এখানে আমাদের কাজ শেষ, ফেনকে বলল তাইতা। এবার আমরা মিশরে ফিরে যেতে পারব।
ওরা যখন নীলের মুখে ঢালে ফিরে এলো, দেখল মেরেন আর তিনাত ক্ষতিগ্রস্ত নৌকার খোলস মেরামতের কাজ সেরে ফেলেছে, সেগুলো ফের জলে ভাসানোর উপযোগী হয়ে গেছে। নোঙর ওঠানোর নির্দেশ দেওয়ার আগে দুপারের হাওয়া চড়ে ওঠার অপেক্ষা করল তাইতা। তেকোণা পাল তুলে বৈঠায় টান মেরে হ্রদের খোলা জলের উপর দিয়ে ভেসে চলল ওরা। পালের সবসেরা জায়গায় হাওয়া লাগায় সূর্যাস্তের আগেই উত্তর তীরে পৌঁছে গেল। নালুবালে আর সেমলিকি নুয়ানযি নামের দুটি মহা হ্রদের জলে পরিপূর্ণ নীলের শাখায় বের হয়ে এলো। দক্ষিণে আসার সময় পার হয়ে আসা এলাকার উপর দিয়ে উত্তরে নিয়ে চলল ওদের নদী।
ওদের যাত্রার পরবর্তী বাধা ছিল মারাত্মক সেতসি মাছির সেই এলাকা। অনেক আগেই ঘোড়ার অসুস্থতার মহৌষধ তোলাস পিঠার সবটুকু শেষ করে ফেলেছে ওরা। তাই সামনের নৌকার ডেকে বসার জন্যে তেড়ে আসা প্রথম মাছিটা দেখামাত্রই গতি বদলের নির্দেশ দিল তাইতা, নৌবহরকে নদীর মাঝখানে নিয়ে এলো। স্টার্ন ধরে এক লাইনে এগিয়ে চলল ওরা। অচিরেই স্পষ্ট পরিষ্কার হয়ে গেল যে, পতঙ্গগুলোকে এড়ানো গেছে। নদীর মাঝখানে নৌকার কাছে আসতে উন্মুক্ত জলে বের হয়ে আসবে না। তো অনাক্রান্ত অবস্থায় এগিয়ে যেতে লাগল ওরা। রাতে তীরে নামা দূরে থাক কোনও নৌকাকে তীরের ধারে কাছেও যেতে দিচ্ছে না তাইতা। অন্ধকারে ভেসে চলে ওরা আধখানা চাঁদের আলোয়।
আরও দুই দিন তিন রাত স্রোতের ঠিক মাঝখানে রইল ওরা। অবশেষে কুমারীর বুক আকৃতির জোড়া পাহাড়ের অবয়ব দেখতে পেল দূরে, মাছির এলাকার উত্তরের সীমা নির্দেশ করছে ওটা। তবু নৌকাগুলোকে বিপদে ফেলার ঝুঁকি নিল না তাইতা। প্রথম পরীক্ষামূলকভাবে তীরে যাবার নির্দেশ দেওয়ার আগে আরও অনেক লীগ ভেসে চলল। স্বস্তির সাথে লক্ষ করল মাছির কোনও চিহ্ন নেই। আদারি দুর্গের পথ পরিষ্কার।
কর্নেল তিনাত প্রায় এগার বছর আগে ওখানে রেখে যাওয়া সেনাছাউনীর অবস্থা জানতে বিশেষভাবে আগ্রহী ছিল। তার ধারণা নির্যাতিতদের উদ্ধার করে আবার ওদের মাতৃভূমিতে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়া ওর দায়িত্বের ভেতর পড়ে। নৌবহর দুর্গের পাহাড়ের একই সমতলে আসার পর নোঙর করে ঘোড়াগুলোকে পাড়ে নামানো হলো।
যাত্রার ক্লান্তি থেকে কিছু সময়ের জন্যে নিস্তার পাওয়ায় আর শরীরে নিচে ফের ঘোড়ার অস্তিত্ব অনুভব করে ভালো লাগল ওদের। ফলে পাসের ভেতর দিয়ে গোড়ার পিঠে অন্যান্য ঘোড়সওয়ারের সাথে আগে বাড়ার সময় বেশ চাঙা হয়ে উঠল তাইতা, ফেন ও তিনাতের মেজাজ। দুর্গকে ঘিরে রাখা ঘেসো মালভূমি দেখতে পাচ্ছে ওরা।
তোলাসের কথা তোমার মনে আছে, ঘোড়ার কবিরাজ? জানতে চাইল ফেন। আবার তার সাথে দেখা হওয়ার অপেক্ষায় আছি আমি। আমাকে অনেক কিছু শিখিয়েছে সে।
ঘোড়ার বেলায় জাদু দেখাতে পারে সে, সায় দিল তাইতা। উইন্ডস্মোককে তার খুবই পছন্দ হয়েছিল, ভালো জাতের ঘোড়া চিনতে পারে। মেয়ারের ঘাড়ে চাপড় দিল ও। ওর কণ্ঠ শোনার জন্যে কান বাকাল ঘোড়াটা। তোকে আমার কাছ থেকে হাতিয়ে নিতে চেয়েছিল সে, তাই না? নাক দিয়ে আওয়াজ করল ঘোড়াটা, মাথা দোলাল। তুইও নিশ্চয়ই স্বেচ্ছায় চলে যেতি ওর সাথে, বিশ্বাসঘাতিনী, বুড়ী ছিনাল কোথাকার।
দুর্গের দিকে এগিয়ে চলল ওরা, কিন্তু বেশি দূরে যাবার আগেই একটা কিছু গড় বড় হয়ে গেছে বলে মনে হতে লাগল। মালভূমিতে কোনও ঘোড়া বা গরুছাগল নেই; দেয়ালের ওপাশ থেকে ধোঁয়া উঠে আসছে না। প্যারাপেটের উপর পতাকাও উড়ছে না।
আমার লোকজন সব গেল কোথায়? বলে উঠল তিনাত। রাবাত বিশ্বস্ত লোক। এতক্ষণে আমাদের তার দেখার কথা…এখনও এখানে থাকলে। উদ্বিগ্নভাবে আগে বাড়ল ওরা। শেষে চিৎকার করে উঠল তিনাত, দেয়ালগুলো খুব খারাপ অবস্থায় পড়েছে। গোটা জায়গাটাই মনে হচ্ছে খাখা করছে।
প্রহরা মিনার আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে মনে হচ্ছে, লক্ষ করল তিনাত, ঘোড়াগুলোকে আরও জোরে ছোটার তাগিদ দিল ওরা।
যখন দুর্গের তোরণে পৌঁছুলে, দেখা গেল হাঁ করে খোলা ওটা। প্রবেশ পথে থামল ওরা, ভেতরে নজর চালাল। আগুনে কালো হয়ে গেছে দেয়ালগুলো। রেকাবে উঁচু হয়ে দাঁড়িয়ে প্যারাপেটের উদ্দেশ্যে সৈনিকসুলভ হুঙ্কার ছাড়ল তিনাত। কোনও জবাব মিলল না। অস্ত্র বের করে নিল ওরা। কিন্তু সেনাছাউনীর উপকারে আসতে অনেক দেরি করে ফেলেছে। গেটের ভেতরে ঢুকে আগে বাড়ার সময় প্রাঙ্গণের কেন্দ্রে রান্নার আগুনের ধারে ওদের দেহাবশেষ করুণভাবে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে থাকতে দেখল ওরা।
চিমা! মানুষখেকোদের ভোজৎসবের আলামত দেখে বলল তাইতা। মজ্জা বের করতে হাত-পায়ের লম্বা হাড়গুলো আগুনে পুড়িয়েছে চিমারা, তারপর বড় আকারের পাথরে রেখে ফাটিয়েছে। চারপাশে ছড়িয়ে আছে ভাঙা টুকরোটাকরা। শিকারের ছিন্ন মাথাগুলোরও একই অবস্থা করেছে ওরা, আগুনে পুড়িয়ে কালো করে উটপাখির সেদ্ধ ডিমের মতো ফাটিয়েছে। মনের চোখে গোল হয়ে বসে উন্মুক্ত খুলি হাত বদল করতে দেখল ওদের তাইতা। আধা-সেদ্ধ মগজ হাত দিয়ে কুড়িয়ে তুলে মুখে ঠেসে দিচ্ছে।
খুলিগুলোর আনুমানিক একটা হিসাব করল তাইতা। মনে হচ্ছে ছাউনীর কেউই পালিয়ে বাঁচতে পারেনি। মেয়ে, শিশু, পুরুষ-সবাইকেই কায়দা করেছে চিমারা।
