একটা তলোয়ার! আমাকে একটা নতুন তলোয়ার দাও, মরিয়া হয়ে চিৎকার করে উঠল সে। কিন্তু পেছন থেকে কেউ তলোয়ার তুলে দেওয়ার আগেই ফের আক্রমণের মুখে পড়ে গেল ও। ড্যাগারের হাতলটা জাররিয়র মুখের দিকে ঠেলে দিল হিলতো, কিন্তু চট করে নিচু হয়ে গেল লোকটা, হিলতার দিকে ঠেলে দেওয়া হেলমেটের ভাইজরের দিয়ে ঠেলে সরিয়ে দিল ওটা। জায়গামতোই লাগল আঘাতটা, কিন্তু শক্ত করে তার কোমর জড়িয়ে ধরল হিলতো, নিজের লোকের সারির ভেতর টেনে নিয়ে এলো। হিলতোর কজা থেকে নিজেকে উদ্ধার করতে যুদ্ধ করার সময় ওর পেছনের লোকজন মেরে ফেলল তাকে। কিন্তু মারাত্মকভাবে আহত হয়েছে হিলতো; ওইদিন আর লড়াই করার উপায় রইল না ওর। ধরাধরি করে সেতুর কাছে নিয়ে গেল সহযোদ্ধারা, ওদের শরীরের উপর সমস্ত ওজন ছেড়ে দিল ও। তাইতার পাশে ওর জায়গায় অবস্থান গ্রহণ করল নাকোন্তো। ওর দুহাতে একটা করে স্ট্যাবিং বর্শা রয়েছে। সেগুলো এমন নৈপূণ্য ও জোরে ঘোড়াতে শুরু করল যে ব্রোঞ্জের ডগা নৃত্যরত আলোর মতো ঝাপসা হয়ে গেল। পথের উপর মৃত ও মৃত্যুপথযাত্রী জাররিয়দের ফেলে সেতুর মাথার দিকে পিছিয়ে আসতে শুরু করল ওরা তিনজন, শরণার্থীদের চলার গতির সাথে নিজেদের গতি খাপ খাইয়ে নিচ্ছে।
অবশেষে চিৎকার করে উঠল ফেন। সবাই পার হয়েছে। যুদ্ধের ডামাডোল ছাপিয়ে ভেসে গেল ওর সুরেলা কণ্ঠ। তাই যার সাথে লড়ছিল এক কোপে তাকে খতম করল, গলায় পোচ লাগাল একটা, তারপর পেছনে তাকাল। সেতু ফাঁকা।
কুঠারঅলাদের দৃঢ় ইচ্ছা নিয়ে দাঁড়াতে বলো। সেতু কেটে ফেল! ফেনের উদ্দেশে চিৎকার করে বলল ও। ওকে নির্দেশ পুনরাবৃত্তি করতে শুনল। পরের শত্রুর মোকাবিলা করতে ঘুরে দাঁড়াল এবার। ওদের মাথার উপর দিয়ে সোকলোশের হেলমেটে লাগানো উটপাখির পালক দেখতে পাচ্ছে। লোকদের সামনে এগোতে ধমক দিচ্ছে সে। কিন্তু সহযোদ্ধাদের কচুকাটা হতে দেখেছে ওরা। ওদের পায়ের নিচের মাটি এখন রক্ত আর কাদায় মাখামাখি হয়ে আছে। পুরো রাস্তা লাশে ভরা। সাহস উবে যেতে শুরু করেছে ওদের। পেছনে আবার চোখ ফেরানোর মতো যথেষ্ট সময় পেল তাইতা। সেতুর কাঠ ও রশির উপর কুড়োলের আঘাতের আওয়াজ কানে আসছে। তবে ঘোড়ার পিঠে মেয়ে দুটি এখনও গোর্জের ওপাশে যায়নি। ওদের সাথে পুরুষের একটা ছোট দল সারির কোনও ফাঁক পূরণ করতে তৈরি হয়ে আছে।
পিছিয়ে যাও! ওদের নির্দেশ দিল তাইতা। সবাই, পিছিয়ে যাও। দ্বিধা করল ওরা। শত্রুর মোকাবিলায় এত অল্প লোক রেখে যেতে অনীহ। বলছি চলে যাও। এখানে আর বেশি কিছু করার নেই তোমাদের।
পেছাও! গর্জে উঠল মেরেন। জায়গা দাও আমাদের। আমরা আসার পর অনেক তাড়াতাড়ি ঘটবে সবকিছু।
ঘোড়া ঘুরিয়ে নিল মেয়েরা, সেতুর তক্তার উপর আওয়াজ তুলল ওদের ঘোড়ার খুর। অন্যরা ওদের অনুসরণ করে সেতুর ওপারে দূর প্রান্তে পৌঁছাল। নাকোন্তো, মেরেন ও তাইতা এখনও জাররিয় বাহিনীর দিকে তাকিয়ে ধীরে ধীরে সেতুর উপর উঠে ঠিক মাঝখানে অবস্থান নিল। দুপাশেই গভীর খাদ। লোকেরা আসল খুঁটি কাটার সময় কুড়োলের আওয়াজের সাথে প্রতিধ্বনি তুলছে ক্লিফ।
ঝেড়ে দৌড়ে সেতুর উপর এলো শত্রুপক্ষের তিনজন। ওদের পায়ের নিচে কাঁপছে তক্তাগুলো। কেন্দ্রের তিনজনের ঢালে নিজেদের ঢালের বাড়ি খাওয়াল ওরা। তলোয়ার হাঁকিয়ে, ঠেলে দুই পক্ষই দোল খাওয়া সেতুর উপর টিকে থাকল। প্রথম জাররিয় সারিকে কতল করার পর অন্যরা ওদের জায়গা দখল করতে ধেয়ে এলো; রক্তের পুকরে পিছলে যাচ্ছে ওদের পা, হুমড়ি খেয়ে পড়ছে মৃত সহযোদ্ধাদের উপর। ওদের পেছনে অন্যরা হামাগুড়ি দিয়ে সংকীর্ণ সেতুতে উঠে আসছে। তলোয়ারের ফলার সাথে তলোয়ারের ফলার সংঘর্ষ হচ্ছে। লুটিয়ে পড়ছে মানুষ, তারপর সেতুর কিনারা দিয়ে পিছলে নিচে পড়ে যাচ্ছে, মরণ চিৎকার উঠছে ওদের কণ্ঠে। কিন্তু পুরো সময় জুড়ে কাঠের গায়ে কুড়োল হাঁকানোর শব্দ ও চিৎকার নতুন করে প্রতিধ্বনি সূচনা করছে।
সহসা কুকুরের মাছি তাড়ানোর মতো থরথর কেঁপে উঠল গোটা সেতু। এক পাশে খসে পড়ে বেঁকে ঝুলতে লাগল। বিশজন জাররিয় আর্তনাদ ছেড়ে সোজা নিচের গহ্বরের দিকে ধেয়ে গেল। তাইতা ও মেরেন দোলায়মান সেতুর উপর ভারসাম্য বজার রাখতে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল। কেবল নাকোন্তো খাড়া রইল।
ফিরে এসো, তাইতা! চিৎকার করে উঠল ফেন ও ওর চারপাশের অন্যরা। ফিরে এসো! সেতু ভেঙে গেছে! ফিরে এসো!
ফিরে যাও! মেরেনের উদ্দেশে গর্জে উঠল তাইতা, লাফ দিয়ে উঠেই আক্রোব্যাটের মতো ভারসাম্য বজায় রেখে দৌড় লাগাল। ফিরে যাও! নাকোন্তোকে নির্দেশ দিল ও, কিন্তু যুদ্ধের উন্মাদনায় লাল হয়ে আছে শিলুকের চোখ। শত্রুর উপর স্থির সেগুলো, তাইতার কথা শুনেছে বলে মনে হলো না। তলোয়ার দিয়ে তার পিঠে সজোরে আঘাত করল তাইতা। ফিরে যাও! যুদ্ধ শেষ! ওর বাহু শক্ত করে ধরে দূর প্রান্তের দিকে ঠেলে দিল ওকে।
যেন ঘোর থেকে বের হয়ে এসেছে, মাথা নাড়ল নাকোন্তো, তারপর মেরেনের পিছু পিছু দৌড় লাগাল। কয়েক গজ পেছনে থেকে অনুসরণ করল তাইতা। সেতুর শেষ মাথায় পৌঁছুল মেরেন, লাফ দিয়ে পড়ল পাথুরে পথের উপর, কিন্তু ঠিক সেই মুহূর্তে চাবুকের শব্দের মতো শব্দ করে সেতুকে আটকে রাখা মূল গাই রোপের একটা ছিঁড়ে গেল। তীক্ষ্ণ কোণে ঢেউ তুলে দুলতে শুরু করল ক্যাটওঅক, তারপর থামল আবার। জাররিয়দের যারা তখনও কোনওমতে খাড়া হয়ে ছিল, তারা আর টিকতে না পেরে একের পর একের কিনারার দিকে পিছলে গেল, তারপর টপাটপ খসে পড়ল। সেতুটা আবার কাঁপতে শুরু করার আগেই জমিনে পা রাখল নাকোন্তো।
