের উপর নিথর হয়ে না শোয়া পর্যন্ত ওকে সোহাগ আর চুমু খেয়ে চলল। কিন্তু তারপরেও জ্বরাক্রান্তের মতো কাঁপতে লাগল ফেন। ছুটন্ত ঘোড়ার খুরের আওয়াজের মতো ওর বুকের কাছে ধুকপুক করে চলল ওর হৃৎপিণ্ড।
সেই একই স্বপ্ন? মৃদু কণ্ঠে জানতে চাইল তাইতা।
হ্যাঁ, তবে আরও খারাপ, ফিসফিস করে বলল ফেন। এইবার বয়সের ভারে আমার চোখের দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে গেছে আর তুমি এত দূরে চলে গেছ যে কেবল তোমার গাঢ় অবয়বই দেখতে পাচ্ছিলাম আমি, আবছায়ায় মিশে যাচ্ছ। ফেন আবার কথা বলার আগ পর্যন্ত দুজনই চুপ রইল। তোমাকে হারাতে চাই না, কিন্তু জানি অর্থহীন বাসনা আর দুঃখ করে দেবতারা আমাদের যে ভালোবাসার সময়টা দিয়েছেন তা নষ্ট করা যাবে না। আমাকে অবশ্যই শক্তিমতী ও সুখী থাকতে হবে। অবশ্যই একসাথে থাকার সময়টুকু উপভোগ করতে হবে-না ঘটা পর্যন্ত এই ভীষণ বিচ্ছিন্নতার কথা বলব না। আরও এক মিনিট নীরব রইল সে, তারপর এত নিচু কণ্ঠে কথা বলল যে বুঝতে কষ্ট হলো তাইতার। যতক্ষণ না ঘটছে, তবে অবশ্যই ঘটবে।
না, প্রিয় ফেন আমার, জবাব দিল তাইতা। এটা অনিবার্য নয়। আর কখনওই আমরা বিচ্ছিন্ন হবো না। ওর বাহুতে স্থির হয়ে গেল ফেন। বলতে গেলে শ্বাসই ফেলছে না, এত মনোযোগ দিয়ে শুনছে। তাকে ঠেকাতে কী করতে হবে আমি জানি।
বলো আমাকে! দাবি করল ফেন। ব্যাখ্যা করল তাইতা। মনোযোগ দিয়ে শুনল ফেন। কিন্তু তাইতা শেষ করতেই একশো একটা প্রশ্ন শুরু করল। তাইতা সেগুলোর জবাব দেওয়ার পর বলল, সেটা অনন্ত কালের মতো হতে পারে। ওর সামনে তাইতার মেলে ধরা ছবির আওতায় হতাশ।
কিংবা হয়তো কয়েক বছর লাগতে পারে, বলল তাইতা।
ওহ, তাইতা, নিজেকে সামলে রাখতে কষ্ট হচ্ছে আমার। কখন শুরু করতে পারব আমরা?
তার আগে আমাদের প্রিয় মিশরের যে ক্ষতি ইয়োস করে গেছে তার পুনর্বাসনের জন্যে অনেক কিছু করার বাকি রয়ে গেছে।
ততদিন পর্যন্ত ক্ষণ গুনে যাব আমি।
*
দিনের পর দিন হাওয়া স্থিতিশীল রইল, ফলে মাঝিরা মনের আনন্দে গান গাইতে গাইতে বৈঠা বেয়ে চলল, ওদের প্রাণশক্তি অফুরান, হাত আর শিরদাঁড়া অপরাজেয়, নাকোন্তোর ভাস্তেরা ওদের নির্ভুলভাবে বিভিন্ন খালের ভেতর দিয়ে পথ দেখিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। রোজ দুপুরে মাস্তুলের ডগায় উঠে যায় তাইতা, সামনের বিস্তার জরিপ করে। ওর প্রত্যাশার ঢের আগেই দূরে অন্তহীন প্যাপিরাসের মাথার উপর প্রথম গাছপালার অবয়ব দেখতে পেল ও। গালির কীলের নিচে গম্ভীর হয়ে উঠেছে নীলের জল, দুপাশের আগাছার প ফাঁক হয়ে গেছে। শেষ পর্যন্ত বিশাল সুদে এসে পড়ল ওরা। সামনে পড়ে আছে বিশাল সমতল ভূমি, যার ভেতর দিয়ে দীর্ঘ সবুজ পাইথনের মতো চলে গেছে নীল, এক সময় হারিয়ে গেছে দূরের ধূলিময় ধোয়াশায়।
একটা খাড়া তীরের কাছে গালিগুলো নোঙর করল ওরা। অনেক দিন বাদে তাইতা ও ওর লোকজন শুকনো মাটিতে শিবির খাটানোর সময় ঘোড়াগুলোকে ছেড়ে দিল। এক লীগ দূরে নোংরা সমতলের ওপাশে আটটা জিরাফের একটা পাল চ্যাপ্টা মাথার বাবলা গাছের একটা ঝাড়ে চরে বেড়াচ্ছে।
শিলুকদের ওখান থেকে বিদায় নেওয়ার পর থেকে আর টাটকা মাংস জোটেনি আমাদের কপালে, তিনাতকে বলল তাইতা। মাগুর মাছের বদলে অন্য কিছু খেতে পারলে সাবাই খুশি হবে। একটা শিকারী দল করার কথা বলছি আমি। ওদের যারীবা তৈরি শেষ হয়ে গেলে লোকজনকে বিশ্রাম নিয়ে মজা করতে দাও।
