ওকে দেখে দারুণ স্বস্তিতে প্রবলভাবে আলিঙ্গন করল ফেন। আমার অনেক প্রিয় তুমি, হে লর্ড। ফিসফিস করে বলল। তোমার চারপাশে বর্শা উড়তে দেখে আমার বুকের স্পন্দন বন্ধ হয়ে যাবার যোগাড় হয়েছিল।
আমার জন্যে তোমার ভেতর এত সম্মান থাকলে জাররিয়দের বাকি দলটা আসার আগেই আমার খাওয়ার ব্যবস্থা করা উচিত তোমার।
পাহাড় থেকে ফিরে আসার পর দারুণ দক্ষ হয়ে উঠেছ, খুব ভালো লাগছে আমার, লর্ড। হেসে উঠল সে, রান্নাঘরে অদৃশ্য হয়ে গেল। সে ফিরে আসার পর প্যারাপেটের উপর দিয়ে সামনে ঝুঁকে ধুরা পিঠা দিয়ে ডিম খেল। মেরেন আর ওর লোকেরা যে চাতাল থেকে পাথর ফেলেছিল সেটা দখল করার জন্যে জনা পঞ্চাশেক লোক পাঠিয়েছে জাররিয় কমান্ডার, দেখতে পেল ওরা। ওদের নিচে দূর পাল্লার তীরের হাত থেকে গা বাঁচিয়ে পথের মাঝখানে এসে দাঁড়িয়েছে সে। লোকটা লম্বা, ছিপছিপে, হেলমেটের চূড়ায় কর্নেলের প্রতীক উটপাখির পালক পরেছে।
ব্যাটার হাবভাব মোটেই ভালো ঠেকছে না, মন্তব্য করল তাইতা। লোকটার গায়ের রঙ শ্যামলা, কঠিন উঁচু হয়ে থাকা চিবুক, বাঁকানো নাক। ওকে চিনতে পারছ, সিদুদু?
পেরেছি, ম্যাগাস। কঠিন, নিষ্ঠুর লোক, আমরা সবাই তাকে ঘৃণা করি।
নাম?
কর্নেল সোকলোশ।
কর্নেল স্নেক, তরজমা করল তাইতা। নামের সাথীর সাথে অনেক মিল তার।
চাতালের নিয়ন্ত্রণ অধিকার করেই যোদ্ধাদের দুর্গের সামনের পাথরে ছাওয়া রাস্তা পরিষ্কার করতে পাঠিয়ে দিল সোকলোশ, একই সাথে যারা এখানকার প্রতিরক্ষায় আছে তাদের শক্তিরও পরীক্ষা নেবে।
কয়েকটা তীর পাঠাও ওকে লক্ষ্য করে, ফেনকে বলল তাইতা। ঝটপট তীর আলগা করে নিল মেয়ে দুটো। সিদুদুর তীরটা এক জাররিয়র মাথার ঠিক উপর দিয়ে চলে গেল, লোকটা মাথা নিচু করে দৌড়ে পালাল। আরেকজনের পায়ের গোছায় আঘাত লাগাল ফেন। নেকড়ের মতো অক্ষত পায়ের উপর পাক খেতে লাগল সে, অবশেষে সহযোদ্ধারা তাকে চেপে ধরে তীরের ফলাটা বের করে আনল। তারপর পথ ধরে ছুটে চলে গেল ওরা। দুজন আহতকে সাহায্য করছে। তারপর দীর্ঘ সময় নীরবতা বজায় রইল। এক সময় সশস্ত্র লোকদের বিরাট একটা দল বাঁক ঘুরে ট্র্যাক বরাবর দুর্গের দিকে এগিয়ে আসতে শুরু করল।
মনে হচ্ছে এখন আমার নিচে যাবার সময় হয়েছে, বলল মেরেন। তারপর মই বেয়ে প্যারপেটে নেমে গেল। শত্রুপক্ষের পরের দলটা তীরের নাগালের মধ্যে আসামাত্র হিলতোকে ডাক দিল ওঃ তৈরি হও!
সমবেত হামলা! চিৎকার ছাড়ল হিলতো। তলোয়ার খাপে পুরে ধনুক আলগা করে নিল ওর লোকজন। নিশানা স্থির করো! ছুঁড়ো!
সকালের আকাশে উড়ে গেল নিক্ষিপ্ত তীরের ঝাঁক, যেন পঙ্গপালের ঝাঁক। জাররিয়দের উপর গিয়ে পড়ল ওগুলো। জাররিয়দের ঘোড়ার বর্মে ঝনঝন শব্দ তুলল ওগুলোর ফলা। কয়েক জন লুটিয়ে পড়ল। কিন্তু বাকিরা কাছাকাছি ঘেঁষে মাথার উপর বর্ম তুলে ধরে ছামিয়ানার মতো তৈরি করে দুলকি চালে আগে বাড়ল আবার। বারবার হিলতোর লোকেরা তীরের আক্রমণ চালাতে লাগল, কিন্তু বর্মের ছত্রছায়ায় অক্ষত রয়ে গেল জাররিয়রা। দেয়ালের পায়ের কাছে পৌঁছে গেল ওরা। পাথুরে গাঁথনির বিপরীতে অবস্থান গ্রহণ করল প্রথম দলটা, দ্বিতীয় দলটা ওদের কাঁধের উপর উঠে পিরামিড তৈরি করে ফেলল।
তৃতীয় সারির সৈনিকরা সেটাকে দেয়ালের চূড়ায় ওঠার সিঁড়ি হিসাবে কাজে লাগাল। তলোয়ার চালিয়ে, তীর ছুঁড়ে ওদের পিছু হটিয়ে দিল হিলতো-বাহিনী। অন্যরা তাদের জায়গায় দেয়াল বেয়ে উঠতে শুরু করল, একজনের তলোয়ারের ফলার সাথে আরেকজনের তলোয়ারের টক্কর লাগছে, ঠেলাঠেলি করছে ওরা। যন্ত্রণায় ককিয়ে উঠছে লোকজন, একে অপরকে খিস্তি করছে। জাররিয় বাহিনীর একটা ছোট অংশ দেয়াল টপকে জোর করে প্যারাপেটের উপর উঠে এলো, কিন্তু ওরা সুযোগটা কাজে লাগানোর আগেই মেরেন, নাকোন্তো ও ইম্বালি হামলে পড়ল ওদের উপর। বেশিরভাগকেই দুভাগ করে ফেলল, দেয়াল থেকে ফেলে দিল অন্যদের।
মিনারের উপর ফেন ও সিদুদু তাইতার দুপাশে দাঁড়িয়ে সতর্কতার সাথে নিশানা বাছাই করছে, দেয়ালের নিচে জাররিয় ক্যাপ্টেন তার লোকজনকে আবার দলবদ্ধ করার চেষ্টা করার সময় ফেলে দিচ্ছে ওদের। তারপর যখন আক্রমণ মুখ থুবড়ে ব্যর্থ হলো, ওদের তীরের বৃষ্টি পলায়নের গতি বাড়াতে বাধ্য করল জাররিয়দের। নিহতদের লাশ দেয়ালের পায়ের কাছে ফেলে গেল শত্রুপক্ষ, কিন্তু আহতদের টেনে হিঁচড়ে নিয়ে গেল।
দুপুরের আগে আরও দুই দফা আক্রমণ শানাল সোকলোশ। ওদের প্রথম হামলাটা যেভাবে পরল ঠেকাল মেরেন-বাহিনী, কিন্তু পরের হামলার সময় তিনটা আলাদা ডিটাচমেন্টে নিয়ে আগে বাড়ল জাররিয়রা, সাথে নিয়ে এলো তাড়াহুড়োয় তৈরি আক্রমণ মই।
যুগপতভাবে দেয়ালের মাঝখানে আর দুই প্রান্তে আক্রমণ চালাল ওরা। আগেই ক্ষীণ সারিতে ছড়িয়ে ছিল প্রতিরক্ষাকারীরা, কিন্তু এবার ত্রিমুখী হামলার মোকাবিলা করতে ওদের আরও ছোট ভাগে ভাগ করতে বাধ্য হলো মেরেন। মরিয়া লড়াই চলল। ওদের সাথে যোগ দিতে নেমে এলো তাইতা। অস্ত্রভাণ্ডারে পাওয়া তীরের বান্ডিলের সাথে মেয়েদের মিনারে রেখে এসেছে। সকালের বাকি সময়টায় দেয়ালের মাথায় অব্যাহত রইল লড়াই। অবশেষে ওরা যখন জাররিদের ছুঁড়ে ফেলে দিল, মেরেনের লোকদের তখন পর্যদস্ত অবস্থা। ওদের বার জন লোক খুন হয়েছে, বাকি দশ জন এমন মারাত্মক আহত হয়েছে যে লড়াই চালানোর অবস্থা নেই ওদের। বাকিদের বেশিরভাগই অন্তত পক্ষে ছোটখাট চোট পেয়েছে, ক্লান্তির শেষ সীমায় পৌঁছে গেছে প্রায়। ট্র্যাকের দিক থেকে সোকলোশ ও তার ক্যাপ্টেনদের চিৎকার শুনতে পেল ওরা, আবার নতুন করে হামলার ব্যবস্থা করতে যাচ্ছে তারা।
