ফারাও নেফার সেতির কথা বলো।
ওর সম্পর্কে যা জানার সবই জানা হয়ে গেছে তোমার, প্রতিবাদ করে তাইতা।
আবার বলল, নাছোড়বান্দা ফেন। ওর সাথে মুখোমুখি দেখা হওয়ার দিনটির অপেক্ষা করে আছি। কী মনে করো, আমি ওর দাদী ছিলাম, বুঝতে পারবে ও?
বুঝলে আমি অবাক হবো। তোমার বয়স তার থেকে অর্ধেকেরও কম; আর এত সুন্দর যে এমনকি সে হয়তো তোমার প্রেমেও পড়ে যেতে পারে, ওর সাথে ঠাট্টা করল তাইতা।
সেটা কোনওদিনই হবে না, সজীব কণ্ঠে জবাব দেয় ফেন। প্রথমত, সেটা হবে অবৈধ, কিন্তু তারচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে, আমি তোমার।
তাই কি ফেন? সত্যিই কি তুমি আমার? বিস্ময়ে বিস্ফারিত চোখজোড়া মেলে ধরল ফেন। ম্যাগাস আর মোহন্ত হলেও অনেক সময় কেমন যেন আনাড়ীর মতো কথা বলো। আমি তোমার, আরেক জীবনে তোমাকে আমি কথা দিয়েছিলাম। নিজেই বলেছ তুমি।
অবৈধ সম্পর্কের কী জানো তুমি? প্রসঙ্গ পাল্টাল তাইতা। কে তোমাকে বলেছে সেটা?
ইম্বালি, জবাব দিল ফেন। তুমি বলোনি এমন সব কথা আমাকে বলেছে ও।
তা এই বিষয়ে কী বলেছে সে?
অবৈধ সম্পর্ক মানে রক্তের সম্পর্কিত মানুষের জিজিমা করা, জবাব দিল ফেন।
ফেনের নিষ্পাপ কণ্ঠ এমনি কর্কশ শব্দ শুনে শ্বাস আটকে ফেলল তাইতা। জিজিমা?সতর্ক কণ্ঠে জানতে চাইল ও। তার মানে কী?
মানেটা ভালো করেই জানো তুমি, তাইতা, দীর্ঘ কষ্ট প্রকাশসূচক একটা ভাব করে বলল ফেন। তুমি আর আমি সারাক্ষণই জিজিমা করছি।
ফের দমবন্ধ হয়ে গেল তাইতার। তবে এবার নিজেকে সামলে রাখল ও। সেটা কীভাবে?
খুব ভালো করে জানো তুমি। আমরা হাত ধরাধরি করে চুমু খেয়েছি। এভাবেই লোকে জিজিমা করে। স্বস্তির সাথে দীর্ঘশ্বাস ফেলল তাইতা। ফেন বুঝতে পারল একথাটা ওকে বলেনি তাইতা।বেশ, ব্যাপারটা তা নয়, তাই না?
মনে হয়, কিংবা অন্তত আংশিক ঠিক না।
এবার ওর সন্দেহ পুরোপুরি চাঙা হয়ে উঠল। সন্ধ্যার বাকি সময়টা অস্বাভাবিক রকম চুপ থাকল সে। তাইতা জানে সহজে ওকে আর ঠেকানো যাবে না।
পরের রাতে উজানে যাত্রার সময় থেকে মনে থাকা একটা জলপ্রপাতের মাথার উপর শিবির করল ওরা। তখন নদীটা প্রায় শুকনো ছিল, কিন্তু এখন ওটার অবস্থান ফোয়ারার উঁচু স্তম্ভে চিহ্নিত হয়ে আছে, বনের মাথা ছাড়িয়ে উঠে যাচ্ছে ওটা। তীরে পৌঁছানো দলটা সীমানা বানাতে কাটাঝোঁপ কাটার সময় তাইতা ও ফেন উইন্ডস্মোক ও ওয়ার্লউইন্ডের পিঠে সওয়ার হয়ে নদীর তীর বরাবর চলে যাওয়া জম্ভজানোয়ারের চলার পথ ধরে এগিয়ে গেল, মোষ ও হাতির পায়ের গভীর ছাপে ক্ষতবিক্ষত হয়ে আছে পথটা, নাদিতে ভরা। তীর ধনুক তৈরি রেখে সাবধানে এগিয়ে চলল ওরা। ট্রেইলের প্রতিটি বাঁকেই কোনও একটা পালের সামনে পড়ে যাবার আশা করছে। তবে কাছের বনে হাতির ডাক ও ডালপালা ভাঙার আওয়াজ কানে এলেও কোনও প্রাণী না দেখেই প্রপাতের মাথায় এলো ওরা। ঘোড়াগুলোকে ঘাস খেতে ছেড়ে দিয়ে পায়ে হেঁটে আগে বাড়ল।
নদীর এই অংশটা যখন সংকীর্ণ পাথুরে গোর্জের গভীরে সামান্য একটা ধারা ছিল, তখনকার কথা ভাবল তাইতা। এখন উঁচু পাড়ের মাঝখান দিয়ে বয়ে যাবার সময় শাদা ফেনা তুলে কালো পাথর থেকে লাফিয়ে উঠে আসছে জল। সামনে গর্জন করছে অদৃশ্য জলপ্রপাত, ওদের মুখে এসে পড়ছে জল-কণা।
ওরা যখন অবশেষে জলপ্রপাতের উপরের চাতালে এসে দাঁড়াল, দেখা গেল এখানে নীল নদ দুই শো কদম থেকে কমে স্রেফ বিশ কদমে পরিণত হয়েছে। নিচে প্রবল স্রোতধারা চমৎকার রংধনুর খিলানের ভেতর দিয়ে শত শত কিউবিট নিচের ফেনা ওঠা গোর্জে ঝাঁপিয়ে পড়ছে।
আমরা মিশরের মোহনায় আসার আগে এটাই শেষ জলপ্রপাত, বলল তাইতা। আমাদের পথের শেষ বাধা। দৃশ্যের চমৎকারিত্বে নিজেকে হারিয়ে ফেলল ও।
ফেনকেও সমান মুগ্ধ মনে হলো। কিন্তু আসলে ভিন্ন ভাবনায় ডুবে আছে ও। ঠোঁটে স্মিত হাসি, চোখে স্বপ্নীল দৃষ্টি নিয়ে তাইতার কাঁধে ভর দিল ও। শেষে যখন কথা বলল, ফ্যাসফ্যাসে শব্দ হলো, কথাগুলো নীলের পানির গর্জনে হারিয়ে গেল না। গতকাল ইম্বালির সাথে আবার লোকের জিজিমা করার ব্যাপারে কথা বলেছি। সবুজ চোখজোড়া ওর দিকে ফেরাল ফেন। আমাকে সব বলেছে ও। আমরা অমন কিছু করব, এটা কোনোদিন ভাবিনি।
ঠিকমতো উত্তর দিতে গিয়ে কিছুটা দিশাহারা বোধ করল তাইতা।এখন ফিরতে হবে, বলল ও। সূর্য ডুবতে বসেছে, অন্ধকার নামার পর আমাদের পথে থাকা উচিত হবে না, যেখানে আশপাশে সিংহ রয়েছে। পরে এনিয়ে কথা বলব আমরা।
*
ঘোড়ার পিঠে জিন চাপিয়ে ফের নদীর কিনারা বারাবর আগে বাড়ল ওরা। সাধারণত ওদের কথোপকথনের ধারা অবিরাম চলতে থাকে, এক কথার সূত্র ধরে আরেক কথা চলে আসে। কিন্তু এই একবারের জন্যে হলেও কারও কিছুই বলার নেই, নীরবে জম্ভজানোয়ারের পথ ধরে এগিয়ে চলল ওরা। যখনই আড়চোখে ওর দিকে তাকাচ্ছে তাইতা, দেখা যাচ্ছে হাসছে ফেন।
ওরা সীমানা প্রাচীরের ভেতর ফেরার পর দেখা গেল মহিলারা রান্নার আগুনের চারপাশে ব্যস্ত হয়ে আছে। পুরুষরা ছোট ছোট দলে ভাগ হয়ে আলাপ করছে আর বিয়র খাচ্ছে, সারাদিনের বৈঠা বাওয়ার কঠোর পরিশ্রম শেষে পরিশ্রান্ত পেশিগুলোকে বিশ্রাম দিচ্ছে। স্যাডল থেকে নামতেই ওদের সাথে যোগ দিতে ছুটে এলো মেরেন। আপনাদের খোঁজে আর একটু হলেই অনুসন্ধানী দল পাঠানোর ব্যবস্থা করতে যাচ্ছিলাম।
