দাস আর উটচালকদের কাছে এই কথা বলা যাবে না, ওকে সতর্ক করল তাইতা। এমন কিছু সন্দেহ করলে আমাদের ফেলে চলে যাবে ওরা। ওদের বলবে রাতের বেলায় আমি আর দিমিতার জাদু দিয়ে গায়েব করে দিয়েছি ওটাকে।
*
দিমিতার ফের যাত্রা শুরু করতে পারবেন তাইতা এটা স্থির করার আগে বেশ কয়েকটা দিন কেটে গেল, কিন্তু ওর পালকিবাহী উটের বেতাল পদক্ষেপ ভাঙা পাঁজরের ব্যথা আরও তীব্র করে তুলল। ওকে নিয়মিত লাল শেপেনের কড়া ডোজে ঘুম পাড়িয়ে রাখতে হলো তাইতাকে। একই সময়ে কাফেলার চলার গতিও কমাল ও, ওর আরও ভোগান্তি ও আঘাত এড়াতে প্রতিটি যাত্রার মেয়াদও হ্রাস করল।
সরীসৃপের আক্রমণের সবচেয়ে খারাপ প্রভাব থেকেও দ্রুত সেরে উঠল তাইতা। অচিরে উইন্ডস্মোকের পিঠে অনায়াসে সওয়ার হতে পারল ও। মাঝে মাঝে রাতের বেলায় যাত্রার সময় মেরেনকে দিমিতারের দিকে লক্ষ রাখার দায়িত্ব দিচ্ছে, এই সময় ঘোড়া হাঁকিয়ে কাফেলার সামনে চলে যাচ্ছে ও। আকাশ পরখ করার জন্যে একা হওয়া দরকার ওর। নিশ্চিতভাবে জানে, ওদের গুরুত্বপূর্ণ এই মনস্তাত্ত্বিক ঘটনাটি স্বর্গীয় বস্তুতে নতুন লক্ষণ ও আলামতে প্রতিফিলিত হয়েছে। অচিরেই চারপাশে প্রচুর আলামত দেখতে পেল। উল্কা ও ধূমকেতুর আঁকের রেখে যাওয়া লেজের আগুনের উজ্জ্বল ছায়ায় আকাশ জ্বলছে, গত পাঁচ বছরে যত দেখেছে এক রাতেই তার চেয়ে ঢের বেশি। আলামাতের এমনি প্রাচুর্য বিভ্রান্তিকর, স্ববিরোধী। বোঝার মতো পরিষ্কার কোনও বার্তা দিচ্ছে না, বরং একই সাথে রয়েছে ভীষণ সতর্কবাণী, আশার প্রতিশ্রুতি, ভয়াবহ হুমকী ও আশ্বাসের লক্ষণ।
সরীসৃপের অদৃশ্য হয়ে যাবার পর দশম রাতে পূর্ণিমার চাঁদ উঠল, বিরাট আলোকিত গোলক, উল্কার রেখে যাওয়া আগ্নেয় লেজ ম্লান করে দিল। এমনকি বড় বড় গ্রহগুলোকেও তুচ্ছ আলোক বিন্দুতে পরিণত করল ওটা। মধ্যরাতের বেশ পরে পরিচিত এক বিরান সমতলে চলে এল তাইতা। এখন নীলের ডেল্টার দিকে চলে যাওয়া ঢালের কিনারা থেকে পঞ্চাশ লীগেরও কম দূরে রয়েছে ওরা। শিগগিরই ফিরতে হবে ওকে, তাইতা উইন্ডস্মোকের লাগাম টেনে ধরল। ওটার পিঠ থেকে নেমে পথের পাশে একটা চ্যাপ্টা পাথরের আসনের খোঁজ পেল। নাক দিয়ে খোঁচা মারল ওকে মেয়ারটা, তো অন্যমনস্কভাবেই কোমরে ঝোলানো পোটলার মুখ খুলে ধুরা শ্যস্যের দানা খাওয়াল ওটাকে। পুর্ণ মনোযোগের সাথে আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে ও।
লস্ত্রিসের তারার অবশিষ্ট ক্ষীণ মেঘটাকে আলাদা করা যায় কি যায় না। ওটা চিরকালের মতো হারিয়ে যাবে বুঝতে পেরে বিচ্ছিন্নতার তীক্ষ্ণ খোঁচা অনুভব করল ও। বিষণ্ণভাবে আবার চাঁদের দিকে চোখ ফেরাল। ফসলের মৌসুমের আগমনী বার্তা ঘোষণা করছে ওটা। পুনরুজ্জীবন ও পুনর্জন্মের মৌসুম। কিন্তু নদীতে বান না ডাকলে ডেল্টায় কোনও ফসলই চাষ করা যাবে না।
সহসা সোজা হয়ে বসল তাইতা। কোনও ভয়ঙ্কর নিগূঢ় ঘটনার সময় বরাবরের মতো শিরদাঁড়া বেয়ে নেমে যাওয়া শীতল স্রোত টের পেল। ওর চোখের সামনে চাঁদের রেখা বদলে যেতে শুরু করেছে। প্রথমে ভেবেছিল কোনও কুহক হয়তো, কিন্তু কয়েক মিনিটের ভেতর যেন অন্ধকার কোনও দানব কামড়ে ওটার একটা টুকরো গিলে নিল। চোখ ধাঁধানো দ্রুততায় গোলকের বাকি অংশও একই নিয়তি বরণ করল। তার জায়গায় রইল কেবল একটা গাঢ় গহ্বর। তারার আবির্ভাব ঘটল আবার, কিন্তু শুষে নেওয়া আলোর তুলনায় সেসব ক্ষয়ে যাওয়া, রোগাটে।
মনে হচ্ছে, গোটা প্রকৃতি যেন হতচকিত হয়ে গেছে। হাওয়া পড়ে গেছে। এখন নিথর। চারপাশের পাহাড়সারির রেখা অন্ধকারে মিশে গেছে। এমনকি ধূসর মেয়ারটা পর্যন্ত বিষণ্ণ হয়ে গেছে: কেশর নাচিয়ে আতঙ্কে চিৎকার জুড়ে দিয়েছে। এবার পিছু হটল ওটা, তাইতার হাত থেকে লাগাম ছাড়িয়ে নিয়ে যে পথে এসেছিল। সেপথে দুড়দাড় করে ছুটতে শুরু করল দুদ্দাড়। ওকে যেতে দিল তাইতা।
ঘটমান মহাজাগতিক কোনও ঘটনার উপর প্রার্থনা বা মন্ত্রের প্রভাব নেই জানা থাকলেও চাঁদটাকে বিলুপ্তি থেকে বাঁচাতে জোরে জোরে আহুরা মাযদা ও মিশরের দেবনিচয়কে আহ্বান জানাল তাইতা। এবার আরও পরিষ্কারভাবে দেখতে পেল লস্ত্রিসের তারাটা। এখন একটা ম্লান দাগমাত্র, মাদুলিটাকে চেইনে ঝুলিয়ে তারাটার দিকে বাড়িয়ে ধরল ও। মনোযোগ এক করে অন্তর্চক্ষুর ক্ষমতা ও ইন্দ্রিয়কে স্থাপন করল ওটার উপর।
লস্ত্রিস! মরিয়া কণ্ঠে চিৎকার করল ও। সব সময় আমার হৃদয়ের আলো ছিলে তুমি! তোমার ক্ষমতা কাজে লাগিয়ে দেবতাদের সাথে যোগাযোগ করো, ওরা তোমার কাতারের। আবার চাঁদটাকে জ্বালিয়ে আকাশ আলোকিত করে তোলো।
প্রায় সাথে সাথে চাঁদের প্রান্ত যেখানে অদৃশ্য হয়ে গিয়েছিল ক্ষীণ এক চিলতে আলো দেখা দিল সেখানে। আকারে বেড়ে উঠতে লাগল ওটা। প্রথমে তরবারীর ফলার মতো বাঁকা উজ্জ্বল হয়ে তারপর ক্রমে যুদ্ধের কুড়ালের আকার নিল। মাদুলিটা উঁচু করে ধরে লস্ত্রিসের নাম ধরে ডাকামাত্র সমস্ত ঔজ্জ্বল্য ও আঁক নিয়ে ফিরে এলো চাঁদ। ফের স্বস্তির জোয়ার বয়ে গেল ওর মাঝে। কিন্তু ও জানে, চাঁদ পুনঃস্থাপিত হলেও গ্রহণের মাধ্যমে আবির্ভূত হুমকী রয়ে গেছে; অশুভ সঙ্কেত আর সব মহান শুভলক্ষণ নাকচ করে দিচ্ছে।
