ত্রাস আর বিতৃষ্ণা প্রকাশ করার মতো ভাষা খুঁজে পেল না ওরা।
দেখ! ফিসফিস করে বলে উঠল ফেন। নিশ্চয়ই ছোট্ট বাচ্চা হবে। পাকা ডালিমের চেয়ে বেশি বড় হবে না খুলিটা। ভয়ে বিস্ফারিত হয়ে গেছে ওর চোখজোড়া।
দেহাবশেষগুলো জড়ো করো, নির্দেশ দিল তাইতা। নৌকায় ফিরে যাবার আগে ওদের কবরের ব্যবস্থা করতে হবে।
দেয়ালের বাইরে ছোট করে গণকবর খুঁড়ল ওরা, কারণ কবর দেওয়ার মতো তেমন কিছু অবশিষ্ট ছিলো না।
তারপরও চিমাদের এলাকা দিয়ে যেতে হবে আমাদের, শীতল, অটল দেখাচ্ছে তাইতার চেহারা। দেবতারা প্রসন্ন হলে এই খুনে কুকুরগুলোর সাথে বোঝাঁপড়ার সুযোগ মিলে যাবে।
বিদায় নেওয়ার আগে কেউ বেঁচে আছে কিনা নিশ্চিত হতে দুর্গ ও এর আশপাশের এলাকায় তল্লাশি চালাল ওরা, কিন্তু নেই কেউ। নিশ্চয়ই অসতর্ক অবস্থায় হামলা করা হয়েছিল, বলল তাইতা। লড়াইয়ের কোনও আলামত নেই।
গম্ভীর নীরবতায় নদীর পাড়ে ফিরে এলো ওরা। পরদিন ফের যাত্রা শুরু করল। চিমাদের এলাকায় পৌঁছানোর পর দুপাশে একটি করে ঘোড়সওয়ারের দলকে নামার নির্দেশ দিল তাইতা।
চোখকান খোলা রেখে সামনে বাড়ো। তোমাদের থেকে দূরত্ব বজায় রাখব আমরা যাতে চিমারা টের না পায়। ওদের কোনও নিশানা পাওয়ামাত্রই আমাদের সতর্ক করতে ফিরে আসবে।
চতুর্থ দিন তিনাতের আশা পূরণ হলো। নদীর আরেকটা প্রশস্ত বাঁক ঘুরে স্কাউটসহ হিলতোকে দেখতে পেল ওরা, তীর থেকে ওদের উদ্দেশে হাত নাড়ছে। সামনের নৌকাটা তীরে ভিড়তেই লাফ দিয়ে উঠে পড়ল হিলতো, ঝটপট তাইতাকে স্যালুট করতে এগিয়ে এলো। ম্যাগাস, এখান থেকে অল্প দূরেই নদী তীরে চিমাদের একটা বিরাট বসতি রয়েছে। বুনোদের দুই বা তিনশো জড়ো হয়েছে ওখানে।
ওরা তোমাকে দেখতে পেয়েছে? জানতে চাইল তাইতা।
না। কিছুই সন্দেহ করেনি ওরা, জবাব দিল হিলতো।
ভালো, অন্য নৌকা থেকে মেরেন ও তিনাতকে তলব করল তাইতা, তারপর দ্রুত ওর আক্রমণ পরিকল্পনা ব্যাখ্যা করল। কর্নেল তিনাতের লোকদের হত্যা করা হয়েছে, সুতরাং ওর প্রতিশোধ নেওয়ার অধিকার ও দায়িত্ব দুটোই রয়েছে। কর্নেল, আজ বিকেলে শক্তিশালী একটা বাহিনী নিয়ে তীরে যাবে-চিমাদের চোখে পড়ার হাতে থেকে বাঁচতে রাতে অভিযান চালাতে হবে। অন্ধকারে গা ঢাকা দিয়ে বনের কিনারা আর গ্রামের মাঝখানে অবস্থান নেবে। ভোরের প্রথম আলো ফুটে ওঠার সাথে সাথে নৌকা নিয়ে গ্রামে এসে যাব আমরা। তারপর নাকাড়া আর তীরে বৃষ্টির ভেতর বাড়িঘর থেকে বের করে আনব চিমাদের। ওরা নিশ্চিতভাবেই গাছপালার দিকে ছুটে যাবে। তোমার লোকদের ওপর গিয়ে পড়ার সময় পেছনে চোখ থাকবে ওদের। কোনও প্রশ্ন আছে?
ভালো, সহজ পরিকল্পনা, বলল মেরেন। সায় দিয়ে মাথা দোলাল তিনাত।
বলে চলল তাই। চিমারা দৌড়ানো শুরু করলেই মেরেন আর আমি বাকি লোজন নিয়ে ওদের পিছু ধাওয়া করব। ওদের সাঁড়াশি আক্রমণে কায়দা করতে পারব বলে মনে হয়। এবার, আদারি দুগের ভেতর আমরা কি পেয়েছিলাম সেটা মনে রেখে কাউকে বন্দি করতে যাব না। প্রত্যেককে মেরে ফেলবে।
গ্রামের অবস্থান আর বিস্তার আগেই রেকি করে রেখেছিল হিলতো, গোধূলির সময় তিনাতের বাহিনীকে তীরে নিয়ে গেল সে। রাতের মতো তীরে ভেড়ানো রইল নৌকাগুলো। তাইতা ও ফেন সামনের ডেকে মাদুর বিছাল, তারপর রাতের আকাশের দিকে তাকিয়ে শুয়ে রইল। মহাশূন্যের বিভিন্ন বস্তু সংক্রান্ত আলোচনা, কিংবদন্তী ও বিভিন্ন নক্ষত্র নিয়ে পৌরাণিক গল্প শুনতে পছন্দ করে ফেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সব সময়ই একই প্রসঙ্গে ফিরে আসে। আবার আমার তারার কথা বলো, ম্যাগাস, লস্ত্রিসের তারা, অন্য জীবনে মারা যাবার পর যা হয়ে উঠেছিলাম আমি। কিন্তু একেবারে গোড়া থেকে শুরু করো। বলল, কীভাবে আমি মারা গিয়েছিলাম, কীভাবে আমাকে তুমি নানা রকম মলম মাখিয়েছিলে, আমার কবর সাজিয়েছিলে। একটা বিন্দুও বাদ দিতে দেয় না। সব সময়ই শেষে তাই ওর চুল কেটে লস্ত্রিসের মাদুলি বানানোর অংশে এলে নীরবে কাঁদতে থাকে। হাত বাড়িয়ে তালিসমানটা ধরে।
আমি তোমার কাছে আবার ফিরে আসবতা সব সময় বিশ্বাস করতে তুমি? জিজ্ঞেস করে ও।
সব সময়, রোজ রাতে অকাশে তোমার তারা উঠতে দেখে অপেক্ষায় থাকতাম কবে ওটা আকাশের বুক থেকে হারিয়ে যাবে। আমি জানতাম ওটাই হবে আমার কাছে তোমার ফিরে আসার লক্ষণ।
নিশ্চয়ই অনেক নিঃসঙ্গ আর বিষণ্ণ ছিলে তুমি।
তুমি ছাড়া আমার জীবন শূন্য মরুর মতো, বলে তাইতা, আবার কাঁদে ফেন।
ওহ, আমার তাইতা, এত দুঃখের আর সুন্দর গল্প আর কখনও বলা হয়নি। দয়া করে এখুনি আমাকে ভালোবাসো, আমার সমস্ত আত্মা আর দেহ দিয়ে তোমাকে চাই আমি। তোমাকে আমার অন্তরে অনুভব করতে চাই, আমার অন্তস্তল স্পর্শ করো। আমাদের আর কখনওই বিচ্ছিন্ন হওয়া চলবে না।
৯. জলের উপর দিয়ে
জলের উপর দিয়ে ভোরের আলো ও নদীর কুয়াশা ভেসে আসার সাথে সাথে (এক রেখায় ভাটির দিকে সামনে ভেসে চলল নৌবহর। বৈঠাগুলো চাপা দেওয়া, নীরবতা রীতিমতো অলৌকিক। ধনুক প্রস্তুত করে উপরের কিনারে সারি বেঁধে দাঁড়িয়েছে তীরন্দাজরা। কুয়াশার আড়াল থেকে বেরিয়ে এলো ছাউনী দেওয়া ঘরের ছাদ। তীরের আরও কাছে এগিয়ে যেতে মাস্তুলে অবস্থানরত মেরেনকে ইশারা করল তাইতা। তীর থেকে একটা কুকুর ঘেঁকিয়ে উঠল। ডাক ছাড়ল করুণ সুরে। এছাড়া কোথাও কোনও শব্দ নেই। সকালের হাওয়ায় কাঁপছে কুয়াশার পর্দা। তারপর চিমাদের গ্রামটাকে উন্মুক্ত করতে একপাশে সরে গেল পর্দাটা।
