তলোয়ার উঁচু করে ধরেই আবার সজোরে নামিয়ে অনল তাইতা। সঙ্কেত ছিল এটা। বাঁকা কুড়ু শিংয়ের শিঙ্গা তীক্ষ্ণ আওয়াজে বেজে উঠল। আওয়াজ শুনে শত শত নগ্ন চিমা কুঁড়ে ছেড়ে বের হয়ে এলো, চেয়ে রইল আগুয়ান নৌকাগুলোর দিকে। হতাশার আর্তনাদ ছড়িয়ে পড়ল। ভীষণ আতঙ্কে ছড়িয়ে পড়ে ছুটতে শুরু করল ওরা। অল্প কয়েকজন সশস্ত্র ছিল, কিন্তু বেশিরভাগই তখনও নিদ্রালু অবস্থায় ছিল। গাছের আশ্রয়ের দিকে ছুটে যাবার সময় মাতালের মতো টলছে, পড়ে যাচ্ছে হুমড়ি খেয়ে। আবার তলোয়ার ধরা হাত ওঠাল তাইতা। ওটা নামিয়ে আনতেই ওদের দিকে তীরের একটা মেঘ ছেড়ে দিল তীরন্দাজরা। ছুটন্ত এক মায়ের পিঠে বাঁধা এক বাচ্চাকে তীরের আঘাতে স্থির হয়ে যেতে দেখল তাইতা। তারপর শেষ করে দিল মাকেও।
আমাদের তীরে নিয়ে চলো! গলুই কিনারা স্পর্শ করামাত্র হামলায় নেতৃত্ব দিল ও।
ঘেরাও হয়ে থাকা চিমাদের পিছু ধাওয়া করল বর্শা আর কুড়োলধারীরা। সামনের দিকে আরেক দফা ত্রাস আর হতাশার আর্তনাদ উঠল, হিলতোর পাতা কাঁদে গিয়ে পড়েছে ওরা। জীবন্ত মাংসে আঘাত হানতে লাগল তিনাত-বাহিনীর তলোয়ার; বের করে আনার সময় এক ধরনের ভেজা শব্দ করছে। কনুই পর্যন্ত কাটা হাত নিয়ে তাইতার দিকে ছুটে এলো এক চিমা। কাটা জায়গা থেকে সারা গায়ে রক্ত ঝরে পড়ায় পাগলের মতো আর্তনাদ করছিল সে। ওকে চকচকে লাল রঙে রঞ্জিত করে ফেলেছে। এক কোপে ওকে শেষ করে দিল তাইতা, খুলিটা মাঝখান থেকে দুভাগ করে দিল। এবার একটামাত্র আঘাতে তার পিছনে ছুটে আসা নগ্ন মেয়েটির বুকের ঠিক মাঝখানে আঘাত করে মারল। যুদ্ধের ক্রোধে সামান্যতম অনুশোচনা বা করুণা বোধ করছে না। পরের লোকটা নিজেকে বাঁচানোর ব্যর্থ প্রয়াসে খালি হাত মাথার উপর ওঠাল। এতটুকু করুণা ছাড়াই ওকে দুভাগ করে ফেলল তাইতা, যেভাবে হয়তো সেতুসে মাছি মারবে।
দুই সারি সশস্ত্র লোকের মাঝখানে আটকা পড়ে চিমারা জালে পড়া মাছের ঝকে মতো এদিক ওদিক ছোটাছুটি শুরু করল। প্রতিশোধ ছিল শীতল ও নিষ্ঠুর, হত্যালীলা ভবয়াবহ ও সম্পূর্ণ। অল্প কয়েক জন চিমা ব্রোঞ্জের ছোট হয়ে আসা বৃত্ত থেকে পালিয়ে নদীর কিনারে পৌঁছাতে পারল। কিন্তু ওদের অপেক্ষায় ছিল তীরন্দাজরা। অপেক্ষায় ছিল কুমীরগুলোও।
কেউ পালাতে পেরেছে? লাশ আর মরণোন্মুখে ভরা মাঠের মাঝখানে মিলিত হওয়ার পর তিনাতকে জিজ্ঞেস করল তাইতা।
কয়েকজনকে আবার কুঁড়েয় ফিরতে দেখেছি। ওদের পেছনে যাব?
না। এতক্ষণে অস্ত্র তুলে নিয়েছে ওরা, কোণঠাসা চিতার মতো ভয়ঙ্কর হয়ে থাকবে এখন। আমি আর আমার লোকদের ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিতে পারব না। কুঁড়ের ছাউনীতে আগুন ধরিয়ে ধোঁয়া দিয়ে বের করে আনো ওদের।
সূর্য গাছপালার মাথার উপর উঠে আসতে আসতে সবকিছু চুকেবুকে গেল। তিনাতের দুজন সৈনিক সামান্য চোট পেয়েছে, কিন্তু নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে চিমারা। হায়েনার দল ব্যবস্থা করবে বলে যেখানে পড়েছে সেখানেই লাশ ফেলে রাখল ওরা। নৌকায় ফিরে সূর্য দুপুরে পৌঁছানোর আগেই উত্তরে পাল ওড়াল।
এখন কেবল মহান সুদের জলাভূমিই আমাদের পথে বাধা হয়ে আছে, ফেনকে বলল তাইতা, সামনের ডেকে একসাথে বসে আছে ওরা। যে জলাভূমিতে তোমার দেখা পেয়েছিলাম আমি। তুমি ছিলে ছোট বুনো বর্বর, ওই গোত্রের সাথে ছিলে।
সব কিছু কতদিন আগের মনে হচ্ছে, বিড়বিড় করে বলল ফেন। স্মৃতি এখন ফিকে, ধূসর হয়ে এসেছে। ওই জীবনের চেয়ে বরং আগের জীবনের কথাই বেশি মনে করতে পারি। আশা করছি পশুর মতো লু-দের কারও সাথে আর দেখা হবে না। পুরো ব্যাপারটা সম্পূর্ণ ভুলে যেতে চাই। মাথা ঝাঁকিয়ে সোনালি চুলের গোছা পেছনে পাঠিয়ে দিল ও। এসো, আরও ভালো কোনও প্রসঙ্গে কথা বলা যাক, প্রস্তাব দিল ও। তুমি জানো ইম্বালির শরীরে ভেতরে একটা বাচ্চা বড় হয়ে উঠছে?
আচ্ছা! তাহলে ব্যাপার এই। নাকোন্তোকে ওর দিকে অন্যভাবে তাকাতে দেখেছি আমি। কিন্তু তুমি কীকরে জানলে?
ইম্বালিই বলেছে। অনেক গর্ব ওর। বলছে বাচ্চাটা নাকোন্তোর মতোই বিরাট যোদ্ধা হবে।
যদি মেয়ে হয়?
সেও যে ইদালির মতোই মহান যোদ্ধা হবে তাতে সন্দেহ নেই, হেসে ফেলল ফেন।
ওদের জন্যে ভালো খবর, তবে আমাদের জন্যে খারাপ।
খারাপ কেন? জানতে চাইল ও।
ওদের শিগগিরই হারানোর ভয় হচ্ছে। বাবা হতে যাচ্ছে বলে ভবঘুরে যোদ্ধা হিসাবে নাকোন্তোর দিন ফুরিয়ে আসছে। ইম্বালি আর বাচ্চা নিয়ে নিজের গ্রামে ফিরে যেতে চাইবে সে। শিগগিরই ঘটবে সেটা। কারণ শিলুকদের দেশের কাছাকাছি এসে পড়েছি আমরা।
বন আর হাতির এলাকা ছেড়ে চ্যাপ্টা মাথার বাবলা গাছে ভরা সাভানাহয় ঢোকার সময় নদীর তীরের চেহারা বদলে যেতে শুরু করল। কফি রঙ চামড়ায় শাদা ছোপ ছোপ দাগঅলা উঁচু উঁচু জিরাফ গাছের মগডাল থেকে পাতা ছিঁড়ে খাচ্ছে, ওদের নিচে তৃণভূমির মিষ্টি ঘাসে অ্যান্টিলোপ, কোব, তোপি, ইলান্দের পাল স্বাস্থ্যবান ডোরা কাটা যেব্রার পালের সাথে মিলেমিশে চরে বেড়াচ্ছে। পুনরুজ্জীবিত নীল ওদের আবার তার সৌন্দর্য উপভোগ করতে ফিরিয়ে এনেছে।
আরও দুদিন এগোনোর পর বেশ কয়েক শো কুঁজঅলা পশুর পাল দেখতে পেল ওরা, ওগুলোর মাথায় হেলে পড়া শিঙ। আগাছার তীরে আলগা হয়ে চরে বেড়াচ্ছে। অল্পবয়সী ছেলেরা চরাচ্ছে ওদের। ওরা শিলুক, তাতে আমার সন্দেহ নেই, ফেনকে বলল তাইতা। নাকোন্তো বাড়ি ফিরেছে।
