প্রশস্ত কিতানগালে নদীর স্রোত ধরার জন্যে গলুই ঘুরিয়ে নিল মেরেন, ওদের টেনে নিয়ে চলল ওটা, প্রথম বাঁক পার করে আনল। ওরা জাররিয় ম্যাসিফের ক্লিফের দিকে তাকানোর সময় দীর্ঘ স্টিয়ারিংয়ের উপর ঝুঁকে পড়ল ও। ইয়োসের সাম্রাজ্য ছেড়ে আসার সময় আনন্দে আপুত থাকার কথা হলেও বরং নীরব ও গম্ভীর হয়ে আছে ওরা।
পরস্পরের কাছ থেকে দূরে সরে আছে ফেন ও তাই। অবশেষে নীরবতা ভাঙল ফেন। কেবল তাইতাকে শোনাতে নিচু কণ্ঠে কথা বলল। তাহলে অনুসন্ধানে ব্যর্থ হয়েছি আমরা। পালাতে পেরেছি, কিন্তু ডাইনীটা বেঁচে আছে, এখন নীল নদী বইছে না।
খেলা এখনও শেষ হয়নি। ঘুটি এখনও টেবিলে সাজানো আছে, বলল তাইতা।
তোমার কথার মানে বুঝলাম না, মাই লর্ড। জাররি থেকে সটকে পড়ছি আমরা। যুদ্ধ ক্ষেত্র থেকে সরে এসেছি, ডাইনীটাকে জীবিত রেখে যাচ্ছি। মিশর ও ফারাওর কাছে নিয়ে যাবার মতো কিছুই নেই তোমার কাছে, স্রেফ কিছু কাহিল দর্শন পলাতক ও আমাদের নিজস্ব কিছু দাস। মিশর এখনও অভিশপ্তই আছে।
না, কেবল এইটুকুই সাথে নিচ্ছি না। ইয়োসের সমস্ত জ্ঞান ও নাক্ষত্রিক শক্তি রয়েছে আমার সাথে।
তাতে তোমার বা ফারাওর কী লাভ হবে, যদি মিশর খরায় শেষ হয়ে যায়?
আমি হয়তো ডাইনীর স্মৃতি তার রহস্য ও ষড়যন্ত্র বানচাল করার কাজে ব্যবহার করতে পারব।
তুমি কি এরই মধ্যে তার জাদুর রহস্য জেনে গেছ? ওর মুখের দিকে চেয়ে আশান্বিত কণ্ঠে জানতে চাইল ফেন।
তা জানি না। ওর কাছ থেকে জ্ঞানের এক পাহাড় ও সাগর ছিনিয়ে নিয়েছি আমি। আমার অন্তস্তল ও চৈতন্য ভরে গেছে। এত বেশি সেই জ্ঞান যেন অসংখ্য হাড়অলা একটা কুকুর। এর বেশির ভাগই আমাকে লুকিয়ে রাখতে হয়েছে। সম্ভবত এর কিছু অংশ এত গভীরে পুঁতে রাখা হয়েছে যে কোনওদিন আর উদ্ধার করতে পারব না। অন্তত তা আত্মস্থ করতে কিছু সময় লাগবে। তোমার সহায়তা লাগবে সেজন্যে। আমাদের দুজনের মন এমনভাবে খাপ খেয়ে গেছে যে কেবল তুমিই আমার কাজে সাহায্য করতে পারো।
আমাকে সম্মানিত করলে তুমি, ম্যাগাস, সহজ কণ্ঠে বলল ফেন।
ভাটিতে অনেকটা পথ ওদের ধাওয়া করল জাররিয়রা। নদীর তীর বরাবর চলে যাওয়া ট্র্যাক ধরে প্রবল বেগে ধেয়ে এলো যতক্ষণ না জলাভুমি ও নিবিড় বন ওদের একাজে ইস্তফা দিতে বাধ্য করল। স্রোতের টানে ভেসে চলল নৌবহর, চাঁদের পাহাড়ে ঝরা বৃষ্টির পানিতে ভরে ফুলে ফেঁপে উঠেছে ওটা, শত্রুকে পেছনে ফেলে গেলে ওরা।
রাত নামার আগেই সেদিন স্কোয়াড্রনের সামনের সারির যানগুলো প্রথম জলপ্রপাতের কাছে পৌঁছাল। অনেক মাস আগে এটা ওদের যাত্রা বিঘ্নিত করেছিল। কিন্তু এখন শাদা পানি প্রবল বেগে নিচে পাঠিয়ে দিল ওদের, ঝাপসা হয়ে গেল দুইপাশে তীর। জলপ্রপাতের শেষে নিচের তীরে জাররিয় সীমানাপ্রাচীর ও ছোট সেনাছাউনীর নিচে ঠেকার পর ওরা লক্ষ করল ফ্লোটিলার আগমন টের পেয়েই সৈনিকরা সটকে পড়েছে। পরিত্যক্ত অবস্থায় রয়েছে ব্যারাকগুলো, কিন্তু গুদামঘরগুলো অস্ত্র, সরঞ্জাম ও অন্যান্য রসদে ভর্তি। বার্জগুলো রসদে বোঝাই করে আবার পুব দিকে আগে বাড়ল ওরা। নৌকায় ওঠার মাত্র দশদিনের মাথায় কিতানগালের মুখ দিয়ে বের হয়ে নালুবালে হ্রদের বিশাল বিস্তারে এসে পড়ল, তারপর উত্তরে বাঁক নিল, তীর অনুসরণ করে ঘুরে তামাফুপা পর্বতমালার দিকে এগিয়ে চলল।
যাত্রাটা রুটিনে পরিণত হতে হতে নিজের ও ফেনের জন্যে বৈঠার বেঞ্চির ঠিক সামনে ডেকের এক কোণে একটা জায়গা দখল করে নিল তাইতা। ছায়া ও গোপনীয়তার স্বার্থে ম্যাটিং পাল ডেকের উপর মেলে দিয়েছে। একটা মাদুরে বসে দিনের প্রায় পুরো সময়ই এক সাথে কাটায় ওরা, পরস্পরের হাত ধরে একে অন্যের চোখের দিকে তাকিয়ে তেনমাস ভাষায় ফিসফিস করে ওর সাথে কথা বলে তাইতা। ওর মনের ভেতর উপচে ভরা সব তথ্য ফেনকে জানানোর এটাই একমাত্র জুৎসই ভাষা।
ওর সাথে ফিসফিস করে কথা বলার সময়ই ফেনের মন ও নাক্ষত্রিক আত্মা বিস্তৃত হওয়ার ব্যাপারে তীক্ষ্ণভাবে সচেতন হয়ে উঠল তাইতা। ওর কাছে যতটুকু নিচ্ছে তার প্রায় সমান সমানই ফিরিয়ে দিচ্ছে। এই অভিজ্ঞতা সমৃদ্ধ ও শক্তিশালী করে তুলছে ওকে। তাছাড়া ক্লান্ত করা তো দূরের কথা বরং অবিকিরত মানসিক কার্মকাণ্ড আরও প্রাণবন্ত করে তুলছে ওদের।
রোজ সন্ধ্যায় সূর্যাস্তের আগে নোঙর ফেলে নৌবহর, বেশির ভাগ যাত্রীই রাতের মতো তীরে নেমে পড়ে, কেবল পাহারা দিতে রেখে যায় অ্যাংকার ওয়াচকে। সাধারণত তাইতা ও ফেন দিনের আলোর এই সময়টুকুর সুবিধা কাজে লাগিয়ে তীর বরাবর ও বনের সীমানায় ঘুরে শেকড়, গুল্ম ও বুনো ফল যোগাড় করে। খাবার ও প্রয়োজনীয় ওষুধ তৈরি মতো যথেষ্ট যোগাড় হলেই আবার নিজেদের আশ্রয়ে ফিরে আসে। শিবিরের বাকি অংশ থেকে অনেকটা তফাতে বসানো হয়েছে ওটা। কোনও কোনও সন্ধ্যায় মেরেন ও সিদুদুকে ওদের তৈরি খাবার খেতে আমন্ত্রণ জানায় ওরা। তবে প্রায়ই নিজেদের ভেতরই মগ্ন থাকে, গভীর রাত অবধি গবেষণা করে।
যখন মাদুরে শুয়ে গায়ে কারোস পশমের চাদর টেনে নেওয়ার পর ফেনকে আপন বাহুতে টেনে নেয় তাইতা। জড়োসড়ো হয়ে ওর বুকে শুয়ে থাকে সে।
মরিয়াভাবে ওকে পেতে চায় তাইতা। ওর সদ্যপ্রাপ্ত সমগ্র পৌরুষ দিয়ে ওকে আকাক্ষা করে, কিন্তু অনেকদিক থেকেই মেয়েটার মতোই নিজেও এই ব্যাপারে নিষ্পাপ ও অভিজ্ঞতাহীন ও। কেবল মেঘ-বাগিচার সেই নিষ্ঠুর সংঘাতই ছিল ওর একমাত্র ইন্দ্রিয়জ অভিজ্ঞতা যেখানে নিজের দেহ ধ্বংসের অস্ত্র হিসাবে ব্যবহার করতে বাধ্য হয়েছিল ও, ভালোবাসার বাহন হিসাবে নয়। সেখানে এখনকার মতো তিক্তমিষ্টি আবেগের ছাপ ছিল না, রোজই এখন এই অনুভূতিটা প্রখরতর হয়ে উঠছে।
