দুর্গের দেয়ালের আগুন সোকলোশকে বেশিক্ষণ আটকে রাখতে পারবে না। ওদের সবাইকে পার করার আগেই আবার আমাদের উপর হামলে পড়বে সে। সবাই পার হওয়ার আগে সেতুটা কাটার সাহস করেত পারব না আমরা, তাইতাকে বলল সে।
সংকীর্ণ পথে তিনজনই গোটা সেনাবাহিনীকে ঠেকিয়ে রাখতে পারবে, বলল তাইতা।
হিলতো আর আমরা দুজন? জিজ্ঞেস করল মেরেন। সেথের পাছার পাকা ফোঁসকার দোহাই, ম্যাগাস, পরিস্থিতি কত পাল্টে গেছে ভুলেই গিয়েছিলাম। এখন আপনিই সবচেয়ে শক্তিশালি ও দক্ষ তলোয়ারবাজ।
আজকের দিনে এই কথাটা পরখ করার একটা সুযোগ পাব আমরা, ওকে আশ্বস্ত করল তাইতা। তবে এটা নিশ্চিত করো যে আমাদের মধ্যে কেউ পড়ে গেলে যেন পেছন থেকে সুঠাম কেউ এসে তার জায়গা নেয়।
সেতুর উপর তখনও অন্তত পঞ্চাশজন ওদের পালা আসার অপেক্ষায় ছিল, এমন সময় পেছনে সোকলোশের হুঙ্কার শুনতে পেল ওরা: পায়ের দুমাদুম আওয়াজ, বর্ম আর খাপে রাখা অস্ত্রের ঝনঝনানি।
কাঁধে কাঁধে লাগিয়ে, পথের উপর অবস্থান গ্রহণ করল তাইতা, মেরেন ও হিলতো। মাঝখানে রয়েছে তাইতা, হিলতো বামে আর মেরেন বাইরের দিকে, ওর পাশেই সোজা গভীর গহ্বরের দিকে নেমে গেছে ক্লিফ প্রাচীর। নাকোন্তোসহ আরও বাছাই করা দশজন লোক ওদের পেছনে অপেক্ষা করতে লাগল। প্রয়োজনে সামনে ঝাঁপিয়ে পড়তে প্রস্তুত। ট্র্যাকের আরেকটু সামনের দিকে ঘোড়ার পিঠে বসে আছে ফেন ও সিদুদু, তাইতা ও মেরেনের ঘোড়ার লাগাম ধরে রেখেছে। যার যার ধনুক নামিয়ে নিয়েছে ওরা, তৈরি রেখেছে। স্যাডলের উপর উঁচু হয়ে বসে থাকায় তাই ও অন্যদের মাথার উপর দিয়ে সব কিছু স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে।
পথের বাঁক ঘুরে এগিয়ে এলো জাররিয় ব্রিগেডের সামনের সারিটা, পরক্ষণেই ওদের তিনজনকে মোকাবিলা করতে দৃঢ়ভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে থমকে দাঁড়াল। ওদের পেছনে অনুসরণকারী দলটা এগিয়ে এসে থামল। ওরা ফর্মেশন ঠিক করার আগে খানিকক্ষণের জন্যে ধাঁধা লেগে গিয়েছিল। তারপর নীরবে তিন রক্ষীর দিকে তাকিয়ে রইল ওরা। প্রতিপক্ষের শক্তি আন্দাজ করার প্রয়োজনীয় . সময়টুকুই স্থায়ী হলো সেটা। তারপর সামনের কাতারের বিশালবপু সার্জেন্ট তলোয়ার দিয়ে ওদের দিকে ইঙ্গিত করে মাথা পেছনে হেলিয়ে অট্টহাসিতে ফেটে পড়ল।
তিন হাজারের বিরুদ্ধে তিনজন! হা! হা! হাসতে হাসতে দম বন্ধ হয়ে আসার যোগাড় হলো তার। ওহ! ভয়ে মরে গেলাম! বর্মের উপর তলোয়ারের ফলা ঘঁষতে শুরু করল সে। চারপাশের লোকজন ভীতিকর একঘেয়ে ছন্দে যোগ দিল তার সাথে। ঢাল দিয়ে শব্দ করতে করতে সামনে বাড়ল জাররিয়রা। ছিলা টানাটান করা ধনুকের তীরের উপর দিয়ে ওদের উপর নজর রাখছে ফেন। জাররিয়রা আক্রমণ শানানোর ঠিক আগ মুহূর্তে মুখের কোণ দিয়ে ফিসফিস করে কথা বলে উঠল ও, দাড়িঅলা সার্জেন্টের উপর থেকে দৃষ্টি সরাল না, ঢালের কিনারার উপর দিয়ে লোকটার চোখজোড়া দেখা যাচ্ছে। মাঝখানেরটাকে কায়দা মতো পেয়েছি। তোমার দিকেরটাকে গাঁথ তুমি।
ব্যাটাকে চোখে ধরেছিল আমার, বিড়বিড় করে বলল সিদুদু।
মারো ওকে! বলে উঠল ফেন। একসাথে তীর ছুঁড়ল ওরা। তাইতার মাথার উপর দিয়ে উড়ে গেল জোড়া তীর। জাররিয় সার্জেন্টের চোখে গিয়ে বিধল একটা, উল্টে পড়ে গেল সে, বর্মের ভারে পেছনের দুজনের উপর হুমড়ি খেয়ে পড়ল। লুটিয়ে পড়ল তারাও। সিদুদুর তীর তার পাশের লোকটার মুখে লাগল। দুটো দাঁত খসে পড়ল তার, গলার ভেতর দিকে গিয়ে স্থান করে নিল তীরের ফলা। ক্রোধে চিৎকার করে উঠল তার পেছনের সৈনিকরা। লাশ টপকে তাইতা ও ওর দুই সঙ্গীর দিকে তেড়ে এলো। এখন দুপক্ষই এত কাছাকাছি এসে পড়েছে যে মেয়ে ও নিজেদের লোকদের আঘাত করার আশঙ্কায় তীর ছোঁড়ার সাহস করে উঠতে পারছে না।
অবশ্য, একেকবারে মাত্র তিনজন জাররিয় সারির সামনে আসতে পারছে। ওর দিকে ছুটে আসা লোকটার আঘাত বাউলি কেটে সরে গেল তাইতা, তারপর তলোয়ারের নিচু করে চালানো কোপে তার দুটো পা আলগা করে দিল। লোকটা লুটিয়ে পড়তেই তার ব্রেসপ্লেটের ভেতর দিয়ে সোজা হৃৎপিণ্ডের ভেতর ফলা চালিয়ে দিল তাইতা। শত্রুর ফলা পাশ কাটাল হিলতো, তারপর পাল্টা হামলায় মেরে ফেলল তাকে। লোকটার হেলমেটের ভাইজরের নিচ দিয়ে উড়ে গেল ওটা। একসাথে হয়ে দু কদম পিছিয়ে গেল ওরা তিনজন।
আরও জাররিয় নিহত সহযোদ্ধার লাশ টপকে তেড়ে এলো ওদের দিকে। মেরেনকে আঘাত করল একজন, বাউলি কেটে সরে গেল ও; প্রতিপক্ষের তলোয়ার-ধরা হাতের কব্জি আঁকড়ে ধরে ক্লিফের কিনারার উপর দিয়ে ছুঁড়ে ফেলল নিচে। আর্তনাদ করে নিচের পাথরে ধপাস করে পড়ল সে। দুই হাতে তলোয়ার উঁচু করে ধরল তাইতার দিকে এগিয়ে আসা পরের লোকটা, কাঠ কাটার ভঙ্গিতে ওর মাথা লক্ষ্য করে চালাল। তার তলোয়ারের আঘাত গ্রহণ করল তাইতা, তারপর চট করে সামনে এগিয়ে বাম হাতে ধরা ড্যাগারের ফলা সেঁধিয়ে দিল তার পেটে। ঠেলে পাঠিয়ে দিল নিজের দলের দিকে, টলতে টলতে সরে গেল সে। আরেকজনকে পঙ্গু করে দিল মেরেন, লোকটা পড়ে যাবার সময় সজোরে তার মাথায় লাথি হাঁকাল; ডিগবাজি খেয়ে ক্লিফের উপর দিয়ে উড়ে চলে গেল সে। এক আঘাতে পরের জাররিয়র হেলমেট কেটে দিল হিলতো, ফলে ব্রোঞ্জের চূড়া ভেদ করে খুলির গভীরে বসে গেল সেটা। তীরের আঘাত তলোয়ার ঠেকাতে পারল না। মট করে ভেঙে গেল সেটা, হিলতোর হাতে রয়ে গেল কেবল হাতলটা।
