আইসিসের কৃপায়, মনে হচ্ছে অনায়াসেই জায়গামতো পৌঁছে যাব আমরা, মশালের আলোয় হিলতোর দীর্ঘ দেহ দেখে বলল ফেন। কলামকে সামনে বাড়তে গভীর কণ্ঠে তাগিদ দিচ্ছে ও।
ওর সাথে যোগ দিতে দৌড়ে গেল তাইতা।বেড়ে দেখিয়েছ, সুজন হিলতো, ওকে শুভেচ্ছা জানাল ও। জাররিয় ভ্যানগার্ড চোখে পড়েছে তোমার?
সন্ধ্যায় ওদের ওড়ানো ধুলো দেখার পর আর কিছুই চোখে পড়েনি। তবে খুব বেশি দূরে থাকার কথা নয় ওদের। হিলতোর দুই কাঁধে দুটা বাচ্চা বসে আছে। ওর লোকজনও একইভাবে বোঝাই।
পূর্ণ গতিতে এগিয়ে যাও, নির্দেশ দিল তাইতা, তারপর শূন্য ট্রাক ধরে ছুটে একা না হওয়া পর্যন্ত আগে বাড়ল ও, এক সময় পশ্চাদপসরণকারীদের আওয়াজ অনেক পেছনে পড়ে গেল। থেমে কান পাতল ও, নিচে ক্ষীণ একটা বিড়বিড় আওয়াজ কানে এলো। হাঁটু গেড়ে বসে পাথরে কান পাতল। এবার প্রবল হয়ে উঠল আওয়াজটা। রথ ও কুচকাওয়াজ করে এগিয়ে আসা লোকজন। এক লাফে সোজা হয়ে দাঁড়াল ও। দ্রুত ছুটে আসছে ওরা। হিলতো যেখানে কলামের শেষ মাথায় পরিদর্শন করছিল, দ্রুত সেখানে চলে এলো। দলের প্রায় শেষের দিকে এক মহিলা পিঠে বাচ্চা নিয়ে এগোচ্ছে। তার পেছনে আরও দুজনকে টেনে হিঁচড়ে নিয়ে চলেছে সে।
আমি ক্লান্ত, আমার পা আর চলছে না।
এবার কি আমরা বিশ্রাম নিতে পারব? আমরা ঘরে ফিরতে পারব?
বাড়িতেই যাচ্ছ, বলে দুটো বাচ্চাকেই কাঁধে তুলে নিল ও। শক্ত করে ধরে রাখ, ওদের বলল, তারপর মুক্ত হাতটা মায়ের দিকে বাড়িয়ে দিল। এবার চলো। অচিরেই তোমাদের ও মাথায় নিয়ে যাব। উপর দিকে দ্রুত পা চালাল ও। পেছনে টেনে নিয়ে চলল মহিলাকে।
এই যে এসে গেছি, পাসের চূড়ায় পৌঁছে বাচ্চা দুটোকে মাটিতে নামিয়ে বলল ও। এই দুই সুন্দরী তোমাদের ভালো কিছু খাবার দেবে। ফেন ও সিদুদুর দিকে ওদের ঠেলে দিল। তারপর মায়ের দিকে তাকিয়ে হাসল। বেচারা একেবারে কাহিল হয়ে গেছে, উদ্বেগে কাবু। এখন আর বিপদের কোনও কারণ নেই।
জানি না আপনি কে, তবে নিঃসন্দেহে আপনি ভালো মানুষ।
ওদের রেখে আবার হিলতোর কাছে ফিরে এলো ও। একসাথে শরণার্থীদের অবশিষ্টাংশ পাসের উপর দিয়ে নেমে যেতে দেখল ওরা, ওপাশের ঢাল বেয়ে নামছে। ইতিমধ্যে ভোর হতে শুরু করেছে। খাড়া ঢালের চাতালের মাথায় যেখানে মেরেন দাঁড়িয়ে আছে, মাথা তুলে সেদিকে তাকাল তাইতা। হাত নাড়ল মেরেন। ওর লোকেরা জড়ো করা আলগা পাথরের আড়ালে গা ঢাকা দিয়ে আছে।
প্রহরা মিনারের চূড়ায় যাও, ফেন ও সিদুদুকে নির্দেশ দিল তাইতা। একটু পরেই তোমাদের সাথে যোগ দিচ্ছি। মুহূর্তের জন্যে মনে হলো তর্ক জুড়ে দেবে ফেন, কিন্তু বিনা বাক্যব্যয়ে ঘুরে দাঁড়াল ও।
অচিরেই দুর্গের দিকে রথের চাকার ঘরঘর আওয়াজ ছুটে আসার শব্দ পেল তাইতা। ওদের সাথে মিলিত হতে ট্রাক ধরে খানিকটা এগিয়ে গেলও। চাতালের উপর ওত পেতে থাকা মেরেনের লোকদের দিক থেকে ওদের দৃষ্টি সরিয়ে রাখতে চায়। সহসা সংকীর্ণ পথের বাঁক ঘুরে উদয় হলো প্রথম বাহনটা। ওটা এগিয়ে আসার সময় বাকিগুলোও উদয় হলো পেছনে। প্রতিটি বাহনের পাশে বারজন করে পদাতিক সৈনিক। খাড়া পথ ধরে উঠে আসার সময় রথের পাশ ধরে রেখেছে। সব মিলিয়ে আটটা রথ দেখা যাচ্ছে, শেষেরটার পেছনে একটা বিশাল পদাতিক বাহিনী আবির্ভূত হলো।
গা ঢাকা দেওয়ার চেষ্টাই করল না তাইতা, সামনের রথের দিক থেকে চিৎকার শোনা গেল। চালক চাবুক চালাতেই লাফ দিয়ে সামনে ছুটল ওটা। নড়ল না তাইতা। ওকে লক্ষ্য করে বর্শা ছুঁড়ে দিল এক বর্শাধারী, কিন্তু বিক্ষিপ্ত হলো না তাইতা। অস্ত্রগুলো পাথরের উপর পড়ে ঝনঝনিয়ে উঠছে, লক্ষ করল ও। আবার ওদের আসতে দিল ও। পরের বর্শাটা হয়তো ওকে শেষ করে দিতে পারত। কিন্তু বাউলি কেটে ওটাকে ফাঁকি দিল। কাঁধের উপর দিয়ে উড়ে চলে গেল ওটা। মিনারের উপর থেকে চিৎকার শুনতে পেল ও। তাইতা, ফিরে এসো। নিজেকে বিপদে ফেলছ তুমি। ফেনের সতর্কবাণী উপেক্ষা করল ও। রথের দিকে লক্ষ রাখতে লাগল। অবশেষে পুরোপুরি মনোযোগ দিল ওরা: এখন আর ওদের ঘুরে পালানোর সুযোগ নেই। মেরেনের উদ্দেশে ইশারা করল ও। এখন চিৎকার করে বলে উঠল। ক্লিফের প্রাচীরে প্রতিধ্বনিত হলো ওর কণ্ঠস্বর: এখন! এখন! এখন!
কাজে লেগে গেল মেরেনের লোকজন। চাতালের উপর দিয়ে গড়িয়ে পড়তে শুরু করল প্রথম দফার পাথরগুলো, খাড়া ঢাল বেয়ে লাফাতে লাফাতে নেমে এলো। অন্য পাথরও আলগা করে দিল ওগুলো, ফলে পাথর ধস নামল। তারই প্রবল আওয়াজ শুনতে পেল রথ চালকরা। হতচকিত চিৎকার করে বাহন ছেড়ে নিরাপদ জায়গার খোঁজে ছুট লাগাল। কিন্তু সংকীর্ণ পাসে পাথরের ধারা থেকে রক্ষা পাওয়ার মতো কোনওই আশ্রয় নেই। পরিত্যক্ত রথের উপর পড়তে রাগল পাথরের ঝক। মানুষসহ পথের উপর থেকে ভাসিয়ে নিয়ে গেল ওগুলোকে নিচের গোর্জে। পাথরের পতন শেষ হলে দেখা গেল আবর্জনার স্তূপে রুদ্ধ হয়ে গেছে পাসটা।
কিছু সময়ের জন্যে কোনও রথই আর এই পাস ব্যবহার করতে পারবে না, এমনকি পায়ে চলা লোকজনও এই বাধা ডিঙাতে গিয়ে ঝামেলায় পড়বে। সন্তোষের সাথে আপনমনে বলল তাইতা। সকালের অবশিষ্ট সময়ের জন্যে ওদের আটকে রাখবে। ইশারায় মেরেনকে ওর লোকজনকে দুর্গে নামিয়ে আনার নির্দেশ দিল ও। মিনারের মাথায় যখন উঠে এলো ও ততক্ষণে শরণার্থীদলের অবশিষ্টাংশও উল্টোদিকের ঢাল বেয়ে ঢের আগেই উধাও হয়েছে।
