ওদের আসতে দেখে ছুটে এলো লোজন, উত্তেজনায় চিৎকার করছে বাচ্চারা, মহিলারা খুশিতে উলু ধ্বনি করছে। ওদের সাথে যোগ দিতে সবার আগে সামনে ছুটে এলো মেরেন। ফেনকে মাটিতে নামিয়ে দুহাত মেলে স্বাগত জানাল ওকে তাইতা।
ম্যাগাস! আপনার প্রাণাশঙ্কায় ভুগছিলাম আমরা, পঞ্চাশ কদম দূরে থাকতেই চেঁচিয়ে উঠল মেরেন। আপনার উপর আমার আরও আস্থা থাকা উচিত ছিল। জানা উচিত ছিল আপনার জাদুই জিতবে। নীল আবার বইতে শুরু করেছে! তাইতাকে সজোরে আলিঙ্গনে আবদ্ধ করল সে। আপনি নদী আর আমাদের মায়ের দেশকে প্রাণ ফিরিয়ে দিয়েছেন। আরেক হাত বাড়িয়ে ফেনকে আহ্বান করল ও। তোমরা দুজন এমন অলৌকিক কাণ্ড ঘটিয়েছ যার মাত্রাটুকু আমরা কেউই কোনওদিন বুঝতে পারব না। তবে মিশরিয়দের একশো প্রজন্ম এজন্যে তোমাদের ধন্যবাদ জানাবে। উল্লসিত জনতা ঘেরাও করে রেখেছে ওদের, এক রকম কোলে করে পাহাড়ের চূড়ায় নিয়ে যাওয়া হলো ওদের। সেদিন সারারাত চলল নাচ ও হাসি, নাচ ও উল্লাস।
*
আবার দুই তীরের মাঝে নীলের সীমিত হয়ে আসতে বেশ কয়েক সপ্তাহ সময় লাগল। কিন্তু তারপরও রূপালি পেয়ালায় ফুঁসতে লাগল ওটা, তলায় লাল পাথরের চাঙরগুলো পিষে ফেলতে সগর্জন প্লাবন অব্যাহত রইল। শব্দ শুনে মনে হচ্ছিল বুঝি কোনও দানব প্রচণ্ড রাগে দাঁত কিড়মিড় করছে। তাসত্ত্বেও পাহাড়ের ঢাল বেয়ে নৌকাগুলো নিচে বয়ে নিয়ে গিয়ে ফের বানানোর নির্দেশ দিল তাইতা।
আপানি এগুলো উপারে আনতে বাধ্য না করলে ঢেউয়ের ধাক্কায় শেষ হয়ে যেত, বলল মেরেন। তখন আপনার সাথে তর্কে লিপ্ত হয়েছিলাম আমি, সেজন্য এখন কাছে ক্ষমা চাইছি, ব্যাপারটা যেন আপনি বুঝতে পারেন, ম্যাগাস।
উদার হস্তে দেওয়া হলো সব, হেসে বলল তাইতা। তবে আসল সত্যি হলো অনেক বছর ধরে যখনই তোমাকে কোনও ভালো পরামর্শ দিয়েছি, তোমার খোঁচায় পোষ না মানা ঘোড়ার মতোই অক্ষত হয়ে গেছি আমি।
নদী তীরে নৌকাগুলো আবার বানানোর পর পাহাড় চূড়ার কালুলু গ্রাম ছেড়ে নৌকাগুলো যেখানে রাখা হয়েছে তার কাছেই গাছপালায় ছাওয়া একটা আরামদায়ক মালভূমিতে শিবির খাটাতে চলে এলো ওরা। এখানে নীলের এমন একটা স্তরে নেমে যাওয়ার অপেক্ষা করতে লাগল ওরা, যাতে নিরাপদে যাত্রা করা যায়। এখনও শিবিরের মেজাজ উৎসব মূখর। জাররিয়দের আরও হামলা ও ইয়োসের বৈরী ক্ষমতা নিয়ে এখন আর শঙ্কিত হতে হবে না জানা থাকাটা প্রত্যেকের জন্যেই খুশির একটা অবিরাম উৎসে পরিণত হয়েছে। ওদের দীর্ঘ যাত্রার চূড়ান্ত পর্যায় শিগগিরই আবার শুরু হতে যাচ্ছে বুঝতে পেরে আরও জোরাল হয়ে উঠেছে সেটা। প্রাণপ্রিয় মাতৃভূমিতে ফিরে যাবার কথা সারাক্ষণ মনে পড়ছে ওদের।
নালুবালে হ্ৰদবাসী পালের একটা বিশাল মাদী জলহস্তি নীলের সদ্য উন্মুক্ত মুখের কাছে এসে পড়েছিল, স্রোতে আটকা পড়ে গেছে ওটা। এমনকি তার বিপুল শক্তিও জলপ্রপাতে ভেসে যাওয়া থেকে বাঁচাতে পারল না তাকে। ছিঁড়ে টুকরো টুকরো হয়ে গেল তার দেহ, আছড়ে পড়ল পাথরের উপর। মারাত্মক আহত অবস্থায় কোনওমতে নিজেকে তীরে তুলে আনল সে, ঠিক ঢালের নিচে। বর্শায় সজ্জিত পঞ্চাশজন লোক ছুটে গেলা ওটার দিকে, মরণোন্মুখ জানোয়ারটা পালাতে পারল না। ওটাকে মেরে সেখানেই ছাল খসিয়ে মাংস কেটে নিল ওরা।
সেদিন রাতে ওটার পেটের রসাল শাদা চর্বিতে জড়ানো মাংস পঞ্চাশটা ভিন্ন ভিন্ন আগুনের কয়লায় ঝলসে আরও একবার ভোজ-উৎসবে মেতে উঠল সবাই, সারা রাত নাচল ওরা। সবাই গোগ্রাসে খেলেও লবন মাখানো ও ধোঁয়ায় ঝলসানোর মতো প্রচুর মাংস রয়ে গেল। অনেক সপ্তাহ চলবে ওদের। এই সাথে মাগুর মাছে ভরে আছে নদী, জলের প্রবল ধাক্কায় বিভ্রান্ত, দিশাহারা হয়ে থাকায় তীর থেকেই অনায়াসে হারপুনে গেঁথে ফেলা যাচ্ছে ওগুলোকে; কোনও কোনওটা তো পূর্ণ বয়স্ক মানুষের সমান হবে। জাররির সেনাছাউনী থেকে নেওয়া ধুরা শস্যেরও বিরাট একটা অংশ রয়ে গেছে ওদের কাছে। তাই তার একটা অংশ বিয়র বানাতে চোলাই করতে দিতে রাজি হলো তাইতা। নদী বৈঠা বাইতে দেওয়ার মতো স্তরে নেমে আসতে আসতে সবাই ফের যাত্রা শুরু করার মতো যথেষ্ট শক্তিশালী ও উদগ্রীব হয়ে উঠল। এমনকি হিলতোও অনেকটা সেরে উঠেছে, বৈঠার জায়গায় অবস্থান নিতে তৈরি হয়ে গেল ও।
ওরা যখন জাররির উদ্দেশে পথে নেমেছিল তখনকার সেই মরা ধারা থেকে এখন বলদে গেছে নীল। প্রতিটি বাক, প্রতিটি ডুবো চর আর শৈলশ্রেণী বিস্ময়ের কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে; তাই রাতে যাত্রা করার ঝুঁকি নিতে পারল না তাইতা। সন্ধ্যায় তীরে নৌকা ভেড়াচ্ছে ওরা, তারপর কাটা ঝোঁপের মজবুত প্রাচীর বানাচ্ছে। দীর্ঘ দিন সংকীর্ণ ডেকে বন্দি থাকার পর রাত নেমে আসা পর্যন্ত ঘোড়াগুলোকে ঘাস খাওয়ার জন্যে ছেড়ে দেওয়া হয়। শিকারী দল পাঠায় মেরেন যাতে যেমন শিকারই মিলুক না কেন নিয়ে আসতে পারে। অন্ধকার মেলালেই মানুষ আর পশুর দলকে প্রাচীরের নিরাপদ আশ্রয়ে নিয়ে আসা হয়। ঘোড়া আর টাটকা শিকারের গন্ধে আকৃষ্ট হয়ে কাঁটাঝোঁপের দেয়ালের চারপাশে ঘুরে বেড়ায় সিংহ ও চিতার দল।
এত অসংখ্য মানুষ আর পশুকে জায়গা দিতে হচ্ছে বলে প্রাচীর বেশ জনাকীর্ণ হয়ে থাকে। অবশ্য, ওদের প্রতি বরাবরের সম্মান ও ভালোবাসার জন্যে সব সময়ই তাইতা ও ফেনের জন্যে একটা ছোট তবে আলাদা ঘেরাও করা জায়গার ব্যবস্থা থাকে। নিজেদের আশ্রয়ে একা হওয়ার পর প্রায়ই মাতৃভূমির প্রসঙ্গে বাঁক নেয় ওদের কথোপকথন। অন্য জীবনে ফেন উচ্চ রাজ্য ও নিম্নরাজ্যের যৌথ সিংহাসনে আরোহণ করলেও মিশর সম্পর্কে ওর সব জ্ঞান তাইতার কাছেই শেখা। দেশ ও দেশের মানুষের পুঙ্খানুপুঙ্খ বর্ণনা, তাদের ধর্ম, শিল্পকলা, ও রেওয়াজ সম্পর্কে জানতে অধীর হয়ে আছে ও; বিশেষ করে অনেক অনেক দিন আগে জন্ম দেওয়া। সন্তানদের কথা, এখন যারা শাসন করছে সেই উত্তরসুরি সম্পর্কেই বেশি জানতে চায়।
