ওকে ঠেলে সরিয়ে দিল তাইতা, গড়িয়ে গিয়ে জবাই করা শুয়োরের মতো নিথর পড়ে রইল সে। মুখ নিচের দিকে, নিজের রক্তের বিস্তারে পড়ে আছে। ড্যাগার ফেলে এক লাফে সোজা হয়ে দাঁড়াল সিদুদু। মৃত্যুপথযাত্রী অলিগার্কের দিকে তাকিয়ে আছে।
ওর পেছনে এসে দাঁড়াল মেরেন, এক হাতে কাঁধ জড়িয়ে ধরল। কাজ শেষ, বেশ ভালোভাবেই শেষ হয়েছে, মৃদু কণ্ঠে বলল ও। ওর জন্যে করুণা দেখানোর কোনওই প্রয়োজন নেই। এবার আমাদের যেতে হবে।
ঘোড়র কাছে দৌড়ে যাবার সময় পেছনে নদীর ঘাটে ওনকা বাহিনীর চিৎকার কানে এলো ওদের। ঘোড়ার পিঠে চেপেই পথরেখা বরাবার ছুটল ওরা, সবার সামনে তাইতা ও উইন্ডস্মোক। টিলার চূড়ায় উঠে সামনে ছাড়িয়ে থাকা মুক্ত ঘেসো প্রান্তরে দিকে তাকাল ওরা। দূরের নীলে আরেকটা পাহাড়সারির অস্তিত্ব দেখতে পেল। ওগুলোর চূড়া চিরুণীর কাটার মতো খাঁজকাটা, তীক্ষ্ণ।
তারই ছায়ায় একটা ফোকরের দিকে ইঙ্গিত করল সিদুদু। ওখনেই কিতানগুলে গ্যাপ, কর্নেল তিনাতের সাথে যেখানে দেখা করার কথা আমাদের।
কত দূর হতে পারে? মেরেন জিজ্ঞেস করল।
বিশ লীগ, একটু বেশিও হতে পারে, জবাব দিল সিদুদু। ঘুরে নদীর ঘাটের দিকে তাকাল ও।
সৈন্যদলের সামনে ঘোড়াকে আঘাত করে আগে বাড়ছে ওনকা। অলিগার্কের লাশ দেখে রাগে চিৎকার করে উঠল সে। আরও জোরে তেড়ে এলো।
বিশ লীগ! তার মানে সামনে বেশ ভালোই দাবড়ানি রয়েছে, বলল মেরেন।
ঘোড়াগালো ঢালের কাছে নিয়ে এলো ওরা, তারপর সবেগে সমতলের দিকে ছুট লাগাল। ওদের পেছনের পাহাড়ের কিনারা থেকে ওনকা-বাহিনী হাজির হতে হতে সমতলে পৌঁছে গেল। বুনো সমবেত চিৎকার ছেড়ে নিচে নামতে শুরু করল ওরা, ওনকার হেলমেটের অস্ট্রিচ পুম অন্যদের থেকে আলাদা করেছে তাকে।
এখানে সময় নষ্ট করার দরকার নেই, তাগিদ দিল তাইতা। চলো, সটকে পড়ি।
আধা লীগের মধ্যেই স্পষ্ট হয়ে গেল যে সিদুদুর বাচ্চা ঘোড়াটা বাকি ঘোড়ার সাথে তাল মিলিয়ে ছুটতে পারবে না। ফলে ওর গতির সাথে নিজেদের গতি সমন্বয় করতে বাধ্য হলো ওরা।
সাহস রাখ! জোরে বলল ফেন। আমরা তোমাকে ফেলে যাব না।
আমার ঘোড়াটা কাহিল হয়ে যাচ্ছে টের পাচ্ছি, কেঁদে বলল সিদুদু।
ভয় পেয়ো না, বলল মেরেন। ওটা লুটিয়ে পড়লেই তোমাকে আমার ঘোড়ার পেছনে তুলে নেব।
না! ফেনের ফিসফিসানিতে সহানুভূতি। তোমার ওজন অনেক বেশি, মেরেন। বাড়তি ওজন তোমার ঘোড়াটাকে মেরে ফেলবে। ওয়ার্লপুল আমাদের দুজনকেই বইতে পারবে। ওকে আমি নেব।
রেকাবের উপর সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে পেছনে তাকাল তাইতা। দ্রুত গতির ঘোড়াগুলো সামনে এগিয়ে যাওয়ায় ও ধীর গতির ঘোড়াগুলো পিছিয়ে পড়ায় ছড়িয়ে পড়ছে ধাওয়ার কাজটা। সামনের কাতারের তিন জাররিয় অশ্বারোহীর ভেতর ওনকার নকশাদার হেলমেটটা বেশি করে চোখে লাগছে। জোরে আগে বাড়ছে সে। ক্রমে মাঝখানের ফোকরটা কমিয়ে আনছে। উইন্ডস্মোককে আগে বাড়ার তাগিদ দিয়ে সামনের পাহড়সারির দিকে তাকাল তাইতা। এখন ফোকরটাকে ফুটিয়ে তোলা নচটা দেখতে পাচ্ছে। কিন্তু ওটা এত দূরে যে ওনকা ওদের ওপর চড়াও হওয়ার আগেই ওখানে পৌঁছতে পারার আশা করতে পারল না। পরক্ষণেই একটা কিছু ধরা পড়ল ওর চোখে। সামনের প্রান্তরের বুকে মলিন ধুলোর একটা আস্তরণ দেখা যাচ্ছে। দ্রুততর হয়ে উঠল ওর হৃৎপিণ্ডের গতি। বাগ মানানোর চেষ্টা করল ও। মিথ্যে আশার সময় নেই এখন। নিশ্চিতভাবেই ওটা গেযেল বা যেব্রার পাল ছিল। কথাটা ভাবতে ভাবতেই ধূলির মেঘের নিচে ধাতুর ওপর সুর্যের আলো ঠিকরে যেতে দেখল। সশস্ত্র লোকজন! বিড়বিড় করে বললও। তবে কি ওরা জাররিয়, নাকি রিইনফোর্সমেন্ট নিয়ে ফিরে আসছে হিলতো। স্থির করার আগেই পেছনে ক্ষীণ চিৎকার শোনা গেল। ওনকার কণ্ঠস্বর শনাক্ত করতে পারল ও।
তোকে দেখেছি, কুত্তী! ধরতে পারলে তোর জরায়ু বের করে আনব। তারপর পুড়িয়ে গলায় ঠেসে দেব।
ওসব কথা কানে নিয়ো না, সিদুদুকে তাগিদ দিল ফেন। কিন্তু অশ্রু গড়িয়ে নামতে লাগল সিদুদুর গাল বেয়ে। ওর টিউনিকের সামনের দিকটা ভিজিয়ে দিল।
ওকে ঘৃণা করি! বলল সে। মনপ্রাণে ঘৃণা করি।
পেছনে ওনকার কণ্ঠস্বর আরও পরিষ্কার ও কাছে এসে পড়েছে। চিৎকার করে অশ্রাব্য ভাষায় গালিগালাজ করছে।
প্রবল কান্নায় ভেঙে পড়ল সিদুদু।
ওর কথা শোনার দরকার নেই। কান বন্ধ করে রাখ, মনোযোগ অন্যদিকে সরাও। অনুরোধ করল মেরেন।
তুমি এসব কথা শোনার আগেই যদি মরে যেতাম, ফুঁপিয়ে উঠল সে।
এর কোনও অর্থ নেই, তোমাকে আমি ভালোবাসি। শুয়োরটাকে তোমার কোনওই ক্ষতি করতে দেব না।
ঠিক সেই মুহূর্তে সিদুদুর ঘোড়াটা লম্বা ঘাসের আড়ালে লুকানো একটা মংগুজ বারোতে সামনের বাম পা দিয়ে বসল। শুকনো ডালের মতো মড়াৎ করে ভেঙে গেল ওটার হাড়। ঘোড়ার মাথার সামনে দিয়ে উল্টে পড়ে গেল সিদুদু। নিমেষে মেরেন ও ফেন পাঁই করে ঘুরে ছুটে এলো ওর দিকে।
তৈরি হও, সিদুদু। তোমাকে তুলে নিচ্ছি, চিৎকার করে বলল ফেন। কিন্তু গড়িয়ে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে ধাওয়াকারীদের দিকে পেছন ফিরে তাকাল সিদুদু। এতক্ষণে ওকে অনুসরণকারীদের চেয়ে অনেক দূর আগে চলে এসেছে ওনকা। আগ্রহের সাথে সামনে ঝুঁকে আছে সে, পূর্ণ গতিতে ঘোড়া ছোটাচ্ছে, এগিয়ে আসছে সিদুদুর দিকে।
