লাশ দুটোর উপর লাফ দিয়ে উঠে দাঁড়াল তাইতা, তারপর প্রথম যাকে মেরেছে তার কাছে এলো। অন্যদের মতো এর ইউনিফর্মে রক্তের দাগ লাগেনি। ঝটপট তার পায়ের স্যান্ডেল খুলে নিজের নগ্নপায়ে ফিতে দিয়ে বেঁধে নিল। কোনওমতে লেগে গেল। তলোয়ারের বেল্ট ও খাপ কোমরে জড়িয়ে নিয়ে। তারপর হেলমেট ও জোব্বা তুলে নিয়ে পেছন দরজার দিকে দৌড়াতে দৌড়াতেই গায়ে চাপাল ওগুলো। ওর ছেঁড়া, ময়লা টিউনিক ঢাকতে রক্ত লাল জোব্বাটা ঠিক করে নিল। দরজার দিকে এগোনোর সময় ওখানকার প্রহরীদের মন অবশ করে দিতে ভাব পাঠাল ও। ওদের মাঝখান দিয়ে বেরিয়ে যাবার সময় তেমন একটা আগ্রহ দেখাল না ওরা, মার্বলের সিঁড়ি বেয়ে প্রাঙ্গণে চলে এলো ও।
ওনকার রেজিমেন্টের লোকজন ও ঘোড়ায় গিজগিজ করছে প্যারেডগ্রাউন্ড, অভিযানে বেরিয়ে যাওয়ার তোড়জোড় করছে ওরা। খোদ ওনকাকে দেখতে পেল তাইতা, চিৎকার করে নানা হুকুম ঝাড়ছে দলের ক্যাপ্টেনদের। ভিড়ে মিশে গিয়ে আস্তাবলের দিকে যাবার সময় ওনকার অনেকটা কাছে চলে এলো ও। ওনকা ওর দিকে তাকালেও চেনার কোনও অভিব্যক্তি দেখা গেল না তার মাঝে।
কারও চোখে ধরা না পড়ে আস্তাবল আঙিনায় পৌঁছে গেল তাইতা। এখানে রীতিমতো দক্ষযজ্ঞ কাণ্ড শুরু হয়েছে। ফেরিয়াররা ঘোড়ার পায়ে নতুন নাল পরাচ্ছে। অস্ত্রনির্মাতারা গ্রিন্ডস্টোনে বর্শার ফলা ও তলোয়ার ধার করতে ব্যস্ত আর অফিসারদের ঘোড়া সাজাচ্ছে সহিসরা। সারি থেকে একটা ঘোড়া চুরি করার কথা ভাবল তাইতা, কিন্তু বুঝতে পারল তেমন কোনও মতলব হাসিল হওয়ার তেমন কোনওই সম্ভাবনা নেই। তাই প্রাসাদ চৌহদ্দীর পেছনের দেয়ালের দিকে এগিয়ে গেল ও।
দুর্গন্ধ দালানকোঠার আড়ালে ল্যাট্রিনের কাছে নিয়ে এলো ওকে। ল্যাট্রিনের খোঁজ পাওয়ার পর কেউ ওকে দেখেনি নিশ্চিত হতে আশপাশে নজর চালাল। মাথার উপরের দেয়ালে পাহারা দিচ্ছে এক প্রহরী। বিকল্পের অপেক্ষা করতে লাগল ও। সেটা মিলবেই, কোনও সন্দেহ নেই ওর মনে। অচিরেই দুর্গের দিক থেকে ক্রুদ্ধ চিৎকার ভেসে এলো। হুইসল বেজে উঠল, ঢাকের শব্দ সৈন্য তলব করল। প্যাসেজে ফেলে আসা লাশ তিনটা আবিষ্কৃত হয়েছে। সেনাছাউনীর পুরো মনোযোগই এখন দুর্গের দিকে। প্যারাপেটের যেখানে পাহরা দিচ্ছিল সেখান থেকে দূরের প্রান্তের দিকে ধেয়ে গেল শাস্ত্রী। ওখান থেকে প্যারেডগ্রাউন্ডের উপর দিয়ে এমনি হাঁকডাকের কারণ বোঝার প্রয়াস পেল। ওর দিকে পেছন ফিরে আছে।
ল্যাট্রিনের চ্যাপ্টা ছাদে উঠে এলো তাইতা। এখান থেকে দেয়ালের চূড়া একদম হাতের নাগালে। এক দৌড়ে প্যারপেটের কিনারার উদ্দেশ্যে লাফ দিল ও। তারপর দুহাতে নিজেকে তুলে এনে একটা পা উপরে তুলে দিল। দেয়ালের চূড়ার উপর গড়ান দিয়ে অন্য পাশ দিয়ে ঝুপ করে নেমে পড়ল। দীর্ঘ পতন, কিন্তু পা তৈরি রেখে পতনের ধাক্কা সামাল দিল। চট করে এপাশ ওপাশ তাকাল। শাস্ত্রী এখনও অন্যদিকে তাকিয়ে আছে। বনের ধারটা এখন অনেক কাছে, খোলা। প্রান্তরের উপর দিয়ে গাছপালার দিকে দৌড় লাগাল ও। এখানে এসে এক মুহূর্ত দাঁড়িয়ে স্থির করে নিল নিজেকে। তারপর হুট করে যাতে কারও চোখে ধরা না পড়ে, তাই ফোকর, লম্বা লম্বা ঘাস ও গুল্মের আড়ালে গা ঢাকা দিয়ে খাড়া পাদদেশ বেয়ে উঠতে শুরু করল। পাহাড়ের চূড়ায় ওঠার পর কিনারার উপর দিয়ে সাবধানে নজর চালাল। মেঘ-বাগিচার দিকে চলে যাওয়া রাস্তাটা রয়েছে ঠিক ওর নিচেই। জনহীন। দৌড়ে ওটা পার হলো। একটা গুল্মের কেঁপে গা ঢাকা দিল। এখান থেকে পরের ফাঁকা জায়গায় ঘোড়ার মাথার আকৃতির গাছপালা দেখা যাচ্ছে। দৌড়ে খাড়া ঢাল বেয়ে উপত্যকায় নেমে এলো ও। পায়ের নিচে গড়ান খাচ্ছে আলগা পাথর। ভারসাম্য না হারিয়ে নিচে পৌঁছাল ও। পাহাড়ের পায়ের কাছ দিয়ে ছুটতে ছুটতে একটা খোলা জায়গায় হাজির হলো। উপত্যকার দুধার খাড়া, কিছুটা পথ সামনে এগিয়ে তারপর ঘুরে ঢোকার পথের দিকে নজর রাখার মতো একটা জায়গায় এলো, অপেক্ষা করতে লাগল।
সর্বোচ্চ বিন্দুতে উঠে এলো সূর্যটা, তারপর হেলে পড়তে শুরু করল দিগন্তে। উপত্যকার উল্টোদিকের পথে ধুলো দেখতে পেল ও। মনে হচ্ছে যেন এক বিশাল অশ্বারোহী বাহিনী পুব দিকে ধেয়ে আসছে। এক ঘণ্টার মতো কেটে গেল। তারপর আগুয়ান ঘোড়ার খুরের শব্দ কানে এলো। সতর্ক হয়ে উঠে বসল ও। ওর ঠিক নিচে ছোট একদল ঘোড়াসওয়ার এসে থামল। সবার সামনে সিদুদু, একটা চেস্টনাট পনিতে চেপেছে। হাত তুলে তাইতার আত্মগোপনের জায়গাটা দেখাল সে। গোড়ার পেটে স্পর দাবিয়ে তাকে পেছনে ফেলে সামনে চলে এলো মেরেন। দুলকি চালে ওর পেছন পেছন এগোলে বাকি দলটা। মেরেনের সাথে সুন্দরী এক তরুণী, একটা ধূসর কোল্টের পিঠে সওয়ার হয়েছে সে। ওর লম্বা পা নগ্ন, কাঁধের উপর হাওয়ায় দোল খাচ্ছে সোনালি চুল। ছিপছিপে গড়ন, কাঁধজোড়া গর্বিত ভঙ্গিতে বসানো। এমনকি দূর থেকেও তাইতা ওর ব্লিচ করা লিনেনের নিচে সুগঠিত বুকের অস্তিত্ব টের পাচ্ছে। হাওয়ার দমকে সোনালি চুল সরে গিয়ে চেহারা উন্মুক্ত করে দিল। লম্বা দম টানল তাইতা। ফেন, কিন্তু যাকে ও ভালোবাসত, চিনত তার চেয়ে ভিন্ন। এটা আত্মবিশ্বাসী, দৃঢ় তরুণী, সৌন্দর্যের প্রথম কুঁড়িতে রয়েছে।
