আমরাও লুকিয়ে আছি, তবে তোমার কাছ থেকে মাত্র পাঁচ কি ছয় লীগ দূরে, জবাব দিল ফেন। বলো তোমার সাথে কোথায় দেখা করতে হবে।
দুর্গের উত্তরে পাহাড়ের পাদদেশ কুঁদে বানানো একটা সংকীর্ণ উপত্যকা আছে। পাহাড়ী পথ থেকে বেশি দূরে না। প্রাসাদের আনুমানিক তিন লীগ দূরে হবে। ঢোকার মুখটা পাহাড়ের ঢালের বাবলা গাছের একটা আকর্ষণীয় বাগান দিয়ে চিহ্ন দেওয়া। দূর থেকে দেখে ঘোড়ার মাথার মতো লাগে। এটাই সেই জায়গা, বলল তাইতা, তারপর ইথারে বনের একটা ছবি পাঠিয়ে দিল।
পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছি, জবাব দিল ফেন। সিদুদু চিনতে পারবে। না চিনলে আবার তোমাকে ডাকব। চট করে উপত্যকায় চলে যাও, তাইতা। এই জঘন্য জায়গা আর জাররিয়দের ক্রোধ থেকে পালানোর মতো বেশি সময় হাতে নেই।
দ্রুত খাসকামরায় অস্ত্র বা ছদ্মবেশের কোনও উপকরণ পাওয়া যায় কিনা তার খোঁজ করল তাইতা। কিন্তু কিছুই পেল না। এখনও খালি পায়ে রয়েছে ও, পরনে মামুলি একটা টিউনিক, ধুলি-ময়লায় নোংরা, জ্বলন্ত লাভায় জায়গায় জায়গায় পুড়ে গেছে। চট করে বাইরের দরজার কাছে এসে খালি দরবার হলে বের হয়ে এলো। তিনাত প্রথমবার যে পথে দুর্গে নিয়ে এসেছিল সেটা ধরে আবার বাইরে যাবার পথের পরিষ্কার স্মৃতি মনে আছে। করিডরে পা রেখে দেখল শাখা করছে ওটা। অলিগার্করা যাবার পর নিশ্চয়ই প্রহরীদের বিদায় করে দিয়েছে। দালানের পেছন দিকে চলল ও, পেছনের উঠোনের লম্বা ডাবল ডোরের কাছে পৌঁছে গেছে, এমন সময় ভরাট একটা কণ্ঠস্বর থামাল ওকে।
এই যে তুমি! দাঁড়াও, পরিচয় দাও।
তাড়াহুড়োয় চারপাশে আড়ালের জাদু তৈরি করতে ভুলে গিয়েছিল তাইতা। মুখে বন্ধুসুলভ হাসি নিয়ে ঘুরে দাঁড়াল ও। এই বিশাল জায়গায় বোকা বনে গেছি, দয়া করে বাইরে যাবার পথটা বাৎলে দিলে খুশি হবো।
ওকে পথ দেখানো লোকটা ছিল দুর্গের পাহারাদারদের একজন, মাঝবয়সী পুরো ইউনিফর্ম পরা মারকুটে ধরনের সার্জেন্ট। তলোয়ার বের করে মারমুখী ভঙ্গিতে ভুরু কুঁচকে তাইতার দিকে এগিয়ে এলো সে।
কে তুমি? আবার চিৎকার করে জানতে চাইল। চেহারা দেখে তো নোংরা চোর-বদমাশ বলে মনে হচ্ছে।
শান্ত হও, বন্ধু, হাসি মুখেই বলল তাইতা, শান্ত করার ভঙ্গিতে দুই হাত সামনে মেলে ধরল। কর্নেল ওনকার জন্যে জরুরি বার্তা নিয়ে এসেছি।
কর্নেল আগেই চলে গেছেন, বাম হাত বাড়িয়ে দিল সার্জেন্ট। বার্তাটা আমাকে দাও, যদি মিথ্যা না বলে থাকো, আর সত্যিই তেমন কিছু যদি তোমার কাছে থাকে। ওটা যেন তিনি পান, দেখব আমি।
পাউচ হাতড়ানোর ভান করল তাইতা, কিন্তু লোকটা কাছে আসতেই ওর কব্জি আঁকড়ে ধরে হ্যাঁচকা টানে বেসামাল করে দিল তাকে। সহজাত প্রবৃত্তির বশে সার্জেন্টও পাল্টা টান লাগাল। কিন্তু তাতে বাধা না দিয়ে উল্টে সামনে এগিয়ে গেল তাইতা, লোকটার বুকের উপর দুই হাতের কনুইসহ পড়ে যাবার কাজে লাগাল গতিটাকে। বিস্ময়সূচক আওয়াজ করে ভারসাম্য হারাল লোকটা, হেলে পড়ল পেছনে। চিতার ক্ষিপ্রতায় তার উপর ঝাঁপিয়ে পড়ল তাইতা, ডান হাত মুঠি পাকিয়ে চিবুকের নিচে জোরসে আঘাত হানল। সশব্দে ভেঙে গেল সার্জেন্টের কশেরুকা, নিমেষে মৃত্যু ঘটল তার।
তারপাশে হাঁটু গেড়ে বসে হেলমেট খুলে নিতে শুরু করল তাইতা, ওর পোশাকটাকেই ছদ্মবেশ হিসাবে কাজে লাগানোর ইচ্ছে, কিন্তু মাথা থেকে হেলমেটটা খোলার আগেই আরেকটা চিৎকার শোনা গেল। তলোয়ার বাগিয়ে আরও দুজন প্রহরী তেড়ে এলো ওর দিকে। হামলাকারীদের মোকাবিলা করতে লাশের হাত থেকে তলোয়ারটা ছিনিয়ে নিয়ে এক লাফে উঠে দাঁড়াল তাইতা।
ডান হাতে তলোয়ারটা নাচাল। ভারি পদাতিক বাহিনীর মডেল ওটা, কিন্তু পরিচিত ঠেকছে; হাতের মুঠিতে স্বস্তিকর লাগছে। অনেক বছর আগে ফারাওর রেজিমেন্টের অস্ত্রশস্ত্রের ম্যানুয়াল লিখেছিল ও, তলোয়ার চালনা ছিল ওর অন্যতম আবেগের বিষয়। তারপর বয়স ওর ডান হাতের শক্তি কেড়ে নিয়েছিল, কিন্তু এখন তা আবার ফিরে এসেছে, ঠিক ওর পায়ের ক্ষিপ্রতা ও দ্রুততার মতো। প্রথম আক্রমণকারীর ধাক্কাটা সামলে দুনম্বরের আক্রমণ বাউলি কেটে এড়িয়ে গেল ও। মাথা নিচু রেখেই লোকটার গোড়ালির পেছনে কোপ বসাল। নিপূণভাবে অ্যাকিলিসের বাঁধন কেটে দিল। পরক্ষণেই সোজা হয়ে হানাদাররা সামলে ওঠার আগেই বিস্ময়করভাবে ওদের মাঝখানে পাক খেতে শুরু করল। ওকে অনুসরণ করতে ঘুরে দাঁড়াল অক্ষত লোকটা, কিন্তু তাতে উল্টে নিজের পাঁজর উন্মুক্ত করে দিল। সুযোগটা লুফে নিয়ে ওর বগলতলায় ঢুকিয়ে দিল তলোয়ারের ডগা, পাঁজরের ফাঁকে পিছলে ঢুকে গেল ওটা। কব্জি ঘুরিয়ে ক্ষতস্থানের ভেতরেই পাক খাওয়াল ওটাকে, ফাঁকটাকে বড় করে তুলল। মাংসের টান থেকে মুক্ত করে নিয়ে এলো ওটাকে। কাশির সাথে রক্ত উগড়ে দিয়ে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল ওর শত্রু। পাই করে ঘুরে পঙ্গু করে দেওয়া শত্রুর মোকাবিলা করবে বলে সরে গেল তটাটা।
আতঙ্কে জড়োসড়ো হয়ে গেছে লোকটা, পিছু হটার প্রয়াস পেল সে, কিন্তু অচল পাটা সাড়াহীন থপথপ করে শব্দ করছে, পড়ে যাবার দশা হলো তার। ওর মুখে আঘাত করার ভান করল তাইতা, লোকটা চোখ বাঁচাতে ঢাল উঁচু করতেই ওর পেটে তলোয়ার চালিয়ে দিল, পরক্ষণেই ওটা বের করে এক লাফে পিছিয়ে এলো। অস্ত্র ফেলে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল লোকটা। ফের সামনে বাড়ল তাইতা, লোকটার ঘাড়ের পেছনে ঠিক হেলমেটের নিচে তলোয়ার বসিয়ে দিল। উপুড় হয়ে লুটিয়ে পড়ল সেনাটি, অনড় হয়ে রইল।তাত
