অমন বিশাল জিনিসকে নাড়ানোর মতো মানুষ বা প্রকৃতির অধীন কোনও শক্তি কি আছে? স্বগত উচ্চারণ করল ফেন।
মিথ্যার শক্তিতে ওটার উত্থান ঘটেছে। সত্যির শক্তি দিয়ে ধ্বংস করা যেতেই পারে, ওর প্রশ্নের জবাবে বলল তাইতা, তারপর একসাথে ইয়োসের মন্দিরের দিকে চোখ ফেরাল।
তুমি তৈরি? জিজ্ঞেস করল ও, মাথা দোলাল ফেন। তাহলে ইয়োসকে মোকাবিলা করতে তার মন্দিরে যেতে হবে আমাদের।
ওখানে ঢুকলে কী ঘটবে, ম্যাগাস?
সেটা আমি জানি না। সবচেয়ে খারাপটাই আশা করতে হবে, তৈরি থাকতে হবে তার জন্যে। আরও একবার হ্রদের উপরিতলের দিকে তাকাতে একটু সময় নিল তাইতা। মসৃণ, চকচকে। ওটার অনেক উপরে ভাসছে ছোট মেঘ খণ্ড। এখনও বেড়ালের থাবার মতো। হাতে হাত রেখে মন্দিরের অভিশপ্ত ছাদের দিকে চলে যাওয়া পথে পা রাখল ওরা। অমনি ক্ষীণ হওয়া গুমোট বাতাসকে দোল দিল। শীতল ছোঁয়া লাগল ওদের গালে। লাশের আঙুলের মতো ঠাণ্ডা হ্রদের উপর দিয়ে বয়ে গেল হাওয়াটা, চকচকে তলকে আঁচড়ে দিল, তারপরই হারিয়ে গেল। উপরে উঠতে লাগল ওরা। চূড়ার আধাআধি দূরত্বে যাবার আগেই ফের এলো হাওয়াটা। মৃদু শিসের শব্দ তুলে ছোট মেঘটাকে দিগন্তে ছড়িয়ে দিল, হ্রদের বুকে গাঢ় নীল খাদের সৃষ্টি করল।
তীক্ষ্ণ হয়ে উঠল বাতাসের শব্দ। তারপর ধেয়ে এলো ওদের দিকে। ওদের পোশাক ও তাইতার দাড়িতে টান লাগার সময় আর্তচিৎকার করতে লাগল। হাওয়ার ঝাপ্টায় যুঝতে লাগল ওরা, সমর্থনের জন্যে একে অপরকে ধরে রেখেছে। সহসা শাদা ঢেউ হয়ে নাচতে শুরু করেছে হ্রদের জল। দোল খাচ্ছে তীরের গাছপালা, চাবুকের মতো শপাং শপাং শব্দ তুলছে ডালপালা। অনেক কষ্টে উঠে চলল ওরা, অবশেষে মন্দিরের মূল দরজার সামনে এসে দাঁড়াল। দরজাটা হাঁ করে খোলা, একটা কজার উপর দোল খাচ্ছে, অন্য পাল্লাটা বাড়ি খাচ্ছে, দুলছে। আচমকা গর্জন তোলা হাওয়া দুটো পাল্লাই এমনভাবে কামড়ে ধরে সজোরে আটকে দিল যে পাশের সীমানা ফেটে কুকড়ে গেল।
গলার কাছে হাত তুলে সোনার চেইনে ঝুলন্ত লক্ট্রিসের মাদুলিটা মুঠি করে ধরল তাইতা। তাইতার তালিসমানের সোনার টুকরো মুঠি করে ধরল ফেন। তারপর মুক্ত হাতে থলেয় হাত দিয়ে ইয়োসের চুলের পুরু গোছাটা বের করে উঁচু করে ধরল তাইতা। কেঁপে উঠল ওদের পায়ের নিচের জমিন, এমন বিপুল বিক্ষোভে যে বন্ধ দরজার একটা পাল্লা কজা থেকে খুলে ওদের পায়ের কাছে উড়ে এসে পড়ল। ওটার উপর দিয়ে উক্ত পথে মন্দিরের বৃত্তাকার দহলিজে ঢুকে পড়ল ওরা। এখানে বাতাস ভারি, অশুভের মতো ভয়ঙ্কর। ঠেলে এগোনো কষ্টকর হয়ে দাঁড়াল, যেন গভীর জলার কাঁদা ভেঙে আগে বাড়ছে। ফেনকে স্থির করতে ওর কবাহুতে হাত রাখল তাইতা। পথ দেখিয়ে প্যাসেজওয়ে ধরে মন্দিরের উল্টোদিকে নিয়ে এলো ওকে। অবশেষে ফুল আকৃতির দরজার সামনে এসে দাঁড়াল, ওটার চৌকাঠ পুলিশ করা হাতির দাঁত, মালাকাইট ও বাঘের চোখের নকশা করা। কুমীরের চামড়ার দরজাটা বন্ধ। ইয়োসের চুলের রশিটা ওটার মাঝখানে ছোঁয়াল তাইতা। ধীরে ধীরে খুলে গেল পাল্লাটা, কাঁচক্যাচ করে উঠল কজাগুলো।
ভেতরের চাকচিক্য এতটুকু কমেনি, চকচক করছে মাৰ্বল আর আধা মূল্যবান পাথরের বিরাট পেন্টাগ্রামের প্রতীক। কিন্তু অপ্রতিরোধ্যভাবে মাঝখানের হাতির দাঁতের বর্মের দিকে চলে গেল ওদের চোখ। ছাদের ফোকর দিয়ে চুঁইয়ে আসা সূর্যরশ্মি ধীরে কিন্তু নির্ভুলভাবে পেন্টাগ্রামের কেন্দ্রের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। শিগগিরই দুপুর হয়ে যাবে।
মন্দিরের অন্য দরজাগুলোর গায়ে গুমড়ে মরছে বাতাস, ছাদের আস্তরণ আর কাঠে কাঁপন ধরিয়ে দিচ্ছে। স্থির দাঁড়িয়ে আলোর স্থান বদল দেখতে লাগল ওরা। হাতির দাঁতের বৃত্তে প্রবেশ করলে সর্বোচ্চ বিন্দুতে পৌঁছাবে মিথ্যার শক্তি।
ছাদের ফোকর দিয়ে বরফ-শীতল একটা দমকা হাওয়া বয়ে গেল। গোখরা সাপের মতো হিসহিসিয়ে উঠল, চারপাশে বাদুর ও শকুনের ডানা ঝাপ্টানোর মতো শব্দ হলো। সূর্যরশ্মি হাতির দাঁতের বৃত্তে প্রবেশ করল। চোখে ধাঁধানো আলো গোটা অন্দর ভরে ফেলল, কিন্তু তাতে কুকড়ে গেল না ওরা বা চোখ আড়াল করল না। হাতীর দাঁতের ঠিক কেন্দ্রে ফুটে ওঠা ইয়োসের হিংস্র আত্মার প্রতাঁকের দিকে তাকিয়ে রইল। ডাইনীর কটু গন্ধে চারদিকের পরিবেশ ভরে ওঠার সাথে সাথে সামনে পা বাড়াল তাইতা, চুলের গোছা উঁচু করে ধরল।
তাশকালোন! চিৎকার করে বলে উঠলও। চুলের গোছাটা ঢুকিয়ে দিল আইভরি বৃত্তে। আসকারতেও! সিলোনদেলা! ইয়োসের শক্তির কথাগুলো আবার তারই উপর চালিয়ে দিচ্ছে। সহসা বাতাস পড়ে গেল, সারা মন্দিরে নেমে এলো অজ্ঞাত ধরনের নীরবতা।
তাইতার পাশে এসে দাঁড়াল ফেন, টিউনিকের হেম উঁচু করে দুই পায়ের মাঝখান থেকে লিনেনের প্যাডটা খুলে নিয়ে ইয়োসের চুলের গোছার উপর দিয়ে ছুঁড়ে দিল আইভরির বৃত্তে। তাশকালোন! আসকাবতেও! সিলোনদেলা! মিষ্টি পরিষ্কার কণ্ঠে পুনরাবৃত্তি করল ও। মন্দিরের ভিত্তিমূল কেঁপে উঠল, পৃথিবীর গভীর থেকে গুরুগুরু গর্জন ভেসে এলো। বাইরের দিকে খসে পড়ল সামনের দেয়ালের একটা অংশ। তারপর চুনসুরকির গুঁড়ো ছড়িয়ে ধসে পড়ল। ওদের পেছনে ছাদের একটা কড়িকাঠ ফেটে বাইরের দহলিজে গিয়ে পড়ল। সাথে নিয়ে গেল ছাদের খড়ের কিছুটা অংশ। আইভরি বৃত্তের ভেতর দিয়ে চলে গেল ওটা। ওদের মাঝখানের পাকা অংশের উপর দিয়ে ছুটে গিয়ে বিচ্ছিন্ন করে দিল ওদের। গহ্বরের কোনও তল নেই। যেন পৃথিবীর একেবারে পেটের ভেতর চলে গেছে।
