আমি জানি, ওর কাছে ঘেঁষে এলো ও। তোমাকে খুলে বলেছি সব, জাররিতে আমার উপর কি ঘটেছে, সবই বলেছি। ওনকা দানোটা… থেমে গেল সে, তারপর আবার শান্ত কণ্ঠে বলল, অনেক ক্ষত রেখে গেছে সে।
ক্ষতগুলো কখনও সেরে উঠবে না? জানতে চাইল মেরেন। সারা জীবন তার অপেক্ষায় থাকব আমি।
তার দরকার হবে না। তোমার সাহায্যে একদম সেরে গেছে, এমনকি সামান্য চিহ্ন পর্যন্ত নেই। লাজুক ঢঙে মাথা হেলাল সে। তুমি হয়তো আমার মাদুরটা তোমার কাছে নিয়ে আসার অনুমতি দেবে, তবে আজ রাতে…।
দুটো মাদুরের দরকার নেই আমাদের। আগুনের আলোয় বিস্তৃত হাসিতে উজ্জ্বল হয়ে আছে তার চেহারা। আমারটা যথেষ্ট বড়। তোমার মতো ছোট্ট মানুষটির ঠিকই জায়গা হয়ে যাবে। নিজে উঠে সিদুদুকে টেনে দাঁড় করাল ও। ওরা আগুনের বৃত্ত ছেড়ে যাবার সময় ইম্বালি আর নাকোন্তো ওদের গমনপথের দিকে তাকিয়ে রইল।
এই বাচ্চারা! আমোদিত মাতৃসুলভ ঢঙে বলে উঠল ইম্বালি। চোখের সামনে কী পড়ে আছে সেটা ওদের দেখিয়ে দেওয়া চাট্টিখানি কথা নয়। তবে এবার আমার কাজ শেষ হয়েছে। একরাতেই দুটো! নিজের উপর দারুণ খুশি আমি।
তাই বলে ধারেকাছের বাকি সবাইকে নিয়ে আবার মাথা ঘামাতে যেয়ো না, তাতে আবার তোমার চোখের সামনে যে আছে তাকে অবহেলা করে বসতে পারো, মেয়ে, কড়া কণ্ঠে ওকে বলল নাকোন্তো।
আহ, ভুল হয়ে গেছে। আমার কাজ শেষ হয়নি। বলে হেসে উঠল সে। আমার সাথে চলো, শিলুকদের মহান নেতা। তোমার বর্শা শানিয়ে দিচ্ছি। তাতে ভালো ঘুম হবে তোমার। হেসে উঠল সে। আর আমারও!
*
অগুনতি প্রজাতির হাতির পথ চলায় বিক্ষত একটা পথ চলে গেছে রিফট উপত্যকার ঢালের উপর দিয়ে, কিন্তু পথটা সংকীর্ণ হওয়ায় নৌকাগুলো নিচে বয়ে যাওয়া কাবা-লেগা জলপ্রপাতের নিচের অংশে নদীর কাছে নিয়ে যেতে পথটা চওড়া করতে অনেক সময় ও শ্রম ব্যয় করতে হলো ওদের। অবশেষে নৌবহর আবার ভাসাতে পারল ওরা, জলধারার কেন্দ্রে চলে এলো। স্রোত জোরাল হওয়ায় দ্রুত উত্তরে টেনে নিয়ে চলল ওদের, কিন্তু বিপজ্জনকও। মোটামুটি সমান সংখ্যক দিনে ডুবো পাহাড়ের খোঁচায় পাঁচটা নৌকা খোয়াতে হলো ওদের। ছয়টা ঘোড়াসহ তিনজনের সলিলসমাধি হলো। সিমলিকি নিয়নযু হ্রদের খোলা জলে বের হয়ে আসতে আসতে প্রায় সবগুলো নৌকাই ক্ষতবিক্ষত, দুমড়ে মুচড়ে গেল। এমনকি নীল আবার বইতে শুরু করার এই স্বল্প সময়ের ভেতর নাটকীয়ভাবে ভরে উঠেছে এটার জলধারা। এখন আর অগভীর, কাদাময় নেই, রোদের আলোয় নীলে ঝলক খেলছে। উত্তরের বিস্তৃর্ণ জলের সীমানার ওপারে তীরের আবছা নীল রেখা কোনওমতে চোখে পড়ে, কিন্তু পশ্চিমে জমিনের লেশমাত্র নেই।
কাছের তীরে এখন অনেকগুলো গ্রাম চোখে পড়ছে, তবে ওরা এপথে যাবার সময় ছিল না এগুলো। এটা পরিষ্কার, ইদানীং এখানে বসতি গড়ে উঠেছে। কারণ সদ্য তোলা মাগুর মাছ ঝলসানোর তাকে বিছিয়ে রাখা হয়েছে, অগ্নিকুণ্ডে টাটকা আগুন জ্বলেছে। কিন্তু নৌবহরকে এগিয়ে আসতে দেখে সরে পড়েছে লোকজন।
এই গোত্রকে আমি চিনি। ওরা ভীতু জেলে, আমাদের জন্যে হুমকি হবে না, তাইতাকে বলল ইম্বালি। এখন বিপজ্জনক সময় যাচ্ছে, যুদ্ধংদেহী গোত্রগুলো ঘিরে রেখেছে ওদের। সেজন্যেই পালিয়ে গেছে ওরা।
নৌকার খোল মেরামতের জন্যে তীরে ওঠানোর নির্দেশ দিল তাইতা। ঢালের দায়িত্ব তিনাত ও মেরেনের হাতে দিয়ে নাকোন্তো ও ইম্বালিকে দোভাষী হিসাবে ফেনসহ অক্ষত নৌকায় করে হ্রদের পশ্চিম প্রান্ত ও সেমলিকি নদীর মুখের দিকে রওয়ানা হলো তাইতা। নীলের অন্য বিশাল শাখাঁটি আবার বইতে শুরু করেছে নাকি এখনও ইয়োসের বৈরী প্রভাবে রুদ্ধ হয়ে আছে, জানতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ও। কারনাকে পৌঁছার পর ওকে অবশ্যই ফারাওকে এইসব বিষয় জানানোর মতো অবস্থায় থাকতে হবে, মিশরের মঙ্গলের জন্যে এসব জরুরি।
পুব থেকে একটানা বাতাস বইছে। তাতে বৈঠার বেঞ্চের মাঝিদের সাহায্য করার জন্যে তেকোণা পাল খাটাতে পারল ওরা। গলুইয়ের নিচ দিয়ে বয়ে যাওয়া নিচু ঢেউয়ের কারণে শাদা সৈকতের সীমারেখা পাথুরে জমিন ধরে তরতর করে এগোতে লাগল ওরা। দিগন্তে রইল নীল পাহাড়ের বাঁধ। পঞ্চম দিনে দক্ষিণ থেকে এসে হ্রদে মেশা প্রশস্ত খরতোয়া নদীর মুখে হাজির হলো ওরা।
এটাই সেমলিকি? ইস্বালার কাছে জানতে চাইল তাইতা।
এর আগ আর এতদূর আসিনি আমি। বলতে পারব না। জবাব দিল সে।
আমাকে নিশ্চিত হতে হবে। এখানকার কোনও বাসিন্দাকে খুঁজে বের করতে হবে। নৌকা দেখামাত্রই তীর বরাবর বসতির বাসিন্দারা পালিয়ে গেছে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত হ্রদের জলে একটা জীর্ণ কুঁদে বানানো ক্যানু দেখতে পেল ওরা। ওটার বয়স্ক লোক দুটো এত ব্যস্ত ছিল যে নৌকাটা একেবারে পিছনে এসে হাজির হওয়ার আগে টেরই পেল না। এবার জাল ফেলে সৈকতের দিকে ঝেড়ে দৌড় লাগাল ওরা। কিন্তু গালিকে ফাঁকি দেওয়ার কোনও সুযোগই ছিল না। শেষে হতাশার সাথে হাল ছেড়ে চুল্লীর আগুনে তুলে দিল নিজেদের।
দুই পাকা দাড়ি বুড়ো ওদের খেয়ে ফেলা হবে না বুঝতে পারলে স্বস্তিতে বকবক শুরু করে দিল। ইদালি ওদের প্রশ্ন করতেই সাথে সাথে নিশ্চিত করল এটাই সেমলিকি আর এই অল্প কদিন আগেও এটা শুকনো খটখটে ছিল। নদীর অলৌকিক পুনরুজ্জীবিত হয়ে ওঠার বর্ণনা দিল ওরা। পাহাড় আর পৃথিবী যখন কেঁপে উঠেছে, নড়েছিল, হ্রদের পানি আকাশের মতো উঁচু ঢেউয়ের ঘায়ে আছাড়িপাছাড়ি করছিল, এমন একটা সময় প্রবল জোয়ার তুলে নেমে এসেছে নদীটা, এখন অনেক বছর আগে যেভাবে বইত সেভাবেই বইছে। ওদের পুঁতি আর তামার বর্শার ফলা উপহার দিল তাইতা, তারপর ছেড়ে দিল দুই বুড়োকে। নিজেদের অবিশ্বাস্য ভাগ্যে দুজনই বিস্মিত।
