তাইতা! আর্তনাদ করে উঠল ফেন। বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে ওরা, ফেন বুঝতে পারছে তাইতার কাছ থেকে পাওয়া ওর শক্তি এখন তেলের কুপির শিখার মতোই ক্রমে ফিকে হয়ে যাচ্ছে। ফাটলের কিনারে ছুটে এলো ও, বুভুক্ষের মতো ওকে টেনে নিতে চাইল ওটা।
তাইতা, আমি পড়ে যাচ্ছি। বাঁচাও! কিনারা থেকে ছুটে সরে যাবার চেষ্টা করল ও, হাতজোড়া ল্যাগব্যাগ করে ঝুলছে, কিনারা থেকে উঠে আসা টানে যন্ত্রণাদায়কভাবে বেঁকে গেছে ওর পিঠ।
ওদের দুজনের মিলিত নাক্ষত্রিক শক্তির পুরো মাত্রা বুঝতে পারেনি তাই। ভীষণ গহ্বরের উপর দিয়ে লাফিয়ে আস্তে ফেনের পাশে এসে নামল ও। ফাটলে পতনের আগেই ধরে ফেলল ওকে, এক ঝটকায় কোলে তুলে ওকে নিয়ে ফুলের আকারের দরজার দিকে দৌড়ে গেল। বুকের সাথে সেঁটে রেখেছে ওকে, ওর কাছ থেকে ইয়োসের কেড়ে নেওয়া শক্তি পূরণ করে দিচ্ছে। অন্দর ছেড়ে দহলিজ ধরে মন্দিরের বাইরের দরজার উদ্দেশ্যে ছুটতে লাগল ও। ওদের সামনে দড়াম করে লুটিয়ে পড়ল ছাদের এক বিরাট কড়িকাঠ। অল্পের জন্যে বেঁচে গেল ওরা। ওটা টপকে আবার দৌড় দিল ও। যেন হ্যারিকেনে আক্রান্ত ছোটখাট জাহাজের ডেকের উপর দিয়ে যাচ্ছে। চারপাশে আরও অসংখ্য গভীর ফাটল দেখা দিচ্ছে। ওগুলো লাফিয়ে যাচ্ছে ও। পায়ের নিচের মাটি ঢেউ খেলছে। ঠিক সামনে বাইরের প্রাচীরের আরেকটা অংশ চুনসুরকির আলগা তূপে পরিণত হলো। কিন্তু তূপের উপর দিয়ে লাফিয়ে খোলা বাতাসে বের হয়ে এলো ও।
কিন্তু উপাদানের আদিম বিশৃঙ্খলা থেকে রেহাই মিলল না। ঢেউ তোেলা মাটির উপর ভারসাম্য বজায় রাখতে টলমল পায়ে অবাক বিস্ময়ে চারপাশে নজর বোলাল তাইতা। হ্রদ অদৃশ্য হয়ে গেছে। যেখানে টলটলে নীল পানি ছিল, এখন সেখানে বিশাল শূন্য বেসিন, তাতে আটকে পড়া মাছের ঝাঁক লেজ দাপাচ্ছে, পাক খাচ্ছে কুমীরের দল, আর সুবিশাল জলহস্তি কাদায় পা রাখার মতো জায়গা খোঁজার প্রয়াস পাচ্ছে। লাল পাথরের বাঁধ নগ্নভাবে উন্মুক্ত হয়ে গেছে। কল্পনাকেও হার মানায় ওটার আকার।
সহসা উথালপাতাল অবস্থার অবসান ঘটল। তার জায়গায় দেখা গেল স্থিরতা। যেন গোটা সৃষ্টি থমকে গেছে। কোনও শব্দ বা নড়াচড়া নেই। সাবধানে ফেনকে মাটিতে নামিয়ে দিল তাইতা, কিন্তু শূন্য হ্রদের দিকে তাকিয়ে ওকে আঁকড়ে থাকল ও। দুনিয়াটার হলো কী? ফ্যাকাশে শুকনো ঠোঁটের ফাঁক দিয়ে শ্বাস ফেলল ও।
ওটা ছিল প্রলয়ঙ্করী ভূমিকম্প।
ব্যাপারটা চুকে যাওয়ায় হাথোর আর আইসিসকে ধন্যবাদ।
চুকে যায়নি। ওগুলো ছিল স্রেফ প্রথম দফার ধাক্কা। এখন পূর্ণ শক্তির বিস্ফোরণ ঘটার আগের নীরবতা বিরাজ করছে।
হ্রদের পানির কী হলো?
পৃথিবীর ঢাকনার নড়াচড়ায় শুষে নিয়েছে, বলল তাইতা, তারপর একটা হাত ওঠাল। শোনো! জোরাল হওয়ার মতো প্রবল একটা শব্দ শোনা যাচ্ছে। পানি ফিরে আসছে! শূন্য বেসিনের উপর দিয়ে ইশারা করল ও।
দিগন্তে মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে পানির নীল পাহাড়, তাতে ক্রিমের মতো ফেনা, জমিনের উপর দিয়ে বিপুল অটল শক্তিতে ছুটে আসছে। একের পর বাইরের দ্বীপগুলো গিলে নিল ওটা, এগিয়ে আসতে লাগল, তীরের দিকে এগোনোর সময় আকাশের দিকে উঠে যাচ্ছে। এখনও বেশ কয়েক লীগ দূরে থাকলেও ইতিমধ্যে ওটার চূড়া ওরা যে ব্লফের উপর দাঁড়িয়ে আছে সেটার উচ্চতা ছাড়িয়ে গেছে যেন।
আমাদের ভাসিয়ে নিয়ে যাবে ওটা! ডুবে মরব! পালাতে হবে!
যাবার মতো কোনও জায়গা নেই, বলল তাইতা। আমার পাশে শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে থাকো।
ওদের চারপাশে একটা প্রতিরক্ষা প্রাচীর গড়ে তুলছে তাইতা, টের পেল ফেন, সাথে সাথে ওর নিজস্ব মানসিক শক্তিও যোগ করল ওর সাথে।
আরেকটা প্রবল ঝাঁকুনি কাঁপিয়ে দিল জমিনকে, এত জোরে যে হাঁটু ভেঙে বসে পড়ল ওরা। কিন্তু পরস্পরকে আঁকড়ে ধরে আগুয়ান ঢেউয়ের দিকে তাকিয়ে রইল। আকাশের সব বজ্র যেন একসাথে ডেকে উঠেছে, এমন প্রবল আওয়াজ শোনা যাচ্ছে, প্রচণ্ড আওয়াজে কানে তালা লেগে গেল ওদের।
লাল পাথরের বাঁধটা গোড়া থেকে চূড়া পর্যন্ত দুভাগ হয়ে গেল। গভীর সব চিড়ে গোটা শরীর চৌচির হয়ে গেছে ওটার। ওটার মাথা ছাড়িয়ে গেল দানবীয় ঢেউ, পরক্ষণেই ফেনা আর লাফাতে থাকা ঢেউ নিয়ে নেমে এলো প্রবল বেগে। বিশাল পাথরের পিয়ার তলিয়ে গেল ওটার নিচে। তারপর একটার উপর আরেকটা পড়তে শুরু করল লাল পাথরের টুকরোগুলো, পানির প্রবল স্রোত জলোচ্ছ্বাসের সাথে ভাসিয়ে নিয়ে চলল নীলের শূন্য তলদেশের দিকে। এমনভাবে ভেসে গেল যেন নুড়ি পাথরের চেয়ে বেশি কিছু নয়। ফাটল দিয়ে বজ্রের আওয়াজে সবুজ ঢেউ তুলে হ্রদে এসে পড়তে লাগল। এত বিপুল পানি ধারণ করার মতো গভীরতা বা প্রশস্ততার কিছুই নেই নদীর তলদেশের, ফলে পানির ধারা তীর ছাপিয়ে দুপাশের সবচেয়ে উঁচু গাছগুলোও ছাড়িয়ে গেল। শেকড়সহ উপড়ে এসে ঢেউয়ের চাপে লুটিয়ে পড়ল, কাঠের টুকরোর মতো ভেসে চলল স্রোতের টানে। উত্তাল সাগরের মাথার উপরে ঘন মেঘের মতো পানির ছিটা ধেয়ে গেল আকাশের দিকে। রোদে লেগে নদীর উপরে বাঁকা হয়ে অসাধারণ রঙধনু হয়ে উঠল।
জলোচ্ছ্বাসের চূড়াটা ব্লাফের উপর দিয়ে ভাঙা মন্দিরের সামনে জড়োসড়া হয়ে বসা তাইতাদের দিকে ধেয়ে এলো। যেন ওদেরও গ্রাস করে নেবে, ভাসিয়ে নিয়ে যাবে প্রবল স্রোতের টানে, কিন্তু ওদের কাছে আসার আগেই শক্তি ফুরিয়ে গেল ওটার। প্রবল শক্তির অবশিষ্টাংশ মন্দিরের ভাঙা দেয়ালের চারপাশে পাক খেতে লাগল, ওদের হাঁটু পর্যন্ত উঠে এসে অবশেষে লুটিয়ে পড়ল। পরস্পরের বাহু আঁকড়ে ধরে নিজেদের অটল রাখল ওরা। পানির টান আকর্ষণ করলেও হ্রদে ভেসে যাওয়ার হাত থেকে নিজেদের বাঁচাতে পারল।
