ওই যে ওনকা, ফিসফিস করে হিংস্র কণ্ঠে বলল সিদুদু। ওহ, ওই চেহারা আমার চেনা আছে।
তোমার মনের ভাব বুঝতে পারছি, পাল্টা ফিসফিস করে বলল ফেন। প্রথম সুযোগেই ওর সাথে ফয়সালা করব আমরা।
আমি সেই প্রার্থনাই করছি।
ওই যে আকের, আর ওর সাথে ওটা এক-তাঙ, ওদের দেখিয়ে বলল তাইতা। অন্যদের চেয়ে খানিকটা তফাতে দাঁড়িয়ে আছে দুই অলিগার্ক। সকালের ঠাণ্ডা হাওয়ায় ধূমায়িত বাটি থেকে খাচ্ছে। নিজেদের সামলাতে পারেনি। রেজিমেন্টের অনেক সামনে এসে পড়েছে। অচিরেই নদী পেরুতে শুরু করবে। আর সেটা করলেই সুযোগ মিলে যাবে আমাদের। যদি না পেরোয়, হিলতো যতক্ষণ আমাদের জন্যে রিইনফোর্সমেন্ট নিয়ে না ফিরছে ওদের পিছে ছায়ার মতো লেগে থাকব।
এখান থেকেই আকেরের বুকে তীর সেঁধিয়ে দিতে পারি আমি, চোখ সরু করে বলল ফেন।
অনেক লম্বা পাল্লা, সকালের হাওয়া সাধারণত বেইমানি করে, প্রিয়া আমার। ওর বাহুতে হাত রেখে ওকে বিরত রাখল তাইতা। সতর্ক করে দিলে সুবিধাটা ওদের হাতে চলে যাবে। চারজন লোককে বাছাই করে ওনকা ওদের সংক্ষেপে হুকুম দেওয়ার সময় চোখ রাখল ওরা। নদীর ঘাটের দিকে ইঙ্গিত করে কথা বলছে। সে। যার যার ঘোড়ার দিকে দৌড়ে গেল লোকগুলো, চেপে বসল পিঠে, তারপর দুলকি চালে নদীর কাছে এসে ঝাঁপিয়ে পড়ল। ইশারায় মেরেনকে ওদের কর্মকাণ্ডের কথা জানাল তাই।
চারটে ঘোড়া সঁতরে নদীর মাঝামাঝি আসার আগে স্রোতের বিরুদ্ধে লড়াই করছিল, পায়ের নিচে মাটির দেখা মিলতেই লাফিয়ে সামনে ছুটে এলো ওগুলো। পানি ছেড়ে উঠে এলো। পশম আর সরঞ্জাম থেকে পানি ঝরছে। সাবধানে আশপাশে নজর চালাল স্কাউটরা, তারপর সংকীর্ণ পথরেখা ধরে আগে বাড়ল। গা ঢাকা দিয়ে রইল মেরেন ও ওর লোকজন। যেতে দিল ওদের। নদীর ওপাড়ে তিনটা সারিতে দাঁড় করানো হয়েছে ওনকার বাকি লোকজনকে। যার যার ঘোড়ার মাথার কাছে দাঁড়িয়ে রয়েছে ওরা। অপেক্ষা করছে।
অবশেষে খুরের খটাখট শব্দ শোনা গেল, স্কাউটদের একজন পথরেখা ধরে ছুটে এসে দৌড়ে গেল নদীর পাড়ের দিকে। ওখানে থেমে মাথার ওপর হাত নেড়ে ইশারা করতে লাগল। এখানে সব পরিষ্কার! চিৎকার করে বলল সে। লোকজনকে চেঁচিয়ে হুকুম দিল ওনকা। ঘোড়ার পিঠে উঠে এক সারিতে নদীর ঘাটের দিকে এগোতে শুরু করল ওরা। পেছনের প্রহরীদের সাথে রয়ে গেল ওনকা, ওখান থেকে নদী পারাপার ভালো করে নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে। কিন্তু আকের ও এক-তাকে সামনের কাতারে দেখে অবাক হলো তাই। এটা আশা করেনি। ভেবেছিল কলামের মাঝখানে অবস্থান নেবে ওরা, যেখানে চারপাশের লোকদের প্রতিরক্ষার ভেতরে থাকতে পারবে।
ওদের কায়দামতো পেয়ে গেছি মনে হয়। উত্তেজনায় কঠিন ওর কণ্ঠস্বর। মেরেনকে তৈরি হতে ইঙ্গিত করল ও। কলামের মাথায় দুজন অলিগার্ক ঘোড়ার পেটে স্পর দাবিয়ে পানিতে নেমে এলো। মাঝামাঝি এসে সাঁতার কাটতে শুরু করল ওরা। স্রোতের ধাক্কায় ভাটির দিকে সরে যাওয়া সারিটা শক্ত গঠন ধরে রাখতে পারল না।
তৈরি হও! মেয়ে দুটোকে সতর্ক করল তাইতা। অলিগার্ক ও ওদের পেছনের তিন ঘঘাড়সওয়ারকে তীরে পৌঁছতে দাও, তারপর আর কেউ অনুসরণ করার চেষ্টা করলেই তীর ছুঁড়বে। অন্তত কিছু সময়ের জন্যে, ওনকা ওর লোকজনকে ফের ভাগ করার আগেই আমরা অলিগার্কদের মূল দল থেকে আলাদা করে ফেলতে পারব, আমাদের দয়ার পাত্রে পরিণত হবে ওরা।
স্রোত বেশ শক্তিশালী, কলামের মাঝখানে বেশ বড় একটা ফোকর তৈরি হয়েছে।
তোমাদের তীর তৈরি করো! শান্ত কণ্ঠে নির্দেশ দিল তাইতা। পিঠের তুনের দিকে হাত বাড়াল মেয়েরা। আকেরের ঘোড়া জমিনের স্পর্শ পেতেই হাঁচড়ে পাছড়ে তীরে উঠে এলো। এবার সারিতে একটা ফোকর তৈরি হলো। কলামের অবশিষ্ট অংশ এখনও নদীর ওপারে বিক্ষিপ্ত অবস্থায় রয়েছে।
এইবার! চিৎকার করে উঠল তাইতা। সামনে যারা আছে তাদের পেছনের ঘোড়াসওয়ারদের উদ্দেশে তীর ছোড়ো!
লাফিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়াল ফেন ও সিদুদু, দীর্ঘ বাঁকানো তীর বের করে আনল। অল্প পাল্লার লক্ষ্য, পয়েন্ট-ব্লাঙ্কই বলা চলে। ছিলায় ঢিল দিল ওরা, দুটি তীর নীরবে উড়ে গেল নিচের দিকে। দুটোই লক্ষ্য ভেদ করল। জিনের উপর পাক খেল এক সৈনিক, শাবাকোর ফ্লিন্টের তীরে ফলা পেটে বিধতেই আর্তচিৎকার করে উঠল। গলায় ফেনের তীর গ্রহণ করল তার পেছনের লোকটা। দুই হাত মাথার উপরে তুলে উল্টে জলে পড়ে গেল। লুটিয়ে পড়ল তার ঘোড়া, ওদের পেছন পেছন আসতে থাকা অন্য ঘোড়াগুলোর সাথে সংঘর্ষ বাধল। কলামের বাকি অংশকে একেবারে বিভ্রান্তিতে ফেলে দিল। ঘোড়র পেটে স্পর দাবিয়ে পথরেখায় চলে এলো আকের ও এক-তাঙ।
ওহ, হ্যাঁ, দারুণ প্র্যাকটিস। মেয়েদের তারিফ করল তাইতা। আমি পালানোর নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত ওদের পেছনে লেগে থাকো। ওদের রেখে পথ ধরে দৌড়ে পথরেখায় নেমে এলো ও।
অলিগার্কদের পথরেখার মুখে ঢুকতে দিল মেরেন, তারপর অন্য দুই শিলুক আর ও পেছনের ঝোঁপ থেকে লাফিয়ে বের হয়ে এলো। এক-তাঙয়ের দিকে দৌড় লাগাল ইম্বালি, কুড়াল চালাল। একটা মাত্র কোপে অলিগার্কের বাম পা হাঁটুর উপর থেকে আলগা করে ফেলল। আর্তনাদ করে উঠল এক-তাঙ, ঘোড়াকে সামনে বাড়ার তাগিদ দিল। কিন্তু একটা পা খোয়া যাওয়ায় ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেছে। ঘোড়ার কেশর আঁকড়ে ধরে নিজেকে বাঁচানোর চেষ্টা করতে করতে একপাশ থেকে খসে পড়ল। পায়ের কাটা জায়গা থেকে ধমনীর উজ্জ্বল রক্ত ছলকে ছলকে বের হচ্ছে। ওর দিকে তেড়ে গিয়ে ফের কুড়োল চালাল ইম্বালি। এক-তাঙয়ের মুণ্ডটা ধড় থেকে লাফ দিয়ে পাথুরে পথে গাড়গাড়ি খেতে লাগল। সাড়াবিহীন আঙুলগুলো আরও খানিকক্ষণ ঘোড়ার কেশর আঁকড়ে থাকল, তারপর মুক্ত হয়ে গেল। জমিনে কাত হয়ে লুটিয়ে পড়ল সে।
