নিশ্চিত হচ্ছো কী করে?
ওরা কত লম্বা আর ছিপছিপে দেখ, ওদের দাঁড়ানোর ভঙ্গি, ঠিক একপায়ে দাঁড়ানো ধ্যানমগ্ন সারসের মতো, অন্য পাটা থোেড় মাংসের কাছে তুলে রাখা। শিলুক না হয়ে পারে না।
নাকোন্তোও দেখেছে ওদের। ওর স্বাভাবিক নির্লিপ্ত নিরাসক্ত হাবভাব উধাও হয়েছে। ডেকের সবাইকে হতবাক করে যুদ্ধের নাচে মেতে উঠেছে সে, তীক্ষ্ণ কণ্ঠে চিৎকার করছে, আগাছার উপর দিয়ে ভেসে ওপাড়ে পৌঁছে যাচ্ছে সেই হাঁক। ওর কাণ্ড দেখে হাসছে ইম্বালি, হাত তালি দিচ্ছে, আরও বেশি চিৎকার করার উৎসাহ দিতে উলু ধনি করছে।
রাখালরা ওদের নিজস্ব ভাষায় কারও ডাকার আওয়াজ পেল। দৌড়ে তীরে এসে বিস্ময়ের সাথে অতিথিদের দিকে তাকিয়ে রইল। দুজনকে চিনতে পারল নাকোন্তো, ডাকল ওদের: সিকুনেলা! তিষাইল!
সবিস্ময়ে সাড়া দিল ছেলেরা। আগন্তুক, কে তুমি?
আমি আগন্তুক নই। আমি তোমাদের চাচা নাকোন্তা, বিখ্যাত বর্শাধারী! পাল্টা চিৎকার করে বলল ও।
উত্তেজনায় চেঁচিয়ে উঠল ছেলেরা, বড়দের ডাকতে চলে গেল গ্রামের দিকে। অল্পক্ষণের মধ্যেই কয়েক শো শিলুক হাজির হলো নদীর পাড়ে, বিস্ময়ে নাকোন্তোর উদ্দেশে হাত নাড়ছে। তারপর বের হয়ে এলো বেঁটে নোম্ভ, গোটা সাড়ে চার কিউবিট, সামনে তার স্ত্রী ও ওদের নানা আকারের ছেলেপুলে।
মহানন্দে আলিঙ্গন করল নাকোন্তো ও নোম্ভ। তারপর মেয়েদের হুকুম দিল নো, দল বেঁধে গ্রামে ফিরে গেল তারা। অচিরেই আবার মাথার উপর উপচে পড়া বিয়রের বিশাল পাত্র নিয়ে ফিরে এলো।
নদীর পাড়ের উৎসব বেশ কয়েকদিন স্থায়ী হলো, কিন্তু শেষ পর্যন্ত নাকোন্তো এলো তাইতার কাছে। আপনার মতো মহান এক মানুষের সাথে অনেক দূরের পথ যাত্রা করেছি, এখন আর আপনি প্রবীন পুরুষ নন, বলল সে। বিশেষ করে লড়াইটা দারুণ ছিল, কিন্তু এটাই আমাদের একসাথে চলার শেষ। আপনি নিজের লোকদের কাছে ফিরে যাচ্ছেন, আমাকেও আমার লোকদের কাছে ফিরে যেতে হবে।
বুঝতে পারছি। একটা ভালো মেয়ে পেয়েছ তুমি, তোমার সাথে মানাবে সে। তোমার সন্তানরা তোমার মতোই লম্বা চওড়া হোক এটাই আশা করি। তুমি যেন ওদের বাপের মতোই সমান দক্ষ বর্শা চলাতে শেখাতে পারো।
এটা ঠিক, আমার চেয়ে বয়সে ছোট বুড়ো বাবা। কিন্তু আমি পথ না দেখালে কীভাবে বিশাল জলাভূমিতে পথ খুঁজে পাবেন?
তোমার গোত্রের এমন দুজন তরুণকে বাছাই করবে তুমি যারা এখন তোমার সাথে আমার পরিচয়ের সময় তুমি যেমন ছিলে ঠিক সেরকম অবস্থায় আছে-যুদ্ধ আর অ্যাডভেঞ্চারের জন্যে উন্মত্ত। পথ দেখানোর জন্যে ওদের আমার সাথে পাঠাবে তুমি। বিশাল সুদ-এ ওদের পথ দেখাতে দুই ভাস্তেকে বাছাই করল নাকোন্তো।
ওরা একেবারে অল্পবয়সী, ওদের জরিপ করে বলল তাইতা। খালগুলো চিনতে পারবে তো?
বাচ্চারা কি জানে না কীভাবে মায়ের দুধের কাছে যেতে হয়? হেসে ফেলল নাকোন্তো। আপনারা এখন যান, আমার বয়স যত বাড়বে তত আপনাদের কথা ভাবব আমি, সেটা সব সময়ই আনন্দের সাথে।
জাহাজের গুদাম থেকে পাঁচ শো গরু কেনার জন্যে যত ইচ্ছে পুঁতি নিয়ে নাও। শিলুকরা গরুবাছুর আর জন্ম দেওয়া ছেলে দিয়ে সম্পত্তির পরিমাপ করে। এক মুঠো ব্রোঞ্জের বর্শাও নাও, যাতে তোমার ছেলেরা সব সময়ই সশস্ত্র থাকে।
আপনার আর আপনার নীলের জলে ঝিলিক মারা সূর্যের আলোর মতো চুলের মেয়েমানুষ ফেনের তারিফ করি আমি।
আলিঙ্গন করল ফেন ও ইম্বালি, কাঁদল দুজনই। ঘাটের অর্ধেকটা দূরত্ব পর্যন্ত নৌবহরকে অনুসরণ করল নাকোন্তো ও ইম্বালি, নদীর তীর বরাবর দৌড়াচ্ছে, সামনের সারির নৌকার সাথে তাল মিলিয়ে চলছে, হাত নেড়ে নাচছে, চিৎকার করে বিদায় জানাচ্ছে। অবশেষে থামল ওরা। স্টার্নে একসাথে দাঁড়াল ফেন ও তাইতা, ওদের দীর্ঘ অবয়ব ধীরে ধীরে ছোট হয়ে যেতে দেখল।
*
সীমাহীন দিগন্ত অবধি বিছানো প্যাপিরাসের তীরের প্রথম মায়াবী দৃশ্য–দেখা দেওয়ামাত্র নাকান্তোর দুই ভাস্তে গলুইয়ে অবস্থান নিল, জলময় বুনো এলাকায় ঢোকার পর হালে অবস্থান নেওয়া মেরেনকে বিভিন্ন বাঁক আর মোড় সম্পর্কে ইশারা দিয়ে চলল।
নীল এখন প্রবল বেগে প্রবাহিত হওয়ায় জলাভূমিতে কেবল পানি আর পানি, কোথাও পা রাখার জায়গা নেই, ফলে দিনের পর দিন বৈঠা বেয়ে চলতে বাধ্য হচ্ছে ওরা। কিন্তু ওদের উত্তরে ঠেলে দেওয়া বাতাস স্থির, অবিচল রয়ে গেছে। তেকোণা পাল ফুলিয়ে তুলে আগাছা থেকে লাফিয়ে উঠে আসা হুল ফোঁটানো কীটপতঙ্গের ভেতর দিয়ে সবেগে ঠেলে নিয়ে যাচ্ছে ওদের। প্রায়শই বাতাসের এই অস্বাভাবিক তুষ্টি নিয়ে ভাবছে ফেন। অবশেষে অনুমান করল তাইতা ইয়োসের কাছ থেকে আদায় করা ওর অসাধারণ ক্ষমতা কাজে লাগিয়ে এমনকি প্রকৃতির উপাদান গুলোকেও ইচ্ছামতো আচরণে বাধ্য করেছে।
এমনি পরিস্থিতিতে জলের উপর দিয়ে যাত্রা অসহনীয় হয়ে উঠছে না। তাইতার কাছে তেমন কোনও দাবি দাওয়া নেই কারও, ফলে নৌকা চালানোর দায়িত্ব মেরেন ও নাকোন্তোর দুই ভাস্তে আর অন্যান্য ব্যাপার তিনাতের হাতে ছেড়ে দিতে পেরেছে ও। ফেন আর ও বেশির ভাগ সময়ই সামনের ডেকে নিজস্ব জায়গায় থাকে। ওদের আলাপের সিংহভাগ জুড়ে থাকে প্রথমত, ইয়োসের সাথে তাইতার সংঘাত ও দ্বিতীয়ত, দুর্গের আবিষ্কার ও তার অলৌকিক সম্পত্তি। ফেন ওর মুখে ইয়োসের বর্ণনা শুনতে কখনও ক্লান্ত হয় না।
