ওদের আর বেশিক্ষণ ঠেকিয়ে রাখতে পারব বলে মনে হয় না, প্যারাপেট বরাবর নিজের লোকদের দিকে তাকিয়ে বলল মেরেন। ছোট ছোট দলে ভাগ হয়ে ফেন আর সিদুদুর দেওয়া চামড়ার পানির পাত্র থেকে পানি খাচ্ছে ওরা। তলোয়ার আর বর্শার ভোঁতা প্রান্তে ধার দিচ্ছে; ক্ষতস্থান বাঁধছে বা স্রেফ বিশ্রাম নিচ্ছে, ওদের চোখমুখ ফাঁকা, চোখে মলিন দৃষ্টি।
দালানকোঠায় আগুন লাগাতে তৈরি আছ তুমি? জানতে চাইল তাইতা।
মশাল তো জ্বালানোই আছে, নিশ্চিত করল মেরেন। দেয়ালের কেবল ভিত্তিই পাথরের তৈরি। মূল ভবন ও প্রহরামিনারসহ বাকি সব কিছুই কাঠের। আগুনের শিখা জাররিয়দের পালিয়ে যাওয়ার সুযোগ দেওয়ার আগেই এইসব উপকরণ পাসের মুখ বন্ধ করে দেবে।
মেরেনকে রেখে প্যারাপেটের দূর প্রান্তে এলো তাইতা। এক কোণে বসে মাথার উপর জোব্বা টেনে দিল।
কৌতূহলের সাথে ওকে দেখছিল লোকেরা।
কী করছেন তিনি? জিজ্ঞেস করল একজন।
ঘুমাচ্ছেন, আরেকজন জবাব দিল।
উনি ধার্মিক মানুষ। প্রার্থনা করছেন।
ওর প্রার্থনার প্রয়োজন আছে আমাদের, মন্তব্য করল চার নম্বর।
তাইতা কী করতে চাইছে, জানে ফেন; কাছে এসে দাঁড়াল ও। নিজের শরীর দিয়ে ওকে আড়াল করে আপন মনস্তাত্ত্বিক শক্তিতে ওকে আরও শক্তি যোগানোর চেষ্টা করল।
অমন ভীষণ লড়াইয়ের পর নিজেকে স্থির করতে বেশ প্রয়াসের দরকার হলো তাইতার, তবে অবশেষে দেহের সীমানা থেকে নিজেকে মুক্ত করে নিল, পাহাড়ের চূড়ায় উড়ে গেল ওর আসল সত্তা। রণক্ষেত্রের উপর নজর বুলিয়ে জাররিয় বাহিনীর জটলা দেখতে পেল, তিন হাজার বা তারও বেশি সৈন্য ট্র্যাক ধরে সমতলের দিকে যেতে সমবেত হচ্ছে। দুর্গের ঠিক নিচে, কিন্তু দেয়ালের কাছ থেকে বেশ দূরে পরের হামলা সংগঠিত হতে দেখল ও। এবার পাহাড় চূড়া পার হয়ে গেল ও। তাকাল কিতানগালে নদী ও হ্রদের দূরবর্তী নীলের দিকে।
নদীর মুখে নৌকা ঘাটে তিনাতের লোকদের দেখতে পেল। সেনাছাউলী দখল করে নিয়েছে ওরা। এখন নদীর জোরাল প্রবাহে নৌকো জুড়ে নামানোর প্রয়াস পাচ্ছে। এরই মধ্যে শরণার্থীদের প্রথম দলটা নৌকায় উঠে পড়েছে, বাকিরা বৈঠা টানার বেঞ্চে অবস্থান নিয়েছে। কিন্তু আরও শত শত লোক এখনও পাহাড়ী পথে নামছে। মাটির আরও কাছাকাছি নেমে এলো ও। পাহাড়ের শরীরকে বিভক্তকারী গোর্জের দিকে তাকাল তীক্ষ্ণ চোখে। ওটার উপর দিয়ে চলে যাওয়া ঝুলন্ত সেতুটাকে ধূসর পাথরের বিশাল কাঠামোর বিপরীতে এতটুকুন মনে হচ্ছে। শরণার্থীদের শেষ দলটা গোর্জের উপর দিয়ে বিপদসঙ্কুল যাত্রা শুরু করতে নাজুক কাঠের তক্তার উপর উঠতে শুরু করেছে। তিনাতের লোকেরা দুর্বল ও প্রবীনদের সাহায়্য করছে, ওর কুঠারবাহিনী সেতুর পাইলন কেটে ওটাকে নিচের অসীম গহ্বরে ফেলে দিতে তৈরি হয়ে আছে। সজোরে পিছু হটল তাইতা, দেহের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ তুলে নিল। তারপর মাথার হুড খুলে তড়াক করে সোজা হয়ে দাঁড়াল।
কী জানতে পেলে, তাইতা? শান্ত কণ্ঠে জানতে চাইল ফেন।
আমাদের বেশিরভাগ লোক গোর্জ পার হয়ে গেছে, জবাব দিল ও। এখন দুর্গ ছেড়ে গেলে আমরা ওখানে পৌঁছতে পৌঁছতে বাকিরাও সেতু পার হয়ে যেতে পারবে। ফেন, তুমি আর সিদুদু ঘোড়াগুলোকে তৈরি রাখ।
ওকে কাজটা করার জন্য রেখে প্যারাপেটের উপর দিয়ে দ্রুত পায়ে মেরেনের কাছে চলে এলো ও। লোকজন জড়ো করো। দেয়ালে আগুন লাগিয়ে দাও, জাররিয়দের পরের হামলা শুরু হওয়ার আগেই পথে নেমে পড়ো।
লড়াইয়ের অবসান ঘটেছে জানতে পেরে লোকদের প্রাণশক্তি চড়ে উঠল। অল্প সময়ের মধ্যেই যার যার অস্ত্র ও আহতদের বয়ে দুর্গের পেছনের ফটক দিয়ে ঠিক পথে এগোতে শুরু করল ওরা। আগুন ধরানোর কাজ তদারক করতে রয়ে গেল তাইতা। জাররিয় সেনাছাউনী মেঝের আস্তরণ ও মাদুর হিসাবে উলুখাগড়া ব্যবহার করেছে। সেগুলোকেই এখন দেয়াল বরাবর ঠেস দিয়ে রাখা হয়েছে। মেরেনের লোকেরা ওগুলোকে কোয়ার্টার মাস্টার স্টোরে পাওয়া তেলে আক্ষরিক অর্থেই ভিজিয়ে ফেলেছে। জ্বলন্ত মশাল ওগুলোর উপর ছুঁড়ে দিতেই আগুন ধরে গেল, নিমেষে জ্বলে উঠল দাউদাউ করে। কাঠের দেয়ালে এমন জোরাল আগুন ধরে গেল যে তোরণের দিকে ছুট লাগাতে বাধ্য হলো তাইতা ও মশালধারীরা।
আগেই ওয়ার্লউইভের পিঠে চেপে বসেছিল ফেন, উইন্ডস্মোকের লাগাম ধরে ওর অপেক্ষা করছে। একসাথে ট্রাক ধরে শেষ প্লাটুনের পেছন পেছন ছুটতে শুরু করল ওরা। মেরেন ও হিলতো রয়েছে ওটার নেতৃত্বে।
ঝুলন্ত সেতুর কাছে পৌঁছে তখনও অন্তত শখানেক শরণার্থী ওপারে যেতে পারেনি দেখে হতাশ হয়ে পড়ল ওরা। ভীড়ের ভেতর দিয়ে পথ করে সামনে এগিয়ে গেল মেরেন, কারণ কী জানতে চায়। পাঁচজন বয়স্কা কিন্তু মুখরা মহিলা গোর্জের উপরের সংকীর্ণ সেতুতে পা রাখতে অস্বীকার যাচ্ছে। পথের উপর শুয়ে আতঙ্কে চিৎকার করছে ওরা, কেউ কাছে যাবার চেষ্টা করলেই লাথি হাঁকাচ্ছে তাদের।
মারতে চাও নাকি আমাদের! গজগজ করে চলেছে ওরা।
আমদের এখানেই ফেলে যাও। গর্তে ফেলার বদলে আমাদের বরং জাররিয়দের হাতে তুলে দাও। ওদের ভীতি সংক্রামক হয়ে দাঁড়াল। পেছনে যারা আসছিল, এখন তারা পিছু হটতে চাইছে; সারির পেছনের লোকদের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। নাটের গুরুর কোমর জড়িয়ে ধরে তাকে কাঁধে তুলে নিল মেরেন। এবার চলো। ওর কানে কামড়ে দিতে চাইল মহিলা, খামচে দেওয়ার চেষ্টা করল মুখে। কিন্তু দাঁত ওর ব্রোঞ্জের হেলমেটের উপর দাগ ফেলতে পারল না। সংকীর্ণ পথে ওকে নিয়ে দৌড় লাগাল মেরেন, পায়ের নিচে তক্তা থরথর করে কাঁপছে। দুপাশ যেন সীমাহীন। বয়স্কা মহিলা আবার আর্তনাদ করে উঠল। সহসা মেরেন। বুঝতে পারল ওর পিঠ ভিজে গেছে। ভয়ঙ্কর হাসিতে ফেটে পড়ল ও। বেশ খাটুনি গেছে। আমাকে শীতল করে দেওয়ায় ধন্যবাদ। উল্টো দিকে এসে মহিলাকে নামিয়ে দিল ও। ওর চোখজোড়া উপড়ে তোলার শেষ একটা প্রয়াস পেল সে। তারপর ফোঁপাতে ফোঁপাতে লুটিয়ে পড়ল পথের উপর। ওকে রেখে বাকিদের তুলে আনতে ফিরে গেল মেরেন। কিন্তু হিলতো ও অন্যরা ইতিমধ্যে গার্জের উপর দিয়ে এগিয়ে আসতে শুরু করেছে। প্রত্যেকের কাঁধে এক জন করে বয়স্কা মহিলা, নিজেদের ছাড়িয়ে নিতে যুঝছে ওরা, পিঠের উপর চিৎকার করছে। ওদের পেছনে লোজন আরও একবার গোর্জের উপর দিয়ে এগিয়ে আসতে শুরু করেছে। কিন্তু দেরির জন্যে খেসারত গুনতে হলো ওদের। ভীড় ঠেলে সামনে এগিয়ে গেল মেরেন, তাইতাকে কলামের একেবারে সামনের কাতারে দেখতে পেল।
