এমন একটা জায়গা চিনি, মেরেনের কথা শেষ হতেই বলল সিদুদু।
তুমি আসলেই বেশ চালাক, গর্বের সাথে ওকে বলল মেরেন। মুহূর্তের জন্যে পরস্পরের মাঝে হারিয়ে গেল ওরা।
তাহলে চলো, সিদুদু, বলল তাইতা। দেখাও মেরেনের কথা মতো সত্যিই চালাক কিনা তুমি।
ওদের পথ দেখাল সিদুদু, পথ ছেড়ে দক্ষিণ আকাশের একটা বিরাট তারাময় ক্রসের দিকে নিয়ে চলল। ঘণ্টাখানেকের ভেতর একটা নিচু গাছপালায় ভরা টিলার উপর লাগাম টেনে ধরল সে। চাঁদের আলোয় ওদের সামনে উন্মুক্ত উপত্যকার দিকে আঙুল তুলে ইঙ্গিত করল।
ওই দেখা যায় ইশাসা নদীর ঘাট। জলের ঝিকিমিকি দেখতে পাচ্ছেন আপনারা। কিতানগালে গ্যাপে পৌঁছাতে লর্ড আকেরের বেছে নেওয়া পথ ওদিক থেকে বাঁক নিয়েছে। পানি গম্ভীর হওয়ায় ঘোড়াগুলোকে সাঁতার কাটতে হবে। ক্লিফের চূড়া থেকে ওরা পানিতে নামার পর ওদের লক্ষ্য করে তীর আর পাথর ছুঁড়ে মারতে পারব আমরা। আরেকটা ঘাটে পৌঁছাতে ভাটির দিকে অন্তত পঞ্চাশ লীগ যেতে হবে ওদের।
সাবধানে নদীর ঘাট জরিপ করে মাথা দোলাল তাইতা। এর চেয়ে ভালো জায়গা পাওয়ার ব্যাপারে আমার সন্দেহ আছে।
আগেই বলেছিলাম, বলল মেরেন। ভালো জায়গা চেনার মতো যোদ্ধার চোখ আছে ওর।
সিদুদু, সাথে তীর ধনুক রাখো, মাথা দুলিয়ে সিদুদুর কাঁধে ঝোলানো অস্ত্রের দিকে ইঙ্গিত করে বলল তাইতা। ব্যবহার জানো?
ফেন শিখিয়েছে, সহজ কণ্ঠে উত্তর দিল সিদুদু।
আপনার অনুপস্থিতিতে দক্ষ তীরন্দাজে পরিণত হয়েছে সিদুদু, নিশ্চিত করল মেরেন।
নদীর তীর ধরে ঘোড়াকে সাঁতরে নিয়ে এগোল ওরা, স্রোত বেশ খর। পুব পাড়ে পৌঁছে দেখল পথটা ক্লিফের ভেতর দিয়ে একটা সংকীর্ণ পাথুরে রেখা ধরে এগিয়েছে। কেবল এক সারিতে ঘোড়ার পক্ষে ওদিকে যাওয়া সম্ভব। ওটার উপরে উঠে গেল মেরেন ও তাইতা, তারপর ওখান থেকে নিচের জমিন নিরীখ করল।
হ্যাঁ, বলল তাইতা। কাজ হবে।
ওদের বিশ্রামের অনুমতি দেওয়ার আগে অ্যাম্বুশ পাতার পরিকল্পনা খতিয়ে দেখল ও, প্রত্যেককে নির্ধারিত ভূমিকা পুনরাবৃত্তি করতে বলল। কেবল তারপরই ঘোড়ার পিঠ থেকে জিন-লাগাম খসানোর অনুমতি দিল ওদের। ঘেঁতলানো ধুরা খাবারে ওগুলোর নাকের থলে ভরে ছেড়ে দিতে বলল।
বিনা আগুনের শিবির, কারণ আগুন জ্বালানোর অনুমতি দিতে রাজি হয়নি তাইতা। ধুরা পিঠা ও ভয়াবহ ঝাল মরিচে ভেজানো ঠাণ্ডা ছাগলের মাংসের রোস্ট খেল ওরা। খাওয়া শেষ হতেই বর্শা তুলে নিয়ে রাস্তায় পাহারা দিতে এগিয়ে গেল নাকোন্তো। ওকে অনুসরণ করল ইম্বালি।
এখন ওর মেয়েমানুষ সে, ফিসফিস করে তাইতাকে বলল ফেন।
তাতে অবাক হওয়ার কিছু নেই, তবে অন্তত একটা চোখ পথের দিকে রাখার ব্যাপারে ওর উপর বিশ্বাস রাখতে হবে আমাকে, শুষ্ক কণ্ঠে বলল তাইতা।
ওরা প্রেমে পড়েছে, বলল ফেন। ম্যাগাস, তোমার মনে কোনও প্রেম ভালোবাসা নেই। ওয়ার্লউইন্ডের পিঠ থেকে বিছানাপত্র নামাতে চলে গেল ও। অন্যদের থেকে বেশ দূরে একটা পাথুরে আউটপের ছায়ায় শোয়ার মতো একটা জায়গা বেছে নিল ও। তারপর একটা পশমের কারোসের সাথে জমিনে বিছাল মাদুরটা।
তারপর তাইতার কাছে ফিরে এলো ও। এসো। হাত ধরে মাদুরের কাছে নিয়ে গেল ওকে, টিউনিক খুলতে সাহায্য করল, ওটাকে গোল করে নাকের কাছে ধরল। বেশ জোরাল গন্ধ, মন্তব্য করল ও। সুযোগ পেলেই ধুয়ে দেব। মাদুরের উপর ওর পাশে হাঁটু গেড়ে বসল। কারোস দিয়ে ঢেকে দিল ওকে। এবার নিজের টিউনিকও খুলে ফেলল। কারোসের নিচে ওর পাশে শুয়ে পড়ল ও। ওর শরীরে শরীর ঠেকাল।
তুমি ফিরে আসায় দারুণ খুশি হয়েছি, ফিসফিস করে বলল ও, দীর্ঘশ্বাস ফেলল। খানিক পরে নড়ে উঠল ও, ফিসফিস করে বলল, তাইতা।
কী?
আমাদের সাথে ছোট এক আগম্ভক রয়েছে।
এখন তোমাকে ঘুমাতে হবে। খানিক পরেই ভোর হয়ে যাবে।
একটু পরেই ঘুমাচ্ছি, অনেকক্ষণ চুপ করে থাকল ও, এই সময় তাইতার সতর্ক হয়ে ওঠা শরীরে তল্লাশি চালাল ও। তারপর মৃদু কণ্ঠে বলল, তাইতা, কোত্থেকে এলো ওটা? কেমন করে ঘটল?
অলৌকিকভাবে। ঠিক যেভাবে আমার চেহারা বদলে গেছে। সব পরে খুলে বলব। এখন ঘুমাতে হবে। তোমাদের পরিচিত হয়ে ওঠার আরও অনেক সময় মিলবে।
ঘুমে ঢলে পড়ল ফেন। কিন্তু তাইতার আরও খানিকটা বেশি সময় লাগল।
মনে হলো যেন কয়েক মিনিটও কাটেনি, ওকে জাগিয়ে তুলল নাকোন্তা। কী ব্যাপার? উঠে বসল তাই।
পশ্চিম থেকে ঘোড়সওয়ারের দল আসছে।
নদী পেরিয়েছে ওরা?
না। ওপাড়ে থেমেছে। মনে হয় এমনি অন্ধকারে নদী পেরুনোর ইচ্ছে নেই।
অন্যদের জাগিয়ে দাও, স্যাডল চাপাও ঘোড়ার পিঠে, তবে সবকিছু করবে চুপচাপ। নির্দেশ দিল তাইতা।
ভোরের ক্ষীণ ঝিলিক দেখা দিতেই ঘাটের ঠিক উপরে ক্লিফের কিনারায় উপুড় হয়ে শুয়ে পড়ল তাইতা। মেয়ে দুটো রয়েছে ওর দুপাশে। নদীর অন্য পাড়ে জাররিয় শিবিরে ব্যস্ততা চোখে পড়ছে। পাহারা দেওয়ার আগুনে লাকড়ি দিচ্ছে সৈনিকরা। মাংস পোড়া গন্ধ ভেসে আসছে ওদের তিনজনের দিকে। লোক সংখ্যা গোণার মতো যথেষ্ট অলো ফুটেছে এখন। মোটামুটি তিরিশ জন সৈনিক শুনল তাইতা। রান্নার আগুনের কাছে রয়েছে কয়েকজন, অন্যরা আস্তবলের কাছে ঘোড়ার যত্ন নিচ্ছে। আরও কয়েক জন ঝোপে-ঝাড়ে যার যার ব্যক্তিগত কাজে ব্যস্ত। অচিরেই ওদের চেহারা বোঝার মতো যথেষ্ট ফর্শা হয়ে এলো চারপাশ।
