আস্তে আস্তে সব কিছু আবার নিজেদের রূপ ফিরে পেল: জমিনের কম্পন থেমে গেল, হ্রদের জল স্থির হলো। কেবল গর্জন করে চলল সবুজ, প্রশস্ত নীল; ফোয়ারা ছিটিয়ে ধেয়ে চলল উত্তরে মিশরের দিকে।
নদী আবার জন্ম নিয়েছে, ফিসফিস করে বলল ফেন। ঠিক তোমার মতো, ম্যাগাস। নীল আবার নতুন হয়ে গেছে, তরুণে রূপান্তরিত হয়েছে।
মনে হচ্ছিল যেন এই অনন্য অলৌকিক ঘটনা প্রত্যক্ষ করতে গিয়ে ওরা কখনও ক্লান্ত হবে না। বিস্ময় ও মুগ্ধতা নিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা তাকিয়ে থাকল ওরা। তারপর কী মনে হতেই তাইতার বাহুডোরের বৃত্তের ভেতরে ঘুরে দাঁড়াল ফেন, চোখ ফেরাল পশ্চিমে। এত প্রবলভাবে চমকে উঠল ও, সতর্ক হয়ে উঠল তাইতা। কী ব্যাপার, ফেন?
দেখ! চিৎকার করে উঠল ও, উত্তেজনায় কাঁপছে ওর কণ্ঠস্বর। জাররিয়দের দেশ জ্বলছে! দিগন্তে ভেসে উঠছে ধোঁয়ার বিশাল মেঘ, ধূসর, ভীতিকর, টগবগ করে উঠে যাচ্ছে আকাশের দিকে, সূর্য আড়াল করে ফেলেছে; পৃথিবীটাকে অন্ধকারে ঢেকে দিচ্ছে। কী ওটা, তাইতা? ডাইনীর রাজধানীতে কী ঘটছে?
আন্দাজে কিছু বলা মুশকিল, স্বীকার গেল তাইতা। যুক্তি বা বিশ্বাস দিয়ে ব্যাখ্যা করার চেয়ে অনেক বিশাল।
জাররিয়দের দেশের দিকে আরেকবার চোখ ফিরিয়ে এই বিপর্যয়ের কারণ ও পরিণতি বোঝার চেষ্টা করতে পারি না আমরা?
এখুনি সেটাই করতে হবে, সায় দিল তাইতা। এসো, তৈরি হয়ে নিই। গর্জনশীল নদীর উপরের বিরান পাহাড়ের কোলে বসল ওরা, হাতে হাত ধরল, তারপর নাক্ষত্রিক সমতলে যাত্রা করল। অনেক উপরে উঠে ভেসে চলল শক্তিশালী মেঘ ও তার নিচে বিছিয়ে থাকা জমিনের দিকে।
ওদিকে তাকিয়ে দেখতে পেল জায়গাটা ধ্বংস হয়ে গেছে: দাউদাউ করে জ্বলছে গ্রামগুলো, বিষাক্ত ধোঁয়া আর ঝরে পড়া ছাইয়ে ক্ষেতখামার নষ্ট হয়ে গেছে। লোকজন ওখান থেকে ছুটে পালাচ্ছে, আগুন ধরে গেছে ওদের চুল, কাপড়চোপড়ে। মেয়েদের বিলাপ, শিশুদের কান্নার শব্দ শুনতে পেল ওরা, মরতে চলেছে ওরা। চাঁদের পাহাড়ের দিকে নেমে এলো ওরা, চূড়াগুলো উড়ে গেছে। ছিন্নভিন্ন জ্বালামুখ থেকে গলগল করে বেরিয়ে আসছে ভয়ঙ্কর লাভা। ওগুলোর একটা অলিগার্কদের দুর্গে গিয়ে পড়েছে, আগুন ও ছাইয়ের নিচে চাপা দিয়েছে ওটাকে, যেন কোনওদিনই ওটার অস্তিত্ব ছিল না।
এই ধ্বংসলীলার ভেতর কেবল মেঘ-বাগিচার উপত্যকাই যেন অক্ষত আছে। মনে হচ্ছে; কিন্তু তারপরই ওদের মাথার উপর উঁচু হয়ে থাকা চূড়াটাকে ফুলে কেঁপে উঠতে দেখল ওরা, দোল খেল ওটা। চোখের সামনেই আরেকটা আগ্নেয়গিরি অগ্ন্যুৎপাতে পাহাড়ের অর্ধেকটা উড়ে গেল। আকাশের দিকে ধেয়ে গেল কালো পাথরের পেল্লায় টুকরোগুলো। নিশ্চিহ্ন হয়ে গেল মেঘ-বাগিচা। এককালে যেখানে ওটা দাঁড়িয়েছিল সেখানে মুখ ব্যাদান করে তাকিয়ে আছে বিরাট একটা জ্বালামুখ, লাভার নদী উগড়ে দিচ্ছে।
ডাইনী! তার কী হলো?
ওকে নিয়ে একেবারে চুল্লীর ভেতরে চলে এলো তাইতা। ওদের নাক্ষত্রিক সত্তা ভয়াবহ তাপ থেকে মুক্ত, অথচ স্বাভাবিক দেহ নিমেষেই ছাই হয়ে যেত। আরও নিচে ইয়োসের আস্তানার প্যাসেজ ধরে আগে বাড়ল ওরা, এটার কথা ভালোই মনে আছে তাইতার। ডাইনীর মুটকীটের কাছে চলে এলো ওরা। এরই মধ্যে সবুজ পাথরের দেয়াল চকচক করতে শুরু করেছে; টাইল খসে পড়ছে, প্রবল তাপে ভেঙে চুরচুর হয়ে যাচ্ছে।
খোলস থেকে ধোঁয়ার কুণ্ডলী উঠছে। চকচকে মেঝে কালো হয়ে ফাটতে শুরু করেছে। আস্তে আস্তে পাক খেতে লাগল ওটা, নড়ছে। সহসা ফেটে গিয়ে আরও ভেতরের আঠার মতো হলুদ তরল বের হয়ে এলো, বুদ্বুদ উঠছে তার ভেতর থেকে, যেন উতড়াচ্ছে। অসহনীয় দুর্গন্ধ। এবার খোলসটা বিস্ফোরিত হলো, আগুন ধরে গেল তাতে; পুড়ে পাউডারের মতো ছাইয়ে পরিণত হলো ওটা। বিশ্রী তরলের অবশিষ্টাংশটুকুও উবে গেল, রেখে গেলে কেবল চকচকে সবুজ পাথরের উপর কালো দাগ। বিস্ফোরণে উন্মুক্ত হয়ে গেল গুহার ছাদটাও, জ্বলন্ত লাভা ফাটল দিয়ে সবেগে বের হয়ে ডাইনীর আস্তানা প্লাবিত করতে ধেয়ে গেল।
পিছিয়ে এলো তাইতা ও ফেন, উঠে এলো পাহাড়ের উপর। নিচে ধ্বংসলীলা চূড়ান্ত রূপ নিয়েছে। ছাই ও লাভার নিচে চাপা পড়ে গেছে জাররি। অবশেষে যখন ইথারে ভর দিয়ে আবার আপন দেহে ফিরে এলো ওরা, কিছুক্ষণ যা দেখেছে, যে অভিজ্ঞতা লাভ করেছে সেসব নিয়ে কথাই বলতে পারল না। হাতে হাত ধরেই পরস্পরের দিকে চেয়ে রইল। অবশেষে অশ্রুতে ভলে উঠল ফেনের দুই চোখ, নীরবে কাঁদতে শুরু করল ও।
সব চুকে গেছে, ওকে সান্ত্বনা দিয়ে বলল তাইতা।
ইয়োস মরেছে? জানতে চাইল ফেন। বলো, ওটা বিভ্রান্তি ছিল না। দয়া করে বলল, তাইতা, দিব্য দর্শনে যা দেখেছি সেটা সত্যি।
হ্যাঁ, সত্যি। একমাত্র সম্ভাব্য উপায়েই মারা গেছে সে। যে আগ্নেয়গিরি থেকে উত্থান ঘটেছিল তারই আগুনের শিখায় পুড়ে মরেছে। হামাগুড়ি মেরে ওর কোলে উঠে এলো ফেন। দুহাতে ওকে জড়িয়ে ধরল তাইতা। বিপদ কেটে যাওয়ায় ওর সব শক্তি উবে গেছে। এখন শঙ্কিত শিশুতে পরিণত হয়েছে ও। দিনের বাকি অংশটুকু সবুজ নীলের দিকে তাকিয়ে কাটাল ওরা। তারপর আকাশের পশ্চিমে উঁচু ধোয়া ও ধূলি-মেঘের আড়ালে সূর্য অস্ত যাবার মুহূর্তে উঠে দাঁড়াল তাইতা, ফেনকে কোলে করে পাহাড়ী পথ ধরে গ্রামে নিয়ে এলো।
