পেছনে তিনাতের লোকজনের নিবিড় দল নিয়ে দুলকি চালে ছুটে গেল হিলতো। নির্দেশ দিল সে, যুদ্ধের ফরমেশনে রেখা তৈরি করল। সোজা গিজগিজে জাররিয়দের দিকে এগিয়ে গেল ওরা। ঝাঁপিয়ে পড়ল, ছিন্ন ভিন্ন করে দিল গোটা সারি। তারপর প্রান্তরের উপর দিয়ে ধাওয়া করে যেদিক থেকে এসেছিল সেদিকে পাঠিয়ে দিল। আহত ঘোড়াগুলোকে বিশ্রাম দিতে দিতে ওদের কুচকাটা করল।
নীল পাহাড়ের দিকে সদলে ছুটে চলল তাইতা। ওয়ার্লউইন্ডের পিঠে সওয়ার মেয়ে দুটির সাথে যোগ দেওয়ার পর লাগাম টেনে ওদের পাশে চলে এলো মেরেন। ভূতের মতো তীর ছুঁড়তে পারো তুমি, সিদুদুকে বলল ও।
ওনকাই আমার ভেতর ভূত নিয়ে এসেছে, বলল সে।
মনে হয়, সোনার মুদ্রায়ই তোমার দেনা শোধ করেছ: এখন তুমি আর তোমার ভূত রাতে শান্তিতে ঘুমাতে পারবে।
হ্যাঁ, মেরেন, চিন্তিত কণ্ঠে বলল সে। কিন্তু আমি কোনওদিন যোদ্ধা হতে চাইনি-এটা আমার উপর চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। এখন আমি বরং ভালো স্ত্রী ও মা হতে চাইব।
খুবই তারিফযোগ্য ইচ্ছা। আমি নিশ্চিত, তুমি এর ভাগ নিতে একজন ভালো মানুষের দেখা পাবে।
আশা করি, কর্নেল ক্যাম্বিসেস, চোখের পাতা নামিয়ে ওর দিকে তাকাল সিদুদু। খানিক আগে আমাকে ভালোবাসার কথা বলছিলে…
ওয়ার্লউইন্ড এরই মধ্যে ফেন বাধ্য করায় বাড়তি ওজন বইতে গিয়ে ক্লান্ত হয়ে পড়েছে, গম্ভীরভাবে বলল মেরেন। আমার পেছনে তোমার বসার মতো জায়গা আছে। আমার কাছে আসতে চাও না?
যারপরনাই আনন্দের সাথে, কর্নেল। ওর দিকে হাত বাড়িয়ে দিল সে। অনায়াসে ওকে তুলে এনে পেছনে জিনের উপর বসিয়ে দিল মেরেন। দুই হাতে ওর কোমর জড়িয়ে ধরল সে। তারপর ওর দুধের মাঝখানে মাথা দাবাল। নিজের গায়ে ওর কম্পন টের পাচ্ছিল মেরেন। মাঝেমাঝেই সামলে ওঠার আগেই কান্নার দমকে ওর গোটা শরীর কেঁপে কেঁপে উঠছে। মনটা খারাপ হয়ে গেল মেরেনের। যতদিন বেঁচে থাকবে ততদিন ওকে দেখেশুনে রাখতে, যত্ন নিতে ইচ্ছে করল ওর। তাইতা ও ফেনের পেছনে পেছন ছুটে চলল ও, ঠিক পেছনে রইল নাকোন্তো ও ইম্বালি।
*
পাহাড়ের পাদদেশের কাছে পৌঁছুনোর আগেই হিলতো ও তার স্কোয়াড্রন।মিলিত হলো ওদের সাথে। মেরেনের কাছে রিপোর্ট করতে আগে বাড়ল হিলতো। সাতজনকে মেরে ওদের ঘোড়া ছিনিয়ে নিয়েছি আমরা, বলল সে। বাকিরা আর লড়াই করতে পারবে না। ওদের পিছে না ছুটে চলে যেতে দিয়েছি। ওদের পেছনে শত্রুদের কেমন বাহিনী আসতে পারে আমার জানা নেই।
ভালোই দেখিয়েছ, হিলতো।
ছিনিয়ে নেওয়া ঘোড়াগুলোর একটা কি ছোট সিদুদুর জন্যে নিয়ে আসব?
না, ধন্যবাদ। আপাতত অনেক কাজ করেছ তুমি। যেখানে আছে সেখানেই অনেক নিরাপদে আছে ও। আমি নিশ্চিত, তিনাতের নাগাল পাওয়ার পর আমাদের আরও ঘোড়ার দরকার হবে। ততক্ষণ ওগুলো সামলে রাখ।
পাহাড়ের পাদদেশ ধরে গ্যাপের দিকে উঠে যাবার সময় শরণার্থীদের এক বিশাল মিছিলের শেষাংশের সাথে মিলিত হলো ওরা। বেশিরভাগই পায়ে হেঁটে চলছে, তবে বেশি অসুস্থ বা দুর্বলদের দুই চাকার ঠেলাগাড়ি বা পরিবারের সদস্য বা সহযাত্রীরা পালকিতে করে বয়ে নিয়ে যাচ্ছে। বাবার কাঁধে বসেছে ছোট বাচ্চারা, মেয়েদের কারও কারও পিঠে দুধের শিশুদের বেঁধে রাখা হয়েছে। বেশির ভাগই মেরেনকে চিনতে পেরে পাশ কাটানোর সময় ডেকে কথা বলল। মেরেন ক্যাম্বিসেস, আপনার উপর সকল দেবতার আশীর্বাদ বর্ষিত হোক। তিক্ত দুর্ভোগ থেকে আমাদের উদ্ধার করেছেন আপনি। আমাদের বাচ্চারা এবার মুক্ত হবে।
প্রজনন খোঁয়াড় থেকে ওদের উদ্ধার করা অল্পবয়সী মেয়েরা ফেন ও সিদুদুর সাথে বসে ওদের স্পর্শ করার চেষ্টা করছে। কেউ কেউ আবেগের আতিশয্যে ফুঁপিয়ে কাঁদছে। আমাদের অন্তিম পাহাড় থেকে উদ্ধার করেছ। দরদ ও সাহসের জন্যে আমরা তোমাদের ভালোবাসি। সিদুদু, তোমাকে ধন্যবাদ। তোমার উপর সকল দেবতার আশীর্বাদ বর্ষিত হোক, ফেন।
তাইতাকে চিনতে পারেনি কেউ, যদিও মেয়েরা কৌতূহলের সাথে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি ও চলাফেরার সময় কর্তৃত্বপূর্ণ উপস্থিতি সম্পন্ন এই তরুণকে দেখছে। ওদের এই আগ্রহ সম্পর্কে বেশ সজাগ ফেন, তো অধিকারের একটা ভাব নিয়ে ওর কাছে চলে এলো ও। এইসব ধীরতা ও ঘটনায় ওদের পাহাড়ের ওঠার গতি কমে এলো। চূড়ায় পৌঁছানোর আগেই ডুবে গেল সূর্য। আরও একবার কিতানগালে গ্যাপে এসে দাঁড়াল ওরা।
সীমান্ত দুর্গের প্রহরা মিনার থেকে ওদের আসতে দেখেছিল তিনাত। মই বেয়ে তরতর করে নেমে ওদের সাথে যোগ দিতে গেট দিয়ে দৌড়ে এলো। মেরেনকে স্যালুট করে ফেন ও সিদুদুকে আলিঙ্গন করল, তারপর তাইতার দিকে ফিরল। এই লোক কে? জিজ্ঞেস করল সে। ওকে বিশ্বাস করি না, কারণ বড় বেশি সুন্দর সে।
ওকে জানপ্রাণ দিয়ে বিশ্বাস করতে হবে, বলল মেরেন। সত্যি কথা হচ্ছে ওকে আগে থেকেই ভালো করে চেনো তুমি। পরে ব্যাখ্যা করব আমি, যদিও তখন আমার কথা বিশ্বাস করবে কিনা তাতে সন্দেহ আছে।
তুমি ওর পক্ষে সাক্ষী দিচ্ছ, কর্নেল মেরেন?
আমার গোটা অস্তিত্ব দিয়ে, বলল মেরেন।
আমিও আমার গোটা সত্তা দিয়ে, বলল ফেন।
আমিও, বলল হিলতো।
কাঁধ ঝাঁকিয়ে ভুরু কোঁচকাল তিনাত। দেখা যাচ্ছে এখানে আমি সংখ্যালঘু, কিন্তু তারপরও আমার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত তুলে রাখছি।
