নিজের কব্জিতে ব্যান্ডেজ বাঁধার পর দিমিতারকে উঠে দাঁড়াতে সাহায্য করল ও। মেরেন যেখানে দানবীয় পাইথনের লাশ রেখেছিল সেদিকে এগিয়ে যেতে সাহায়্য করল ওকে। মাথা আর লেজের অংশ বাদে পনেরটা টুকরোরই মাপ নিল ওরা। এমনকি মেরেনের পেশীবহুল বাহুও ওটার সবচেয়ে স্কুল অংশের বেড়া পেল না। বেশ অনেক আগেই মারা গেলেও অসাধারণ নকশা করা চামড়ার নিচে এখনও নাচছে পেশিগুলো, পাক খাচ্ছে।
ছড়ির ডগা দিয়ে সাপের খণ্ডিত মাথাটা নাড়ল তাইতা, তারপর খুঁচিয়ে খুলে ফেলল মুখটা। চোয়ালের বাঁধন আলগা করার ক্ষমতা ছিল ওটার, যাতে বিশালদেহী মানুষও গিলে ফেলার মতো বড় হাঁ করতে পারে।
মেরেনের সুদর্শন চেহারায় ঘৃণার ছাপ ঠিকরে পড়ছে। বিশ্রী, অশুভ প্রাণী। ঠিকই বলেছেন দিমিতার। দানবটা ঠিক শূন্যতা থেকে এসেছে। ওটার লাশ পুড়িয়ে ছাই করে ফেলব আমি।
তেমন কিছুই করবে না তুমি, দৃঢ় কণ্ঠে বলল তাইতা। এমনি অতিপ্রাকৃত প্রাণীর চর্বিতে সক্রিয় জাদুকরী শক্তি থাকে। যদি, বেশ সম্ভবপর মনে হচ্ছে, এটা ডাইনীর জাদু বলে সৃষ্টি হয়ে থাকলে আমরা হয়তো ওটাকে তার কাছে ফিরিয়ে দিতে পারব।
তাকে কোথায় পাওয়া যাবে জানা না থাকলে, যুক্তি দেখাল মেরেন। কীভাবে ফেরত পাঠাবেন ওটাকে?
এটা তার সৃষ্টি, তারই অংশ। এটাকে অনেকটা ঘর চেনানোর পায়রার মতো তার কাছে পাঠাতে পারব আমরা, ব্যাখ্যা করলেন দিমিতার।
অস্বস্তির সাথে নড়ে উঠল মেরেন। এতগুলো বছর ম্যাগাসের সাথে থাকলেও এই ধরনের রহস্য ওকে বিভ্রান্ত ও হতাশায় ভরে দেয়।
ওর জন্যে করুণা বোধ করল তাইতা, বন্ধুসুলভ বাঁধনে ওর বাহুর উপরের অংশ ধরল। আবার তোমার কাছে ঋণী হয়ে গেলাম। তুমি না থাকলে দিমিতার আর আমি এখন ওই জানোয়ারটার পেটে থাকতাম।
কৃতজ্ঞতায় ভরে উঠল মেরেনের উদ্বিগ্ন চেহারা। তাহলে আমাকে বলুন, ওটাকে নিয়ে কী করতে চান আপনারা। কম্পিত লাশের গায়ে একটা লাথি হাঁকাল ও। ধীরে ধীরে গড়িয়ে গড়িয়ে বিরাট গোলকের আকার নিচ্ছে ওটা।
আমরা আহত। জাদুর শক্তি কাজে লাগানোর মতো সেরে উঠতে বেশ কয়েক দিন লেগে যেতে পারে। ওটাকে এমন কোনও নিরাপদ জায়গায় নিয়ে যাও যেখানে শকুন বা শেয়াল খেয়ে নেবে না। বলল তাইতা। পরে ওটার ছাল খসিয়ে পানিতে সেদ্ধ করব।
চেষ্টা করলেও পাইথনের লাশ উটের পিঠে ওঠাতে পারল না মেরেন। লাশের গন্ধে ভয় পেয়ে পিছিয়ে গেল ওটা। চিৎকার করে কামড়ে দিতে চাইল; শেষে মেরেন আর পাঁচজন শক্তপোক্ত লোক মিলে টেনে ঘোড়াগুলোর কাছে নিয়ে গেল ওটাকে, তারপর হায়েনা ও অন্য মড়াখেকোদের হাত থেকে বাঁচাতে পাথরে ঢেকে দিল।
ফিরে এসে তাঁবুর মেঝেয় ম্যাজাইদের বসে থাকতে দেখল মেরেন, পরস্পরের মুখের দিকে তাকিয়ে আছেন ওরা। দুজনের শক্তি একত্রিত করতে পরস্পরের হাত ধরে রেখেছে, গোটা শিবিরের চারপাশে নিরাপত্তা ও আড়ালের এটা পর্দা নির্মাণ করেছেন। জটিল অনুষ্ঠান শেষে দিমিতারকে লাল শেপেনের এক ডোজ ওষুধ খাওয়াল তাইতা। অচিরেই ওষুধের প্রভাবে ঘুমে ঢলে পড়লেন বুড়ো মানুষটা।
এবার আমাদের একা থাকতে দাও, সৎ মেরেন। বিশ্রাম নাও, তবে ডাকলেই যেন শুনতে পাও এমন দূরে থেক, বলল তাইতা। নজর রাখার সুবিধার কথা ভেবে দিমিতারের পাশে বসল ও। কিন্তু ওর নিজের শরীরই বাধ মানছে না, গভীর ঘুমের অতলে তলিয়ে গেল ও। ঘুম থেকে জেগে দেখল ওর আহত হাত প্রবল বেগে আঁকাচ্ছে মেরেন। ঘুম জড়ানো চোখে উঠে বসল ও। গর্জে উঠল, কী সমস্যা তোমার? কাণ্ডজ্ঞান খুইয়েছ নাকি?
ম্যাগাস, আসুন, জলদি!
ওর কণ্ঠের জরুরি তাগিদ আর মুখের অভিব্যাক্তি সতর্ক করে তুলল তাইতাকে। দিমিতারের দিকে চোখ ফেরাল ও। স্বস্তির সাথে লক্ষ করল বুড়ো মানুষটা এখনও ঘুমাচ্ছেন। হাঁচড়েপাছড়ে উঠে দাঁড়াল ও। কী হয়েছে? জানতে চাইল, কিন্তু মেরেন চলে গেছে। ভোরের শীতল হাওয়ায় ওকে অনুসরণ করে বাইরে এলো তাইতা। ঘোড়ার আস্তাবলের দিকে ছুটে যেতে দেখল ওকে। ওর কাছে যাবার পর নিঃশব্দে সরীসৃপকে ঢেকে রাখা পাথরের পটার দিকে ইঙ্গিত করল মেরেন। মুহূর্তের জন্যে বিভ্রান্ত বোধ করল তাইতা। তারপর দেখল পাথরগুলো একপাশে সরিয়ে ফেলা হয়েছে।
সাপটা চলে গেছে, হড়বড় করে বলল মেরেন। রাতের বেলায়ই অদৃশ্য হয়ে গেছে ওটা। বলির উপর রেখে যাওয়া পাইথনের ভারি দেহের ছাপ দেখাল। রক্তের কয়েকটা দলা শুকিয়ে কালচে বলের আকৃতি নিয়েছে। এছাড়া আর কিছু অবশিষ্ট নেই। ঘাড়ের পেছনের পশমগুলো খাড়া হয়ে গেছে, টের পেল তাইতা; ঠাণ্ডা হাওয়ার পরশ লেগেছে যেন। ঠিকমতো তল্লাশি করেছ তো?
মাথা দোলাল মেরেন। শিবিরের আশপাশের আধা লীগ এলাকা তন্নতন্ন করে খুঁজেছি। কোনও নিশানাই পাইনি।
কুকুর বা বুনো জানোয়ার খেয়ে নিয়েছে, বলল তাইতা, কিন্তু মেরেন মাথা নাড়ল।
কুকুরগুলোর ওটার কাছে যাওয়ার প্রশ্নই ওঠে না। গন্ধ পেয়েই ওরা চেঁচামেচি জুড়ে দিয়ে পিছিয়ে গিয়েছিল।
হায়েনা, শকুন?
না, কোনও পাখির পক্ষে ওই পাথরগুলো সরানো সম্ভব না, তাছাড়া ওই সাইজের একটা লাশ অন্তত শখানেক হায়েনার খাবার হতে পারত। গর্জন আর চিৎকারে রাতের অন্ধকারে মহাগ্যাঞ্জাম বাধিয়ে বসত ওরা। কোনও শব্দ হয়নি। আর কোথাও কোনও ট্র্যাক বা নাদি বা হ্যাঁচড়ানোর দাগও নেই। ঘন কোকড়া চুলে হাত চালাল ও। তারপর গলা নিচু করে বলল, দিমিতারের কথাই ঠিক, এখানে কোনও প্রশ্নের অবকাশ নেই। মাথা যোগাড় করে উড়ে গেছে, জমিন স্পর্শ করেনি। শূন্যতা থেকে আসা জানোয়ারই ছিল।
