ধূসর কোল্ট হাঁকাচ্ছে ফেন, পেছনে লাগাম ধরে টেনে নিয়ে আসছে উইন্ডস্মোককে। ওর ডান পাশে রয়েছে হিলতো। খুব কাছ থেকে ওদের অনুসরণ করছে নাকোন্তো ও ইম্বালি-ও দূরে থাকার মাসগুলোতে অনেক কায়দা কানুন শিখে নিয়েছে ওরা। যেখানে বসে ছিল সেই চাতাল ছেড়ে বেরিয়ে এসে ক্লিফ বেয়ে নামতে শুরু করল তাইতাতো। এক লাফে শেষ ফাঁকা জায়গাটা থেকে নেমে এলো ও। লাল জোব্বাটা ডানার মতো খুলে গেল চারপাশে। কিন্তু চামড়ার হেলমেটের ভাইজর আড়াল করে রেখেছে ওর চেহারার উপরের অংশ। ঠিক মেরেনের পথের উপরই নেমে এসেছে ও।
জাররিয় ইউনিফর্ম দেখে প্রশিক্ষিত যোদ্ধার রিফ্লেক্সে ভয়াল চিৎকার ছেড়ে ওর দিকে তেড়ে এলো মেরেন। তলোয়ার বের করে হাওয়ায় দোলাচ্ছে। কোনওমতে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে নিজের অস্ত্র বের করার মতো সামান্য সময়টুকুই পেল তাই। স্যাডল থেকে সামনে ঝুঁকে ওর মাথা বরাবর তলোয়ার চালাল মেরেন। তলোয়ারের ফলায় আঘাত ঠেকিয়ে এক পাশে সরে গেল তাইতা। লাগাম টেনে ঘোড়াটাকে প্রায় মাটির সাথে মিশিয়ে দিয়ে ঘুরিয়ে নিল মেরেন। ফের তেড়ে এলো ওর দিকে। মাথা থেকে হেলমেট ছিঁড়ে একপাশে ছুঁড়ে ফেলল তাইতা। মেরেন! আমি তাইতা, চিৎকার করে বলল ও।
মিথ্যা কথা! ম্যাগাসের সাথে তোমার কোনও মিলই নেই! গতি থামাল না মেরেন। স্যাডল থেকে সামনে ঝুঁকে তলোয়ারের ফলা নিশানা করল। তাইতার বুক বরাবর স্থির হয়ে আছে ওটা। শেষ মুহূর্তে বাউলি কেটে সরে গলে তাইতা, ওকে পাশ কাটিয়ে যাবার সময় মেরেনের তলোয়ারের ফলা ওর কাঁধে আঁচড় বসিয়ে গেল।
ফেন সামনের দিকে ধেয়ে যাবার সময় ওর উদ্দেশে চিৎকার করল তাইতা, ফেন! আমি তাই।
না, না! তুমি তাইতা নও! ওর কী করেছ? পাল্টা আর্তনাদ করল ফেন। ওদিকে নিজের ঘোড়া ঠিক করে নিচ্ছে মেরেন। আবার হামলা শানাতে মাথা ঘুরিয়ে নিচ্ছে ওটার। কাঁধের উপর বর্শা ফেলে রেখেছে নাকোন্তো, মেরেনের উপর দিয়ে ছোঁড়ার সুযোগপাওয়া মাত্রই ছুঁড়ে দিতে তৈরি। ঘোড়ার পিঠ থেকে লাফিয়ে নামল ইম্বালি, সামনে তেড়ে আসার সময় সবেগে হাঁকাতে লাগল যুদ্ধ কুড়োলটা। তলোয়ার বের করে তেড়ে এলো হিলতো। যার যার তুনে তীর সাজাচ্ছে ফেন ও সিদুদু।
রাগে রুবি পাথরের মতো চকচক করছে ফেনের চোখ। ওকে শেষ করে দিয়েছ তুমি, শয়তান! চিৎকার করে উঠল ফেন। তোমার কুৎসিত হৃৎপিণ্ডে একটা তীর পাঠিয়ে দেওয়া হবে।
ফেন! আমার আত্মার চিহ্ন দেখ! তেনমাস ভাষায় তাগিদের সুরে বলে উঠল তাইতা। ঝট করে চিবুক উঠে এলো ফেনের। তারপরই তাইতার মাথার উপর আহত বাজপাখী উড়ে বেড়াতে দেখল ও। প্রবল ধাক্কায় হেঁচকি খেল। না! না! এটা ওই! তাইতা! আমি বলছি তলোয়ার সামলে রাখ! রেখে দাও, মেরেন! বাঁক নিল মেরেন, লাগাম টেনে ঘোড়া থামাল।
ওয়ার্লউইন্ডের পিঠ থেকে ঝট করে নেমে তাইতার কাছে ছুটে গেল ফেন। দুই হাতে ওর গলা জড়িয়ে ধরে ভাঙা মনে কাঁদতে শুরু করল। ওহ! ওহ! ওহ! আমি ভেবেছি তুমি মরে গেছ। ভেবেছি ওরা তোমাকে মেরে ফেলেছে।
শক্ত করে ওকে বুকে চেপে রাখল তাইতা, কোমল ও আড়ষ্ট ঠেকল ওর দেহ। ওর দেহের সৌরভ ওর নাক ভরিয়ে দিল, ইন্দ্রিয়তে কাঁপন লাগল। বুকের খাঁচায় হৃৎপিণ্ড কেঁপে উঠল। মুখ দিয়ে কথা সরছে না। নীরবে প্রবলভাবে পরস্পরকে ধরে থাকল ওরা, এদিকে বিস্ময়ে ওদের দিকে চেয়ে রইল অন্যরা। হিলতো ওর স্বভাবসুলভ নিস্পৃহ ভাব ধরে রাখার চেষ্টা করলেও তাতে সফল হলো না। নাকোন্তো ও ইদালি ডাইনীর ভয়ে চুপ মেরে গেছে। অশুভ আত্মার বিরুদ্ধে ডানে বামে থুতু ছিটাল ওরা।
এটা তিনি নন, বলে চলেছে মেরেন। অন্য যেকারও চেয়ে ম্যাগাসকে ঢের ভালো করে চেনা আছে আমার। এই তরুণ ছোকরা তা নয়।
অনেকক্ষণ বাদে পেছনে সরে দাঁড়াল ফেন, সামনে ধরে রাখল তাইতাকে। মুগ্ধ চোখে ওর চেহারা পরখ করল। তারপর ওর চোখের দিকে তাকাল। আমার চোখ বলছে তুমি সে নও, কিন্তু হৃদয়ে সুর উঠছে যে তুমিই। হ্যাঁ, এটা তুমি। নিশ্চয়ই তুমি। কিন্তু, হে প্রভু, কীভাবে এমন তরুণ আর বিস্ময়কর সুদর্শন হয়ে গেলে? ওকে চুমু খেতে পায়ের আঙুলে ভর দিয়ে দাঁড়াল ও। এই সময় অন্যরা হাসিতে ফেটে পড়ল।
এক লাফে ঘোড়ার পিঠ থেকে নেমে ওদের সাথে যোগ দিতে ছুটে এলো মেরেন। ফেনের আলিঙ্গন থেকে তাইতাকে কেড়ে নিয়ে শক্ত করে জাড়িয়ে ধরল।
এখনও বিশ্বাস করতে পারছি না! এ অসম্ভব! হেসে ফেলল সে। কিন্তু আমি নিজে সাক্ষী দিচ্ছি, দারুণ তলোয়ার চালাতে পারেন আপনি, ম্যাগাস, নইলে আপনাকে ফানা-ফানা করে ফেলতাম। উত্তেজিতভাবে ওকে ঘিরে ধরল ওরা।
ওর সামনে এসে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল সিদুদু। আপনার কাছে আমার অনেক ঋণ, ম্যাগাস। আপনি নিরাপদে আছেন দেখে খুশি হয়েছি। এর আগে আত্মার দিক থেকে সুন্দর ছিলেন আপনি, এখন দেহেও সুন্দর হয়ে উঠেছেন।
এমনকি নাকোন্তো ও ইদালি পর্যন্ত ওদের কুসংস্কারজাত ভয় জয় করে সবিস্ময়ে ওকে স্পর্শ করতে এগিয়ে এলো।
সজোরে চিৎকার করে উঠল হিলতো, আপনার ফেরার ব্যাপারে আমার মনে এক মুহূর্তের জন্যেও সন্দেহ জাগেনি। চোখে পড়ামাত্র বুঝে গিয়েছি, আপনিই এসেছেন। এমন ডাহা মিথ্যাচার আমলে নিল না কেউ।
বিশটা ভিন্ন ভিন্ন ভাষায় জবাব দাবি করল মেরেন। ওর ডান হাত আঁকড়ে থাকল ফেন। চকচকে চোখে তাকিয়ে রইল ওর মুখের দিকে।
