ফেন ওকে নিয়ে খেলা করার সময় ওরও একইভাবে ভালোবাসা প্রকাশ করতে ইচ্ছে করে, কিন্তু সহজাত প্রবৃত্তি ওকে সতর্ক করে বলে মেয়েটা নারীত্বের দোরগোড়ায় এসে দাঁড়ালেও চৌকাঠ পেরুনোর মতো অবস্থায় পৌঁছায়নি এখনও।
আমাদের সামনে সারা জীবন, সম্ভবত অনেকগুলো জীবন পড়ে আছে, নিজেকে সান্ত্বনা দেয় ও, তারপর জোর করে ঘুমিয়ে পড়ে।
*
হারানো মাতৃভূমির উদ্দেশে এগিয়ে চলেছে বৈঠার বেঞ্চির লোকগুলো, তাই প্রাণের টানে বৈঠা বাইছে ওরা। পরিচিত হ্রদের তীর দ্রুত পেছনে পড়ে যাচ্ছে, নৌবহরের পেছনে চলে যাচ্ছে লীগের পর লীগ পথ। অবশেষে এক সময় নীল হ্রদের বুকে মাথা তুলে দাঁড়াল তামাফুপা পাহাড়সারি। নৌকার রেইলিংয়ের কাছে ভীড় করে দাঁড়াল ওরা, বিস্ময়ভরা নীরবতায় তাকিয়ে রইল সেদিকে। এই জায়গাটা ছিল অমঙ্গলে ভরা, সবচেয়ে সাহসী লোকটিরও এখানে এলে বুকে কাঁপন ধরে যেত। উপসাগরের মূল ভূমি পাশ কাটিয়ে নীলের মুখে বাঁধ হিসাবে দাঁড়ানো লাল পাথর দেখে তাইতার কাছে এগিয়ে এলো ফেন, স্বস্তির আশায় ওর হাত ধরল। এখনও মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে ওগুলো। আশা করেছিলাম মালকিনের সাথে ওগুলোও শেষ হয়ে গেছে।
জবার দিল না তাইতা। হালে দাঁড়ানো মেরেনকে ডাকল তার বদলে। উপসাগরের মাথা দিকে ঘোরাও।
শাদা সৈকতে শিবির করল ওরা। সে রাতে কোনও উৎসব হলো না। সবার মেজাজই খারাপ, অনিশ্চিত। যাত্রা অব্যাহত রাখতে নীলের অস্তিত্ব বা ওদের মিশরের উদ্দেশে নিয়ে যাওয়ার মতো যথেষ্ট ঘোড়াও নেই।
সকালে সব নৌকা তীরে তুলে ধ্বংস করার নির্দেশ দিল তাইতা। এটা আশা করেনি কেউ। এমনকি মেরেন পর্যন্ত বাঁকা চোখে তাকাল ওর দিকে। কিন্তু ওর নির্দেশ নিয়ে প্রশ্ন তোলার কথা ভাবল না কেউ। মালসামান নামানো হলে ফোকরের ডাওয়েল পিন খুলে ফেলা হলো, বিভিন্ন অংশে ভাগ করা হলো খোলস।
সবকিছু, সবাইকে-নৌকা, মানুষ, মালপত্র-গ্রামে নিয়ে যাও, যেখানে মূলভূমির চূড়ায় খোঁড়া শামান কালুলু থাকত।
কিন্তু সেতো নদীর অনেক উপরে, বিভ্রান্ত মেরেন মনে করিয়ে দিল ওকে।
ওর দিকে হেঁয়ালি মাখা চোখে তাকাল তাইতা, নড়েচড়ে দাঁড়াল মেরেন। মহাদের অনেক উপরেও ওটা, অবশেষে বলল ও।
ব্যাপারটা কি গুরুত্বপূর্ণ, ম্যাগাস?
হতে পারে।
তাহলে এখুনি ব্যবস্থা নিচ্ছি।
সবকিছু পাহাড়ে তুলতে টানা ছয়দিনের হাড়ভাঙা খাটুনির প্রয়োজন হলো। অবশেষে কালুলুর গ্রামের কালো ধ্বংসাবশেষের মাঝখানে খোলের বিভিন্ন অংশ সাজিয়ে রাখার পর ওদের বিশ্রাম নিতে দিল তাইতা। নীলের শুষ্ক মুখ ও সেটার মুখে দাঁড়ানো অপ্রতিরোধ্য বাঁধের দিকে পাহাড়ের ঢালে আশ্রয় নির্বাচন করল তাইতা ও ফেন। ভোরে শুকনো আগাছার ছামিয়ানার নিচে বসে হ্রদের দিকে তাকিয়ে থাকে ওরা; নীল পানির বিশাল বিস্তার মাথার উপরের আকাশে ভেসে বেড়ানো মেঘের দলের প্রতিবিম্ব সৃষ্টি করে। বাঁধের বাধাহীন দৃশ্য এবং ওটার উপরের ব্লাফে ইয়োসের ক্ষুদে মন্দিরও দেখতে পায়।
তৃতীয় দিন সকালে তাইতা বলল, ফেন, আমরা এখন তৈরি। আমরা আমাদের শক্তি সংহত করেছি। এখন পূর্ণিমার অপেক্ষা করতে হবে।
এখন থেকে আর চারদিন, বলল ফেন।
তার আগে ডাইনীর বিরুদ্ধে আর একটা মাত্র হামলা চালাতে পারব আমরা।
তুমি যেকোনও সিদ্ধান্তের জন্যে আমি তৈরি, ম্যাগাস।
চারপাশে নাক্ষত্রিক প্রাচীর তৈরি করেছে ইয়োস।
সেজন্যেই ওর আস্তানায় থাকতে তোমার সাথে যোগাযোগ করতে পারিনি।
শেষবারের মতো তার প্রতিরক্ষা পরখ করতে চাই আমি। কাজটা বিপজ্জনক হবে, তবে আমাকে ও তোমাকে অবশ্যই শক্তি একত্রিত করে বর্ম ভেদ করে তার শক্তঘাঁটি দখল করার চেষ্টা চালাতে হবে। হ্রদের কিনারে নেমে এলো ওরা। পরনের পোশাক ধুয়ে তারপর টলটলে জলে ম্লান করল। আচরিক ম্লান এটা: নোংরা ও বিশ্রী বস্তুতে অশুভ বিস্তার লাভ করে। সূর্যের আলোয় ওদের নগ্ন শরীর শুকোনের সময় ফেনের চুল আঁচড়ে বেণী বেঁধে দিল তাইতা। তাইতার সদ্য গজানো ঝলমলে দাড়ির যত্ন নিল ফেন। কাঁচা ডালে দাঁত মেজে সুবাসিত গাছের ডাল কুড়িয়ে পাহাড়ের ঢালে শিবিরে নিয়ে এলো। আশ্রয়ে পৌঁছার পর ওদের আগুনে গনগনে কয়লা বানালো ফেন, অগ্নিশিখায় পাতা ছিটিয়ে দিল তাইতা। তারপর পায়ের উপর পা তুলে হাতে হাত ধরে ধ্যানের ভঙ্গিতে বসল, পরিষ্কার ও সজীবকারী ধোয়া বুকে টেনে নিতে লাগল শ্বাসের সাথে।
এবারই প্রথমবারের মতো যৌথ নাক্ষত্রিক আক্রমণের প্রয়াস পেয়েছে ওরা, কিন্তু নাক্ষত্রিক বলয়ে ওদের এই পরিবর্তন ছিল খুবই মসৃণ। আত্মায় আত্মা মিলিয়ে হ্রদের অনেক উপরে উঠে এলো ওরা, বনের উপর দিয়ে ভেসে চলল পুব দিকে। জাররিয়দের এলাকা ঘন মেঘের নিচে ঢাকা পড়ে থাকতে দেখল, কেবল চাঁদের পাহাড়ের চূড়াগুলোই ওগুলো ছুঁড়ে বের হয়ে এসেছে, ওগুলোর চূড়ার বরফ অপরূপ আভায় ঝিলিক মারছে। ওগুলোর বরফের নীড়ে বাসা বেঁধেছে মেঘ-বাগিচার গোপন জ্বালামুখ। ডাইনীর ঘাঁটির দিকে নামতে শুরু করল ওরা, কিন্তু কাছাকাছি আসতেই তাইতার উত্থানও কষ্টকর হয়ে দাঁড়াল, যেন বা কোনও মলাধারের ভেতর দিয়ে সাঁতার কাটছে। ওদের এগোনোর পথে বাধা হয়ে দাঁড়াল ওটার ওজন ও ঘনত্ব। মিলিত শক্তিতে ওটার দুর্বল করে তোলা প্রভাবের বিরুদ্ধে আগে বাড়তে লাগল ওরা। অবশেষে অনেক আত্মিক ক্ষয়ের পর বাধা ডিঙিয়ে ডাইনীর আস্তানার সবুজ চেম্বারে ঢুকল ওরা।
