শেষবার যেখানে দেখে গিয়েছিল সেখানেই আছে ইয়োসের বিশাল মুটকীট, কিন্তু এখন প্রতিরক্ষা খোলস সম্পূর্ণ গঠিত হয়েছে; সবুজ, চকচকে, এক ধরনের প্রখর ঝিলিক দিচ্ছে। তাইতার উদ্দেশ্য পূরণ হয়েছে: ইয়োসের নানা রূপ দেখাতে ফেনকে এখানে নিয়ে এসেছে ও, কেবল ছায়াময় প্রকাশ নয়। এখন সময় হওয়ার পর ওরা ওদের সমস্ত শক্তি এক করে তার উপর প্রয়োগ করতে পারবে।
মেঘ-বাগিচা থেকে সরে এলো ওরা; পাহাড়ের উপর দিয়ে বন ও হ্রদ পেরিয়ে আবার ভৌত দেহে প্রবেশ করল। এখনও ওর হাত ধরে রেখেছে তাইতা। সে আবার সজীব হয়ে উঠতেই অন্তর্চক্ষু দিয়ে ওর দিকে তাকাল তাইতা। চুল্লী থেকে বেরুনো গলিত ধাতুর মতো জ্বলছে ওর আভা, ভীতি আর ক্রোধে তপ্ত হয়ে আছে।
ওই জিনিসটা! ওকে আঁকড়ে ধরল ফেন। ওহ, তাইতা, ভয়ঙ্কর, আমার কল্পনারও বাইরে। মনে হচ্ছে ওর খোলসের ভেতর মহাবিশ্বের সমস্ত অমঙ্গল আর বৈরিতা আশ্রয় নিয়েছে। ছাইয়ের মতো ফ্যাকাশে ওর চোখমুখ, ত্বক বরফ-শীতল।
শত্রুকে দেখেছ তুমি। এখন নিজেকে স্থির করতে হবে তোমাকে, প্রিয় আমার, বলল তাইতা। তোমার সমস্ত শক্তি ও সাহস এক করতে হবে। শক্ত করে ওকে ধরে রাখল তাইতা। আমার সাথে তোমাকে চাই আমি। তোমাকে ছাড়া ওর সাথে টিকে উঠতে পারব না।
প্রতিজ্ঞায় কঠিন হয়ে উঠল ফেনের চেহারা। তোমাকে আমি হতাশ করব না, তাইতা।
তেমন কিছু তুমি করবে বলে ভাবিনি কখনও। পরবর্তী কয়েক দিন ইয়োসকে দেখার পর ফেনের টলে যাওয়া আধ্যাত্মিক ক্ষমতা আবার চাঙা করে তুলতে সমস্ত নিগূঢ় শক্তি কাজে লাগাল তাই।
আগামী কাল পূর্ণিমার চাঁদ উঠবে, চক্রের সবচেয়ে শুভ পর্যায়। আমরা তৈরি, আর সময়ও হয়েছে। কিন্তু সকালে ফেনের গোঙানি আর কান্নার শব্দে জেগে উঠল তাইতা। ওর মুখে হাত বুলিয়ে ফিসফিস করে কথা বলল। ওঠো, প্রিয়া আমার। এটা স্বপ্ন মাত্র। তোমার পাশে আছি আমি।
আমাকে ধরে রাখো, তাইতা। অনেক ভয়ের স্বপ্ন দেখছিলাম। দেখলাম জাদুর শক্তি দিয়ে আমাকে আক্রমণ করেছে ইয়োস। আমার পেটে ড্যাগার বসিয়ে দিয়েছে। ফলাটা উত্তপ্ত, চকচক করছিল। আবার গুঙিয়ে উঠল সে। ওহ, এখনও ব্যথা টের পাচ্ছি। স্বপ্ন ছিল না ওটা। সত্যি। আমি আহত হয়েছি, ব্যথাটা খুবই মারাত্মক।
সতর্কতায় টানটান হয়ে উঠল তাইতার মন। তোমার পেটটা দেখি। ওকে আস্তে করে শুইয়ে হাঁটু পর্যন্ত তুলে দিল কারোসটা, ফর্শা চ্যাপ্টা পেটে হাত বোলাল।
কেবল ব্যথা না, তাইতা, ফিসফিস করে বলল ফেন। তার তৈরি করা ক্ষত থেকে রক্তপাত হচ্ছে।
রক্ত ঝরছে? ক্ষতটা কোথায়?
এখানে! দুই পায়ের মাঝখানে! এতদিন আর এমন হয়েছে কখনও?
কোনওদিন না, জবার দিল ফেন। এই প্রথম।
ওহ, আমার প্রিয়তমা। আস্তে করে ওকে কোলে তুলে নিল তাইতা। তুমি যা ভাবছ, ব্যাপারটা মোটেই তা নয়। ইয়োসের কাছ থেকে আসছে না ওটা। এটা সত্যির দেবতার উপহার, আশীর্বাদ। ইদালি কেন তোমাকে এর কথা বলেনি বুঝলাম না। পরিপূর্ণ নারী হয়ে উঠেছ তুমি।
বুঝতে পারছি না, তাইতা, এখনও ভয় পাচ্ছে ও।
এটা তোমার চাঁদ-রক্ত, তোমার নারীত্বের গর্বিত প্রতীক।
তাইতা বুঝতে পারল যাত্রার পরিশ্রম, ওর ভোগ করা দুর্ভোগ ও কষ্ট নিশ্চিতভাবে স্বাভাবিক বৃদ্ধি বিলম্বিত করেছে।
কিন্তু ব্যথা কেন?
ব্যথাই নারীদের ভাগ্য। ব্যথায় তার জন্ম, ব্যথার ভেতরই আবার নতুন জন্ম। দেয় সে। চিরকাল তাই হয়ে আসছে।
এখন কেন? ঠিক যখন আমাকে তোমার প্রয়োজন তখনই কেন আমাকে এভাবে পড়ে যেতে হলো? বিলাপ করে উঠল ফেন।
ফেন, নারীত্বের জন্যে উল্লাস করতে হবে তোমাকে। দেবতারা তোমাকে সশস্ত্র করে দিয়েছেন। কুমারীর প্রথম চাঁদ-রক্ত দুনিয়ার সবচেয়ে শক্তিশালী মাদুলি। আজকের দিনে তুমি যখন পুরোপুরি প্রাপ্তবয়স্কা হয়ে উঠেছ, ডাইনীর বা মিথ্যার সমস্ত শক্তি এখন আর তোমার সাথে পেরে উঠবে না। ওকে লিনেনের প্যাড লাগানো শিখিয়ে দিল ও। মাদুর থেকে উঠে দাঁড়াল ওরা। আবার শরীর ধুয়ে হ্রদের খানিকটা পানি খেল, তবে কিছু খেল না।
খালি পেটে সিংহ আর সিংহী অনেক ভালো শিকার করতে পারে, বলল তাইতা। আশ্রয় ছেড়ে এলো ওরা, শিবিরের ভেতর হাঁটতে লাগল। উদ্বেগে ভার নীরবতায় ওদের পাশ কাটাতে দেখল লোকেরা। ওদের হাবভাব, আচরণে এমন কিছু ছিল যাতে ওরা বুঝে গেল ভীতিকর একাট কিছু এগিয়ে আসছে।
কেবল মেরেন এগিয়ে এসে ওদের সাথে যোগ দিল। আমার সাহায্য লাগবে, ম্যাগাস?
সৎ মেরেন, তুমি সব সময়ই বিশ্বস্ত, কিন্তু আমরা যেখানে যাচ্ছি সেখানে তুমি যেতে পারবে না।
ওর সামনে এক হাঁটু ভাঁজ করে বসল মেরেন। তাহলে আপনার আশীর্বাদ দিন আমাকে, আপনার কাছে মিনতি করছি।
মেরেনের মাথার উপর একটা হাত রাখল তাইতা। তার সম্পূর্ণই পেয়েছ তুমি, বলল ও। তারপর ফেন আর ও শিবির থেকে বেরিয়ে পাহাড়ের ঢাল বেয়ে হ্রদের দিকে এগিয়ে গেল। বাতাস, স্থির, গুমোট, চারপাশ ঝিম মেরে আছে। জানোয়ারের ডাক নেই, পাখিরা ডাকছে না। আকাশ উজ্জ্বল, যন্ত্রণাকর নীল, কেবল হ্রদের উপর ভেসে বেড়াচ্ছে ছোট এক টুকরো মেঘ, অনেক দূরে। তাই তাকিয়ে থাকতে থাকতেই আস্তে আস্তে বদলে গিয়ে বেড়ালের থাবার চেহারা নিল ওটা।
এমনকি মুটকীটে থেকেও আমরা তার পক্ষে কতটা হুমকি টেরে পেয়ে আমাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিচ্ছে ডাইনী, মৃদু কণ্ঠে ফেনকে বলল ও। ওর উপর হেলে পড়ল ফেন। হাঁটতে হাঁটতে ব্লাফের উচ্চতার শেষ মাথায় চলে এলো ওরা। শিশু নীলের মুখ রুদ্ধ করে রাখা বিশাল বাঁধ লাল পাথরের দিকে চোখ ফেরাল।
