এবার উরুতে একটা হাড়ের মতো কাঁটা বিঁধে যাওয়া টের পেল তাইতা, যন্ত্রণায় চিৎকার করে উঠল ও। জানে কীসে আঘাত করেছে ওকে। যৌন ছিদ্রের দুপাশে খাট ও মোটা লেজের নিচের দিকে ভয়ঙ্কর একজোড়া থাবা থাকে পাইথনের। সঙ্গীকে আঁকড়ে ধরতে ব্যবহার করে থাকে ওগুলো। এই হুক দিয়ে শিকারও পাকড়াও করে। কুণ্ডলীর জন্যে এক ধরনের গোজের কাজ দেয় ওগুলো, শক্তি বাড়িয়ে তোলে বহুগুন। মরিয়া হয়ে পা আলগা করে নেওয়ার চেষ্টা করল তাইতা। কিন্তু হুকগুলো ওর মাংসে গেঁথে গেছে। তেলতেলে প্রথম কুণ্ডলীটা পাচাতে শুরু করল ওকে।
মেরেন! আবার চিৎকার করল। ও। কিন্তু দুর্বল ওর কণ্ঠস্বর, আরেকটা কুণ্ডলী চেপে বসল। আবার মেরেনকে ডাকার চেষ্টা করল ও। কিন্তু হুশ করে ওর বুকের সব বাতাস বের হয়ে গেল। দুমড়ে গেল পাঁজর।
সহসা মেরেন এসে হাজির হলো তাঁবুর মুখে। এক মুহূর্ত থেমে সাপটার ফুটকিঅলা শরীরের অর্থ পুরোপুরি বুঝে নিল। পরক্ষণে এক লাফে সামনে বাড়ল। পিঠে ঝোলানো খাপ থেকে তলোয়ার বের করতে মাথার উপর হাত বাড়িয়ে দিল। তাইতার চোট পাওয়ার ঝুঁকি থাকায় ওটার মাথা লক্ষ্য করে আঘাত করার সহস করল না। তো আক্রমণের কোণ বদলাতে নাচের ভঙ্গিতে একপাশে সরে গেল। পাইথনের নিক্ষিপ্ত মাথা এখনও শিকারের দিকে ব্যস্ত। কিন্তু তাইতার পায়ের আরও গভীরে হুক বিধানোর জন্যে খাট লেজটা স্থির করে রেখেছে। তলোয়ারের ফলার ঝিলিকে সাপটার হুকের উপরের লেজের দৃশ্যমান অংশ আলগা করে নিল মেরেন। তাইতার পায়ের সমান লম্বা একটা অংশ, ওর উরুর মতোই পুরু।
শরীরের ওপরের অংশটুকু প্রায় তাবুর সমান উঁচু করে ফেলল পাইথন। বিশাল হাঁ হলো ওটার মুখ, মেরেনের উপর ঝুলে থাকার সময় ঝিলিক দিয়ে উঠল ওটার নেকড়েসুলভ দাঁতগুলো। অবশিষ্ট চোখে ওকে জরিপ করার সময় এপাশ ওপাশ দোল খেয়ে চলল ওটার মাথা। কিন্তু আঘাতের ফলে মেরুদণ্ডের হাড় ভেঙে যাওয়ায় থমকে গেছে ওটা। তলোয়ার উঁচু করে ওটার মুখোমুখি দাঁড়াল মেরেন। সামনে ছুটে এসে ওর মুখ লক্ষ্য করে আক্রমণ চালাল সাপটা। কিন্তু তৈরি ছিল মেরেন, হাওয়ায় গুঞ্জন তুলল ওর তলোয়ার। পরিষ্কার সাপের গলায় ঢুকে গেল উজ্জ্বল ফলাটা। লুটিয়ে পড়ল মাথাটা। পাক খেয়ে চলল মুণ্ডহীন জানোয়ারটা, ওদিকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে খিচুনি খাওয়ার মতো ফাঁক হয়ে গেল ওটার চোয়াল। লাথি মেরে ওটার শিথিল হয়ে আসা কুণ্ডলীর ভেতর দিয়ে আগে বাড়ল মেরেন, তাইতার বাহু আঁকড়ে ধরল। ওর কব্জিতে সাপের দাঁতের তৈরি ফুটো থেকে রক্ত ঝরছে। তাইতাকে মাথার উপর উঁচু করে ধরে তাঁবুর বাইরে নিয়ে এলো ও।
দিমিতার! দিমিতারকে বাঁচাতেই হবে! হাঁপাতে হাঁপাতে বলল তাইতা। আবার দৌড়ে গেল মেরেন। আঘাত হানতে লাগল মুণ্ডহীন সাপের গায়ে। দিমিতারের পড়ে থাকার জায়গায় যাবার পথ তৈরির প্রয়াস পাচ্ছে। অবশেষে শোরগোলে সচেতন হয়ে অন্য ভৃত্যরাও দৌড়ে এলো। ওদের ভেতর সবচেয়ে সাহসীজন মেরেনকে অনুসরণ করে তাঁবুতে ঢুকল, সাপটাকে টেনে একপাশে সরিয়ে মুক্ত করল দিমিতারকে। অচেতন হয়ে আছেন তিনি, দরদর করে রক্ত বের হয়ে আসছে কাঁধের ক্ষতস্থান থেকে।
নিজের ক্ষত উপেক্ষা করে দ্রুত কাজে নামল তাইতা। বুড়ো মানুষটার বুক ক্ষতবিক্ষত, ক্ষতে ভরা। বুকে হাত বুলিয়ে অন্তত দুটি হাড় ভাঙার ব্যাপারে নিশ্চিত হলো ও, কিন্তু সবার আগে ওর কাঁধের ক্ষতের রক্তক্ষরণ বন্ধ করাই জরুরি। ব্যথায় জ্ঞান ফিরে এল দিমিতারের। তাঁবুর এক কোণে রাখা কাসারিতে জ্বলন্ত আগুনে মেরেনের ড্যাগারের ডগা তাতিয়ে কামড়ের জায়গাগুলো পরিষ্কার করার সময় ওকে ভুলিয়ে রাখার চেষ্টা করল তাইতা।
সাপের কামড় বিষাক্ত নয়। এটা অন্তত ভাগ্যের ব্যাপার, দিমিতারকে বলল।
হয়তো এই একটা ব্যাপারই আছে, ব্যথায় আড়ষ্ট দিমিতারের কণ্ঠস্বর। ওই সাপটা স্বাভাবিক নয়, তাইতা। শূন্যতা থেকে পাঠানো হয়েছে ওটাকে।
এ-কথার বিরোধিতার করার মতো স্বস্তিদায়ক কোনও যুক্তি খুঁজে পেল না তাইতা, তবে বুড়ো মানুষটার হতাশাকে প্রশ্রয় দিতে চাইল না ও। আরে, রাখুন, পুরোনো বন্ধু, বলল ও। এমন কিছু খারাপ হয়নি যাকে দুশ্চিন্তা করে আরও খারাপ করে তুলতে হবে। আমরা দুজনই বেঁচে আছি। ইয়োসের একটা যন্ত্র না হয়ে সাপটা স্বাভাবিকও হয়ে থাকতে পারে।
আগে কখনও মিশরে এমন প্রাণীর কথা শুনেছেন? জানতে চাইলেন দিমিতার।
দক্ষিণের দেশে এদের দেখেছি, প্রশ্নটা এড়িয়ে গেল তাইতা।
দক্ষিণে, অনেক দূরে?
হ্যাঁ, সত্যি, স্বীকার গেল তাইতা। এশিয়ার সিন্ধু নদেরও ওধারে, নীল নদ যেখানে দুটো ধারায় ভাগ হয়ে গেছে, তারও দক্ষিণে।
সব সময়ই গভীর জঙ্গলে, নাছোড়বান্দা দিমিতার। মরুভূমিতে কোনও সময়ই না? এত বিরাট তো নয়ই?
যা বলেন, হার মানল তাইতা।
আমাকে মারতেই পাঠানো হয়েছে ওটাকে, আপনাকে নয়। আপনার মৃত্যু চায় সে-এখনই না, চূড়ান্ত সুরে বললেন দিমিতার।
নীরবে পরীক্ষা চালিয়ে গেল তাইতা। দিমিতারের কোনও গুরুত্বপূর্ণ হাড় ভাঙেনি দেখে স্বস্তি বোধ করল। পাতন করা মদে ওর কাঁধ ধুয়ে ক্ষতস্থান মলমে ঢেকে লিনেনের ফিতেয় ব্যান্ডেজ দিয়ে বেঁধে দিল ও। তারপরই কেবল নিজের ক্ষতের দিকে নজর দেওয়ার অবকাশ মিলল।
