চিৎকার ছেড়ে ইম্বালির দিকে তেড়ে এলো এক-তাকে অনুসরণরত সেনাটি। বর্শা ছুঁড়ে দিল নাকোন্তা। সৈনিকের ঠিক পিঠের মাঝখানে লাগল ওটা। জমে গেল সে। বুক থেকে এক হাত সমান উঁচু হয়ে বের হয়ে আছে বর্শাটা। তলোয়ার ফেলে স্যাডল থেকে খসে পড়ল সে। সময় মতোই শেষ সৈন্যটির পেছনে চলে এলো মেরেন। ওকে আসতে দেখে খাপ থেকে তলোয়ার বের করার চেষ্টা করল সে। কিন্তু ফলা বের করার আগেই লাফ দিয়ে উঠল মেরেন, পাঁজরে অস্ত্র চালিয়ে দিল। কাঁধ ও মাথার পেছনে ভর দিয়ে জমিন স্পর্শ করল সে। গলায় আরেকটা আঘাত হেনে খতম করে দিল তাকে। এবার আকেরের উদ্দেশে ধাওয়া করল। ওকে আসতে দেখল অলিগার্ক, ঘোড়ার পেটে স্পর দাবাল সে, পথরেখা বরাবর দূরে সরে গেল। মেরেন ও ইম্বালি পিছু ধাওয়া করল ওর, কিন্তু নাগাল পেল না।
উপর থেকে আকেরের সটকে পড়া দেখল তাইতা। পথ থেকে পাঁই করে ঘুরে মাথার উপরের ক্লিফের কিনারা বরাবর ঝেড়ে দৌড় লাগাল। ক্লিফের কিনারা থেকে লাফ দিয়ে নামতে থেমে তৈরি হলো। আকেরের ঘোড়া ওর নিচ দিয়ে ঝড়ের বেগে বের হয়ে যেতেই সজোরে অলিগার্কের পিঠের উপর নেমে এলো ও। ধাক্কার চোটে আকেরের হাতের লাগাম খসে গেল, স্যাডল থেকে প্রায় পড়ে যাবার দশা হলো তার। এক হাতে তার গলা পেঁচিয়ে ধরল তাইতা, ঝাঁকাতে শুরু করল তাকে। খাপ থেকে ড্যাগার বের করার প্রয়াস পেল আকের। কাঁধের উপর দিয়ে তাইতাকে আঘাত করতে চাইল। মুক্ত হাতে ওর কব্জি আঁকড়ে ধরল তাইতা। সুবিধা আদায়ের জন্যে যুঝতে লাগল ওরা।
পিঠের উপর বারবার ওজন বদলে যাওয়ায় ভারসাম্য হারিয়ে পথরেখার দেয়ালের সাথে বাড়ি খেল ঘোড়াটা, পেছনের দুই পা এক করে খাড়া হয়ে গেল। ওটার পাছার ওপর দিয়ে উড়ে নিচে পড়ল তাইতা ও আকের। ওরা জমিন স্পর্শ করার সময় আকের রইল ওপরে। তাইতার উপর শরীরের সমস্ত ভর চাপিয়ে দিল সে। পতনের ধাক্কায় আকেরের গলা ও অস্ত্র ধরা কব্জিটা আলগা হয়ে গেছে। সামলে নেওয়ার আগেই ঘুরল আকের, তাইতার গলায় ড্যাগার চালানোর চেষ্টা করল। ফের ওর কব্জি জাপ্টে ধরল তাইতা, ঠেকিয়ে রাখল তাকে। ড্যাগারের উপর শরীরের সমস্ত শক্তি চাপিয়ে দিল আকের। কিন্তু সফল হলো না। এখন তাইতার দেহে তরুণের অপার শক্তি, আর অনেক আগেই তারুণ্যের কাল পার হয়ে এসেছে আকের। প্রবল চাপে আকেরের হাত কাঁপতে শুরু করল। ভয়ের ছাপ পড়ল তার চোখে মুখে। ওর দিকে তাকিয়ে হাসল তাইতা। ইয়োস শেষ হয়ে গেছে, বলল ও। শিউরে উঠল আকের। হাত খসে গেল তার। গড়িয়ে তার উপরে উঠে এলো তাইতা।
মিথ্যা বলছ, চিৎকার করে উঠল আকের। উনি দেবী, একমাত্র সত্য দেবী।
তাহলে তোমার একমাত্র সত্যি দেবীকে আহ্বান জানাও এখন, লর্ড আকের। ওকে বলো গালালার তাই তোমাকে খুন করতে যাচ্ছে।
ভয় আর উদ্বেগে বিস্ফোরিত হলো আকেরের চোখ। আবার মিথ্যা বলছ, ঢোক গিলল সে। তুমি তাইতা নও। তাইতা বুড়ো মানুষ, এতক্ষণে তার পটল তোলার কথা।
তোমার ভুল হয়েছে। পটল তুলেছে ইয়োস, এবার তোমারও একই দশা হতে চলেছে। হাসি মুখেই আকেরের কব্জির উপর চাপ বাড়াল তাইতা, হাড়ের ভাঙনের শব্দ না শোনা পর্যন্ত চালিয়ে গেল ও। চিৎকার করে উঠল আকের, আঙুলের ফাঁক গলে ড্যাগার খসে পড়ল। উঠে বসল তাইতা, পাক খেতে শুরু করল, এমনভাবে ঘোরাতে লাগল তাকে যে অসহায় হয়ে গেল সে।
ঠিক সেই মুহূর্তে দৌড়ে এলো মেরেন। ব্যাটাকে শেষ করে দেব?
না, ওকে থামাল তাইতা। সিদুদু কোথায়? ওর বিরুদ্ধেই সবচেয়ে বেশি পাপ করেছে সে। ক্লিফের চূড়া থেকে নেমে আসা পথ ধরে মেয়েদের দৌড়ে আসতে দেখল ও। তাইতা যেখানে আকেরকে গেঁথে রেখেছে সেখানে চলে এলো ওরা।
তাইতা, আমাদের পালাতে হবে! লোকজন যোগাড় করে তীরের ওপাশ থেকে তেড়ে আসছে ওনকা! চিৎকার করে বলল ফেন। শুয়োরটাকে শেষ করে চলো চলে যাই।
ওকে পাশ কাটিয়ে সিদুদুর দিকে তাকাল তাইতা। এই লোকই তোমাকে ওনকার হাতে তুলে দিয়েছিল, ওকে বলল ও। তোমার বন্ধুদেরও পাহাড়ে পাঠিয়েছে। এবার তোমার বদলা নেওয়ার পালা।
দ্বিধা করল সিদুদু।
এই ড্যাগারটা নাও, আকেরের পড়ে যাওয়া অস্ত্র তুলে ওর হাতে তুলে দিল মেরেন।
দৌড়ে এসে আকেরের মাথা থেকে হেলমেট খুলে নিল ফেন। দুই হাতে মাথার চুল মুঠি করে ধরে উল্টোদিকে মাথা ঘুরিয়ে গলা উন্মুক্ত করে দিল। তোমার ও পাহাড়ে পাঠানো সব মেয়েদের পক্ষে, চিৎকার করে বলল ও। গলাটা ফাঁক করে দাও, সিদুদু।
প্রতিজ্ঞায় কঠিন হয়ে উঠল সিদুদুর অভিব্যক্তি।
ওর চোখে মরণ দেখতে পেল আকের, নিজেকে বাঁচাতে যুঝতে লাগল সে, ফিসফিস করে বলল, না! দয়া করে আমার কথা শোনো। তুমি ছোট্ট বাচ্চা। এমন একটা জঘন্য কাজ জীবনভর যন্ত্রণা দেবে তোমাকে। কণ্ঠস্বর ভেঙে গেল, প্রায় ছন্দহীন। তুমি বুঝতে পারছ না, দেবী আমাকে পাপমুক্ত করেছেন। তার নির্দেশ মানতে হয়েছে আমাকে। আমাকে এমন কিছু করতে পারো না তুমি।
বুঝতে পেরেছি, জবাব দিল সিদুদু, কাজটা আমি করতে পারব। ওর কাছে এসে থামল ও। আর্তনাদ করতে লাগল আকের। ঠিক কানের নিচে গলার টানটান চামড়ার উপর ড্যাগারের ডগা বসাল সিদুদু, তারপর গভীর দীর্ঘ একটা পোচ দিল। মাংস ফাঁক হয়ে গেল, ক্ষতস্থানের গভীরে মহাধমনী ফেটে গেল। দ্বিখণ্ডিত শ্বাসনালীর ভেতর থেকে মরণ চিৎকার বের হয়ে এলো। খিচুনির ভঙ্গিতে দাপাতে লাগল তার দুই পা। কোটরের ভেতর পাক খাচ্ছে চোখজোড়া। জিভ বের হয়ে এসেছে, রক্ত-ভেজা লালা ও থুতু বের করছে সে।
