সেতুটা প্রবলভাবে কেঁপে ওঠার সময়ও ওটার উপর ছিল তাইতা। কিনারার দিকে পিছলে গেল ও, আত্মরক্ষা করতে একদিকে ছুঁড়ে দিল তলোয়ারটা, তারপর নিজেকে মিশিয়ে দিল। প্ল্যাঙ্কের বাঁধনের ভেতর সংকীর্ণ ফোকর রয়েছে। আঙুল বাঁকা করে সেগুলোর সাহায্যে উপরে উঠে আসার সময় হাত রাখার মতো একটা জায়গা পেয়ে গেল। ফের কেঁপে উঠল সেতুটা। গড়িয়ে প্রায় ক্লিফের গায়ের কাছে এসে থামল আবার। গোর্জের উপর ঝুলছে ওর পাজোড়া, আঙুলের ডগা দিয়ে কোনমেতে ঝুলে আছে ও। পা রাখার মতো একটা জায়গার খোঁজ করতে লাগল ও। কিন্তু স্যান্ডেলের পায়াগুলো সংকীর্ণ ফোকরে ঢোকানোর পক্ষে বেশ বড়। হাতের শক্তি জড়ো করে নিজেকে টেনে ওপরে ওঠাল ও।
ওর ঠিক মাথার কাছে তার উপর এ্যাচ করে বিধল একটা তীর। গোর্জের উল্টোদিকে দাঁড়ানো জাররিয়রা ওকে উদ্দেশ্য করে চিৎকার করছ। নিজেকে বাঁচনোর মতো অবস্থায় নেই সে। একের পর হাত চালিয়ে নিজেকে ওপরে ওঠাল। প্রতিবার একটা হাত ছেড়ে দেওয়ার সময় এক হাতে ঝুলে থেকে ওটার ওপরের কোনও একটা প্ল্যাঙ্কের ফোকর খুঁজছে ও। সেতুটা পাক খেয়ে যাওয়ায় প্ল্যাঙ্কগুলোর ভেতরের ফোকর আগেরটার চেয়ে পরেরটা অনেক সংকীর্ণ হয়ে এসেছে। অবশেষে এমন একটা জায়গায় পৌঁছুল ও, যেখানে আর পরের ফোকরে আঙুল ঢোকাতে পারল না, তো অসহায়ের মতো ঝুলে রইল। পরের তীরটা এত কাছে এসে লাগল যে ওর টিউনিকের স্কার্টকে কাঠের সাথে গেঁথে দিল।
তাইতা! ফেনের কণ্ঠস্বর। মাথা ঘুরিয়ে ওপরে তাকাল ও। ওর থেকে দশ ফুট ওপরে ফেনের মাথা। চিৎ হয়ে বসে কিনারার উপর দিয়ে তাকিয়ে আছে। হে, প্রিয় আইসিস, আমি তো ভেবেছি তুমি পড়ে গেছ, কেঁপে গেল ওর কণ্ঠস্বর। আরেকটু ধরে থাকো। চলে গেল ও। আরেকটা তীর এসে বিঁধল ঠিক ওর বাম কানের কাছে কাঠের গায়ে।
ধরো, এটা ধরো। ফাঁস বানানো একটা হল্টার দড়ির এসে পড়ল ওর পাশে। ওটার দিকে এক হাত বাড়িয়ে দিল ও, ভেতরে মাথা গলিয়ে বগলের নিচে ফাঁসটাকে বসিয়ে নিল।
তৈরি? ভয়ে বিস্ফারিত হয়ে আছে ফেনের চোখ। অন্য প্রান্ত উইন্ডস্মোকের স্যাডলের সাথে বাঁধা আছে। আমরা টেনে তুলছি তোমাকে। আবার অদৃশ্য হয়ে গেল ও। একটা ঝাঁকি খেয়ে টান টান হয়ে গেল দড়িটা। উপরে ওঠার সময় ঝুলন্ত সেতুর উপর হাত পা চালিয়ে নিজেকে রক্ষা করল ও। আরও তীর ছুটে এলো ওর দিকে, কাঠে বিধল। তবে গাছে উঠে পড়া চিতার নিচে একপাল নেকড়ের মতো ওর রক্তের নেশায় জাররিয়দের চেঁচামেচি শুনতে পেলেও একটা তীরও স্পর্শ করতে পারল না ওকে।
রাস্তার সমতলে ওঠার পর মেরেনের শক্তসমর্থ লোকজন ও নাকোন্তো ওকে নিরাপদে তুলে নিতে হাত বাড়িয়ে দিল। জমিনে এসে উঠে দাঁড়াল ও, অমনি উইন্ডস্মোকের লাগাম ছেড়ে ছুটে এলো ফেন। নীরবে ওকে আলিঙ্গন করল ও, স্বস্তির অশ্রু গড়িয়ে নামছে গাল বেয়ে। চকচক করছে।
*
সেদিন রাতে শরণার্থীদের কলামটাকে ট্রাক বারাবর এগিয়ে নেওয়া অব্যাহত ৬রাখল ওরা। ভোরের প্রথম আলোয় শেষ দলটাকে কিতানগালে নদীর তীরে নিয়ে আসতে পারল। নৌকাঘাটের গেটে ওদের অপেক্ষায় ছিল তিনাত। তাইতার সাথে যোগ দিতে দ্রুত ছুটে এলো সে। আপনাকে নিরাপদে থাকতে দেখে খুশি হয়েছি, ম্যাগাস, তবে লড়াইটা হাতছাড়া হয়ে যাওয়ায় দুঃখ লাগছে। শুনেছি দারুণ শক্ত লড়াই হয়েছে নাকি। জাররিয়দের পিছু ধাওয়ার আর কী খবর আছে?
গোর্জের সেতুটা ধ্বংস হয়ে গেছে, তবে তাই বলে বেশিক্ষণ ঠেকিয়ে রাখা যাবে না ওদের। সিদুদু বলছে দক্ষিণে আরও চল্লিশ লীগ দূরে একটা সহজ পথ আছে। আমরা নিশ্চিত থাকতে পারি সোকলোশ ওটার খবর জানে। লোকজন নিয়ে ওই পথ ধরবে সে। আমাদের চেয়ে অনেক দ্রুত ছুটতে পারবে। অচিরেই ওকে আমাদের সামনে আশা করতে পারি।
দক্ষিণের পথটাই জাররিতে ঢোকার মূল রাস্তা। সোকলোশ অবশ্যই ওটার কথা জানে।
পথে লোক রেখে এসেছি যাতে ওর দিকে খেয়াল রাখতে পারে, বলল তাইতা। এইসব লোককে এখুনি নৌকায় তোলার ব্যবস্থা করতে হবে। প্রথমে ঘোড়গুলোকে বোঝাই করল ওরা। তারপর অবশিষ্ট শরণার্থীদের।
শেষ কয়েক জন নৌকায় ওঠার আগেই পিকেটাররা ঘোড়া হাঁকিয়ে নৌকাঘাটে হাজির হলো। জাররিয়দের সামনের কাতারের লোকজন ঘণ্টাখানেকের ভেতর হামলে পড়বে আমাদের উপর।
মেরেন ও ওর লোকজন শরণার্থীদের শেষ দলটাকে জেটি বরাবর সামনে নিয়ে নৌকায় তুলে দিল। সবগুলো নৌযান ভরে ওঠার পরপরই বৈঠাঅলারা নদীর মূল স্রোতে নিয়ে এলো ওদের যান, তারপর স্রোতের দিকে গলুই ঘুরিয়ে নিল। ফ্লোটিলার শেষ নৌকায় হিলতোর খাটিয়াসহ উঠল ফেন ও সিদুদু। জাহাজঘাটায় বিশটা জাহাজ পড়ে রইল খালি, তাইতা পাড়ে রয়ে গেল ওগুলোর ধ্বংস তত্ত্বাবধান করবে বলে। ওগুলোর ভেতর জ্বলন্ত মশাল ছুঁড়ে দিল ওরা, কাঠের গায়ে দাউদাউ আগুন জ্বলে উঠলে টেনে পানিতে নামিয়ে আনল, এখানে দ্রুত পানির কাছে পুড়ে ছাই হয়ে গেল সব। নৌকাঘাটকে ঘিরে রাখা প্রাচীর থেকে পাহারাদাররা কুড়ু শিংয়ের শিঙ্গায় ফুঁ দিয়ে সতর্ক করে দিল ওদের। শত্রুকে দেখা গেছে।
নৌকার জন্যে চূড়ান্ত সংঘাত হলো। মেয়ে দুটো যেখানে ওদের জন্যে উদ্বিগ্ন হয়ে অপেক্ষা করছিল সেটার ডেকের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ল তাইতা ও মেরেন। হাল ধরল মেরেন, বৈঠাঅলারা ডক থেকে নৌকাটাকে বের করে আনল। জাররিয় ভ্যানগার্ডের প্রথম দলটা যখন ঝড়ের বেগে নৌকাঘাটে হাজির হলো তখনও ওরা তীরের আওতায় রয়ে গেছে। স্যাডল থেকে নেমে তীরে ভীড় করে দাঁড়াল ওরা, ঝড়ের মতো তীরের বৃষ্টি শুরু করল, ওগুলোর কয়েকটা ডকের গায়ে বিধলেও চোট পেল না কেউ।
